প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিম, সুস্থ বিবেক-বুদ্ধিসম্পন্ন, স্বাধীন ও মুকিম তথা নিজ বাসস্থানে অবস্থানকারী ব্যক্তির ওপর পবিত্র রমজান মাসে রোজা ফরজ। তবে কয়েক শ্রেণির ব্যক্তির জন্য রমজানের রোজা না রেখে পরে রাখার সুযোগ আছে।

১. মুসাফির: মুসাফিরের জন্য সফর অবস্থায় রোজা না রাখারও সুযোগ আছে। তবে বেশি কষ্ট না হলে রোজা রাখাই উত্তম। হযরত আসেম (রহ.) বলেন, হযরত আনাসকে (রা.) সফরের হালতে রোজা বিধান সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, ‘মুসাফিরের জন্য রোজা না রাখার অনুমতি আছে। তবে রোজা রাখা উত্তম।’- মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা, হাদীস ৯০৬৭

আর অস্বাভাবিক কষ্ট হলে রোজারাখা মাকরূহ। এ অবস্থায় রোজা না রেখে পরে কাযা করে নেবে।- রদ্দুল মুহতার ২/৪২১, ফাতাওয়া তাতরখানিয় ৩/৪০৩

* সফর অবস্থায় কেউ রোজা রাখলে বিনা-ওযরে তা ভাঙা জয়েয নেই। ভেঙে ফেললে গোনাহগার হবে। তবে কাফফারা দিতে হবে না, শুধু কাযা করতে হবে। – রদ্দুল মুহতার ২/৪৩১

* যে ব্যক্তি মুকিম অবস্থায় সাহরি খেয়ে সফর শুরু করেছে তার জন্য সফরের অজুহাতে রোজা ভাঙা জায়েয নেই। ভাঙলে গোনাহগার হবে, তবে শুধু কাযা ওয়াজিব হবে।- মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা, হাদীস ৯০৯৪, আলমুহীতুল বুরহানী ৩/৩৫৮, ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/২০৬

* যে মুসাফির সফরের কারণে রোজা রাখেনি, কিন্তু দিন শেষ হওয়ার আগেই মুকিম হয়ে গেছে, সে দিনের অবশিষ্ট সময় রমজানের মর্যাদা রক্ষার্থে আহার ও পানীয় গ্রহণ থেকে বিরত থাকবে। আর পরবর্তী সময়ে এ রোজা কাযা করে নেবে।

হাসান বসরী (রহ.) বলেন, ‘যে মুসাফির রমজানের দিনে (সফরের হালতে) খাবার খেয়েছে, পরে সে মুকিম হয়ে গেলে দিনের বাকি অংশ পানাহার থেকে বিরত থাকবে।- মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা, হাদীস ৯৪৩৬, ফাতাওয়া তাতারখানিয়া ৩/৪২৮

* রমযানের দিনে হায়েয-নেফাস থেকে পবিত্র হলে অবশিষ্ট দিন রমযানের মর্যাদা রক্ষার্থে পানাহার থেকে বিরত থাকা আব্যশক এবং পরবর্তী সময়ে এ দিনের রোজারও কাযা করে নিতে হবে। – মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা ৬/২২১, হাদীস ৯৪৩২, ফাতাওয়া তাতারখানিয়া ৩/৪২৮

২. অসুস্থ ব্যক্তি:  রোজার কারণে যে রোগ বৃদ্ধি পায় বা আরোগ্য লাভে বিলম্ব হওয়ার আশঙ্কা থাকে, সে রোগে রোজা না রাখা জায়েয। উল্লেখ্য, উক্ত আশঙ্কা যদি প্রবল হয় তবে তো কথাই নেই নতুবা একজন অভিজ্ঞ দ্বীনদার চিকিৎসকের মতামত জরূরি। -আলমুহীতুল বুরহানী ৩/৩৫৯, আদ্দুররুল মূখতার ২/৪২২

