সাদত আল মাহমুদ

প্রাচীনকালে কবুতর বা দূতের মাধ্যমে চিঠি আদান-প্রদান করা হতো। স্বল্প আকারে লেখা চিঠিটি কয়েকটি ভাঁজ করে কবুতরের পায়ে বেঁধে দিয়ে কাংখিত মানুষটির নিকট তা পৌঁছানো হতো। এখানে কবুতর ডাকপিয়ন বা  রানারের ভূমিকায় থেকে চিঠি মাইলকে মাইল উড়ে গিয়ে প্রাপকের হাতে পৌছে দিয়ে সান্ত¦না খুজে  নিতো। পরবর্তীতে শেরশাহ তার শাসনামলে (১৫৩৮-১৫৪৫খ্রীঃ) ঘোড়ার ডাকের প্রচলন করেন। তিনি ১ হাজার ৭০০টি ডাকঘর নির্মাণ এবং ঘোাড়াসহ প্রায় তিন হাজার ৪০০ বার্তাবাহক নিযুক্ত করেন। এর অনেক পরে আসে চিঠিপত্র আদান-প্রদানের মওসুম।

হাতে লেখা বিভিন্ন ভঙ্গির চিঠি দুনিয়ার এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত পর্যন্ত  পৌছে যেতো বা এখনও কিছু কিছু ক্ষেত্রে পৌঁছে যাচ্ছে। তবে আর হয়তো বেশিদিন এই চিঠি এক স্থান থেকে আরেক স্থানে যাওয়া-আসা করবে না। আর হয়তো কখনও চিঠির মাধ্যমে কোন প্রেমিক-প্রেমিকাকে বলবে না- প্রিয় সুরভী, গতকাল তোমার চিঠি পেয়েছি। তোমার অনিন্দ্য সুন্দর হাতের লেখা কতদিন পর পেলাম। মা তার দূরে অবস্থানরত প্রাণপ্রিয় সন্তানকে চিঠির মাধ্যমে বলবেনা, বাবা ঠিক মত লেখাপড়া করবি। নিজের শরীরের প্রতি খেয়াল রাখতে ভূল করিস না। বাবা বিশ^বিদ্যালয়ের হলে থাকা ছেলে বা মেয়েকে বলবে না-টাকার দরকার হলে চিঠি লিখে জানাতে ভূল করিসনা। আর হয়তো কখনও কপত-কপতিরা চিঠির মারফত তাদের মনের ভিতরে লুকিয়ে থাকা কথাগুলো লিখে দু’জনের বিরহের জ¦ালা মিটাবে না। চিঠিতে লিখে মনের ভাব প্রকাশ করে চিঠির আবেদনের স্বাদ হয়তো তারা আর কখনও নিবে না বা নিতে চাবে না। মনের মানুষের চিঠি পেতে বিলম্ব দেখে মনের দুঃখে প্রেমিক গান গেয়ে বলবে না- ময়নার চিঠি আসেনা, মনে হয় ডাকপিয়নের জ¦র হয়েছে। এরকম অনেক কিছুই চিঠিপত্রের ময়দানের কোন খেলোয়াড়ই হয়তো আর কোন দিন তাদের মনের ভিতরের নিংড়ানো কথাগুলো বলার প্রয়োজন অনুভব করবে না। চিঠিপত্র আদান-প্রদানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন চরিত্রটির নাম রানার বা ডাকপিয়ন। এখানে রানারই কেন্দ্রীয় চরিত্র বা নায়ক। যে চরিত্রটি ব্যাতিত মানুষ তার মনের কথাটি চিঠির মাধমে লিখে মনের মানুষের নিকট পৌছাতে পারেনা। যে মানুষটিকে বাদ দিলে ডাকপোষ্ট, ডাকমেইল সর্বোপরি ডাকবিভাগ করার কথা চিন্তাও করা যায় না। এখানে রানারের গুরুত্বটা এতটাই বিস্তর যে, শুধু দেশ নয় গোটা পৃথিবীর ডাক ব্যবস্থাপনায় রানার এক জীবন্ত কিংবদন্তীর নাম।  খাকি রংয়ের পোশাক পরা টুং-টাং বেলের শব্দে সবার দৃষ্টি কেড়ে নেয় প্রিয় রানার। হাতে বল্লম আর বল্লমের মাথায় ঝুলন্ত লন্ঠন, কোমরে বাধা বিউগল, কাঁেধ চিঠি বা টাকার ব্যাগ নিয়ে রাতের অন্ধকারে জীবনের মায়া তুচ্ছ করে গ্রামের পর গ্রাম ছুটে বেড়ায়। প্রবাসে থাকা ছেলের পাঠানো টাকা, নববধুর কাছে লেখা স্বামীর চিঠি ইত্যাদি মানুষের দোরগোড়ায় নির্ভূলভাবে যে মানুষটি পৌছিয়ে দেয় তিনি হলেন আমাদের সকলের প্রিয় রানার বা ডাকপিয়ন। রাতে-দিনে অক্লান্ত পরিশ্রম করার পর মাস শেষে যে সামান্য কিছু টাকা মাসোয়ারা পায় তা দিয়েই রানার পরিবার -পরিজন জীবন নৌকা চালিয়ে নেয়। রানার