২. গর্ভবতী: রোজা রাখার কারণে গর্ভবতী মহিলার নিজের কিংবা সন্তানের প্রাণহানি বা মারাত্মক স্বাস্থহানির প্রবল আশঙ্কা হলে তার জন্য রোজা না রাখা জায়েয। পরে এ রোজা কাযা করে নেবে। -আলমুহীতুল বুরহানী ৩/৩৫৯

৩. দুগ্ধদানকারিনী: দুগ্ধদানকারিনী মা রোজা না রাখলে যদি সন্তান দুধ না পায় আর ওই সন্তান অন্য কোনো খাবারেও অভ্যস্ত না হয়, ফলে দুধ না পাওয়ার কারণে সন্তানের মারাত্মক স্বাস্থহানির আশঙ্কা হয়, তাহলে এ অবস্থায় তার জন্য রোজা না রাখার অনুমতি আছে। তবে পরে ওই রোজা করে নেবে।- রদ্দূল মুহতার ২/৪২২

হাদীম শরীফে ইরশাদ হয়েছে- ‘আল্লাহ তা’আলা মুসাফিরের জন্য রোজার হুকুম শিথিল করেছেন এবং আংশিক নামাজ কমিয়ে দিয়েছেন। আর গর্ভবতী ও দুগ্ধদানকারিনীর জন্যও রোজার হুকুম শিথিল করেছেন।’ -জামে তিরমিযী ১/১৫২, হাদীস ৭১৫

উপরোক্ত সকল ক্ষেত্রেই উল্লেখিত ব্যক্তিগণকে রমজানে না-রাখা রোজা পরবর্তী সময়ে কাযা করে নিতে হবে।

৪. দুর্বল বৃদ্ধ: বার্ধক্যের কারণে রোজা রাখতে সক্ষম না হলে রোজা রাখবে না। এরূপ ব্যক্তির জন্য রোজার পরিবর্তে ফিদ্য়া দেওয়ার নির্দেশ এসেছে।- সুরা বাকারা (২) : ১৮৪

ফিদ্য়া

* বার্ধক্য বা জটিল কোন রোগের কারণে যার রোজা রাখার সামর্থ্য একেবারেই নেই এবং পরবর্তী সময়ে কাযা করার সামর্থ্য ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনাও নেই- এমন ব্যক্তি রোজার পরিবর্তে ফিদ্য়া প্রদান করবে। ফিদ্য়া হল একজন মিসকিনকে দু’বেলা তৃপ্তিসহ খাওয়ানো বা এর মূল্য দেওয়া।

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন- ‘(তরজমা) আর যাদের জন্য রোজা অত্যন্ত কষ্টকর, তারা এর পরিবর্তে ফিদ্য়া তথা মিসকিনকে খাদ্য দান করবে।’ – সুরা বাকারা (২) : ১৮৪

* এক রোজার পরবির্তে এক ফিদ্য়া ওয়াজিব হয়। -আদ্দুররুল মুখতার ২/৪২৬

* রমজান শুরু হওয়ার পর পুরো মাসের ফিদ্য়া একত্রে দেওয়া যাবে। -আদ্দুররুল মুখতার ২/৪২৭

* উপরোক্ত দুই শ্রেণির মানুষ (অর্থাৎ দুর্বল বৃদ্ধ ও এমন রোগী বাহ্যত যার রোজা কাযা করার শক্তি ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা নেই) ব্যতীত অন্য যাদের জন্য রোজা না রাখা জায়েয আছে যেমন- গর্ভবতী ও শিশুকে দুগ্ধদানকারিনী ওযরের কারণে. অনুরূপভাবে মুসাফির ব্যক্তি সফরের কারণে রোজা না রাখলে রোজার ফিদ্য়া দেবে না; বরং পরে কাযা করবে। আর যদি ওই ওযর অবস্থায় মারা যায়, তাহলে তাদের ওপর কাযাও নেই, ফিদ্য়ার অসিয়ত করাও জরুরি নয়। অবশ্য ওযর শেষ হওয়ার পর কাযার সময় পেয়েও যদি কাযা না থাকে, তারপর মারা যায়, তাহলে ওযরের পর যে কয়দিন রোজা রাখার সময় পেয়েছে সে কয়দিনের জন্য ফিদ্য়ার অসিয়ত করে যেতে হবে। -রদ্দুল মুহতার ২/৪২৩-৪২৪