যাতে তার কাজটা দ্রুত গতিতে করতে পারে এজন্য দরকার হয় ডাকঘরের। ডাকঘরের সংখ্যা যত বৃদ্ধি পাবে, রানারের চিঠিপত্র ডেলিভারী করা তত সহজ হবে। এশিয়াটিক সোসাইটি প্রকাশিত বাংলাপিডিয়ার তথ্যমতে, বর্তমানে দেশে ডাকঘরের সংখ্যা ৯ হাজার ৮৮৬টি। ডাকবিভাগ ব্যতিত গোটা পৃথিবীটাকে এক প্লাটফর্মে আনা সম্ভব নয় এটা সারা বিশে^র মানুষ প্রবলভাবে অনুধাবন করা শুরু করে। এরই ফলশ্রুতিতে ১৯৬৯সালে জাপানের টোকিওতে অনুষ্ঠিত হয় ইউনিভার্সাল ডাক ইউনিয়নের ১৬তম অধিবেশনে প্রতিবছরের ৯ অক্টোবর বিশ^ ডাক ইউনিয়ন দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত হয়। বাংলাদেশ ১৯৭৩সালে ইউনিভার্সাল ডাক ইউনিয়নের সদস্য হয়। ১৯৮৪ সালে জার্মানীর হামবুর্গে ১৯তম অধিবেশনে বিশ^ ডাক ইউনিয়নের নাম বদলে হয় বিশ^ ডাক দিবস। ডাক বিভাগকে ডিজিটালাইজড করার নানা উদ্যোগ সরকার নিলেও পরিকল্পনা অনুসারে এগুলো বাস্তবায়ন হচ্ছে না। বিজ্ঞানের কল্যানে গোটা বিশ^ আজ আমাদের সকলের হাতের মুঠোর মধ্যে চলে এসেছে। মাত্র কয়েক ঘন্টা সময় খরচ করে আমরা এখন পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত ঘুরে আসতে পারি। সকালে ব্যাংকক গিয়ে শপিং করে বিকেলের বিমানে ঢাকায় ফিরে আসতে পারি। এ সকল কিছুই সম্ভব হয়েছে বিজ্ঞানের কল্যানে। বিমান পথের পাশাপাশি স্থলপথ ও জলপথেও আমাদের ব্যাপক উন্নতি হয়েছে চোখে পড়ার মতো।  ঘন্টায় পাঁচশ কিলোমিটার গতিতে ট্রেনও আবিষ্কার হয়েছে কোন কোন দেশে। জাপান তার জ্ঞানের ভান্ডার খরচ করে সমূদ্রের ভিতর দিয়ে রেল লাইন নিয়ে গিয়ে ট্রেন ভ্রমনে সবাইকে নতুন স্বাদের রাজ্যে নিয়ে গিয়েছে। স্যাটেলাইট শহরের ন্যায় বিশাল বিশাল হাইরাইজ ভবনের মতো জাহাজ সমূদ্রের বুকে মাথা উঁচু করে সারা পৃথিবীময় চষে বেড়াচ্ছে। আধুনিক সকল সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত বিশাল বিশাল এই জাহাজগুলোকে দেখলে মনে হয়, এ যেন ভাসমান একটি শহর বিভিন্ন বন্দরে বন্দরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আমাদের সমাজের অন্য সব সেক্টরের পাশাপাশি ডাকবিভাগেও বিজ্ঞানের ছোঁয়া লেগেছে সুনামি ঝড়ের মতই। বিজ্ঞানের  কল্যাণে আমরা আজ খুব দ্রুত খবরা-খবর জানতে পারি। আজ থেকে প্রায় একশ বছর পূর্বেও  আমাদের সকলকে খবর জানতে হতো ডাকবিভাগের প্রতিনিধি রানারের মারফত চিঠিপত্রের মাধ্যমে। অবশ্য পরবর্তীতে টেলিফোন, রেডিও, টেলিভিশন আবিস্কৃত হওয়ার পর মানুষ বিলম্বের লম্বা পথ ছোট করে একটু দ্রুতই খবর জানতে পারা শুরু করে। তবে সকলের পক্ষে টেলিফোনের ব্যয়ভার বহন করা সম্ভব না হওয়ার কারণে সকলেই এই সুবিধার কাতারে শামিল হতে পারেনি। বিগত ২০/২৫ বছর যাবত কম্পিউটার, মোবাইল এবং এরও ১০/১৫ বছর পরে ইন্টারনেট- ফেইসবুক আবিস্কার হওয়ার পর  ডাকবিভাগের অন্যতম প্রতিনিধি রানার প্রায় বেকার হয়ে গিয়েছে। বর্তমানে দেশের ১৬ কোটি লোকের মধ্যে ৯ কোটি লোক কারেন্ট জালের মতো মোবাইল রাডারে আটকে পড়ে মোবাইল ব্যবহার করছে। এখন আর কেউ চিঠি লিখে তার মনের ভাব প্রকাশ করে না। কোন খবর জানা বা জানানোর জন্য চিঠির উপর ভরসা করে কেউ বসে থাকে না। কোন কিছু জানার এবং জানানোর থাকলে তা মোবাইল বা ইন্টারনেটের মাধ্যমে সবাই জেনে নেয়। মাত্র কয়েক সেকেন্ড সময় খরচ করে মোবাইলের মাধ্যমে পৃথিবীর যে কোন প্রান্তে খবর পৌছে দেওয়া হচ্ছে।  এছাড়াও প্রেমিক-প্রেমিকারা তাদের মনের রোমান্টিক কথাগুলো লিখে মোবাইলে এসএমএস করে পাঠিয়ে দিচ্ছে। রানারের অপেক্ষায় না থেকে মাত্র  ১ সেকেন্ডের মধ্যেই কাংখিত সফ্ট চিঠিটি আমরা আমাদের মোবাইলের ইনবক্সে পেয়ে যাচ্ছি। এছাড়াও আমাদের ফেইসবুকের বন্ধুর লিস্টে যারা যারা আছেন, তাদের সকল কিছুই ফেইসবুকের মাধ্যমে আমরা প্রতি মুহুর্তে জানতে  পারছি। আজ এবং আগামিকাল কোথায় কোন অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে, সেটা ফেইসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে সবাইকে জানিয়ে দিতে পারছি। কে কখন অসুস্থ হচ্ছে, কোথায় বিপদে পড়েছে সকল কিছু মোবাইলের মাধ্যমে মুহুর্তের মধ্যে সবাইকে জানিয়ে দিতে পারছি। এখন আর আমরা কেউই কোন খবর জানার জন্য রানার বা ডাকপিয়নের পথের পানে চেয়ে থেকে সময় নষ্ট করিনা। বিজ্ঞানের কল্যানে আমরা আজ এমন এক অবস্থানে এসেছি যেখানে বিজ্ঞান সবকিছুই আমাদের মুখে পুড়ে দিচ্ছে। আমরা শুধু চিবিয়ে তা গিলে খাচ্ছি। বিজ্ঞানের এই কল্যানে আমরা হয়তো সকলেই লাভবান হচ্ছি, কিন্তু অপরদিকে রানার চিরদিনের জন্য বেকার হয়ে যাচ্ছে। রানারের পাশাপাশি ডাকবিভাগও ঝিমিয়ে পড়ছে। এখন আর টুং টাং শব্দে সাইকেল চালিয়ে রানার আমাদের সামনে হাজির হন না। রাতের অন্ধকারে চিৎকার করে কেউ বলে না- এই চিঠি আছে, মানি অর্ডার আছে। রানারের এই দূর্দশার জন্য কি বিজ্ঞান দায়ী! বিজ্ঞানের  এই কল্যাণ কি রানারের জীবনে অকল্যানের চিহ্ন একে দিয়েছে! এর উত্তর হয়তো আমরা কেউ কেউ খুজবো আবার একসময় ভূলেও যাবো। অবস্থাদৃষ্টে দেখে মনে হচ্ছে –রানারের অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটেছে। রানারের স্মৃতি ধরে রাখার জন্য নির্মিত পোস্টাল জাদুঘরে স্থান পেয়েছে রানার বা ডাকহরকরার ভাস্কর্য।  চামড়ার ব্যাগ, চপ্পল, টেবিল ঘড়ি, ব্যাজ, বন্দুক, সিলমোহর, ছুরি ও লন্ঠন সহ সবকিছুই আছে এই পোস্টাল জাদুঘরে। পোস্টাল জাদুঘরে রানারের ভাস্কর্য স্থান পাওয়ায় এটাই প্রতীয়মান হয় যে, জলজ্যান্ত রানারকে আমরা গলা টিপে হত্যা করে ভবিয্যতে নষ্টালজিয়ায় ফিরে যাওযার জন্য পোষ্টাল জাদুঘরে রানারকে স্থান দিয়েছি। তাহলে কি রানারের অধ্যায়ের সত্যি সত্যিই সমাপ্তি ঘটলো! এভাবে রানারের অধ্যায়ের ইতি টানাটা সমীচীন হবে না। আমরা আধুনিক বিজ্ঞানের ফসল থেকেও মুখ ফিরিয়ে নেবোনা, পাশাপাশি রানারকেও দূরে ঠেলে দিবো না। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের বিখ্যাত কবিতার একটি অংশ-

মোরা একই বৃন্তে দুটি কুসুম, মুসলিম তার নয়ন-মনি, হিন্দু তাহার-প্রাণ। নজরুলের এই কবিতার মতই আধুনিক বিজ্ঞান  ও রানার একই বৃন্তে দুটি কুসুম। রানারকে আমাদের জীবন থেকে মুছে না দিয়ে মোবাইল-ফেইসবুক-ইন্টারনেটের পাশাপাশি স্থান দিয়ে আমরা সকলেই বীরবলে সামনে দিকে এগিয়ে যাবো এই প্রত্যাশায় শেষ করছি। লেখক – কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার।

Share Button