* ওযরবশত ছুটে যাওয়া রোজা যত তারাতাড়ি সম্ভব কাযা করে নেওয়া জরুরি। কোনো কারণে কাযা সম্ভব না হলে মৃত্যুর আগে ফিদ্য়া দেওয়ার অসিয়ত করে যাওয়া জরুরি। অসিয়ত না করে গেলে ওয়ারিশরা যদি মৃতের পক্ষ থেকে এমনিতেই ফিদ্য়া আদায় করে দেয়, তবে আশা করা যায় আল্লাহ তাআলা তা কবুল করবেন। -রদ্দুল মুহতার ২/৪২৩-৪২৪, ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/২০৭

* এক রোজার ফিদ্য়া একজন মিসকিনকে দেওয়াই উত্তম। তবে একাধিক ব্যক্তিকে দিলেও ফিদ্য়া আদায় হবে। তেমনি একাধিক ফিদ্য়া এক মিসকিনকেও দেওয়া জায়েয। -রদ্দুল মুহতার ২/৪২৩-৪২৪

*ছোট বাচ্চা বা নাবালেগ যে পূর্ণ খাবার খেতে পারে না, তাকে খাওয়ালে ফিদ্য়া আদায় হবে না। -ফাতাওয়া খানিয়া ২/২০

* অক্ষম বৃদ্ধ ও মৃত্যুমখে পতিত রোগী যদি সুস্থতা ফিরে পায় এবং পুনরায় রোজা রাখতে পারে, তাহলে আগে ফিদ্য়া আদায় করে থাকলেও ছুটে যাওয়া রোজাগুলোর কাযা আদায় করতে হবে। এক্ষেত্রে আগের আদায়কৃত ফিদ্য়ার জন্য সদকার সওয়াব পাবে। আদ্দুররুল মুখতার ২/৪২৭

 

শাওয়াল মাসের ছয় রোজা

শাওয়াল মাসে ছয়টি রোজা রাখা মুস্তাহাব। হাদীস শরীফে এর অনেক ফযিলত বর্ণিত হয়েছে। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন – ‘যে ব্যক্তি পুরো রমজন এবং সাথে শাওয়াল মাসে ছয়টি রোজা রাখল, সে যেন সারা বছরই রোজা রাখল।’ -সহীহ মুসলিম, হাদীস ১১৬৪

* শাওয়াল মাসের প্রথম দিন অর্থাৎ ঈদুল ফিতরের দিন বাদ দিয়ে বাকি যে কোনো দিন এ ছয় রোজা রাখা যায়।

* ছয় রোজা একাধারেও রাখা যায় আবার মাঝে বিরতি দিয়েও রাখা যা। উভয়ক্ষেত্রেই নির্ধারিত সওয়াব পাওয়া যাবে। তবে মাঝে বিরতি দিয়ে রাখা উত্তম। -লাতায়িফুল মাআরিফ ৪৮৯, বাদায়েউস সানায়ে ২/২১৮, আলমাজমূ ৬/৪২৬, রদ্দুল মুহতার ২/৪৩৫

* শাওয়াল মাসের ছয় রোজা স্বতন্ত্র নফল রোজা। তাই শাওয়াল মাসে কাযা রোজা বা মান্নতের রোজা রাখলে ছয় রোজার ফযিলত পাওয়া যাবে না; বরং ভিন্নভাবে নফল রোজা রাখতে হবে। খুলাসাতুল ফাতাওয়া ১/২৫১, বাদায়েউস সানা ২/২২৮, আলমুহীতুল বুরহানী ৩/৩৪৪, ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/১৯৭

মোহাম্মদ মাহমুদুর রহমান (লেখক, আলোচক ও গবেষক)

শায়খুল হাদিস জামিয়া ইসলামীয়া ইমদাদুল উলুম মাদরাসা, সানারপাড়

খতিব বায়তুল মামুর জামে মসজিদ, শারুলিয়া, ডেমরা

Share Button