রাজধানীতে বেড়েই চলেছে চিকুনগুনিয়ার সংক্রমণ। কাজে আসছে মশা নিধনে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন কর্মসূচি। চিকিৎসকদের প্রাইভেট চেম্বার, হাসপাতাল ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে প্রতিদিন শত শত রোগী আসছেন এই রোগে আক্রান্ত হয়ে। স্বাস্থ্য অধিদফতর বলছে, এই রোগের সংক্রমণ আগামী সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে চিকুনগুনিয়া রোগের কারণ এডিস মশার প্রজনন ক্ষেত্র ধ্বংস করতে এবং এ রোগ নিয়ে জনসচেতনতা তৈরি করতে স্বাস্থ্য অধিদফতরের উদ্যোগে রাজধানীর ৯২টি স্পটে মাঠে নামছেন মেডিক্যাল শিক্ষার্থীরা।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ জানান, আগামী ১৭ জুন রাজধানীর সরকারি-বেসরকারি সব মেডিক্যাল ও ডেন্টাল কলেজ, নার্সিং ইনস্টিটিউট, প্যারামেডিক্যাল ইনস্টিটিউট, মেডিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্ট ট্রেনিং ইনস্টিটিউট ও জনস্বাস্থ্য বিষয়ক স্নাতকোত্তর চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা চিকুনগুনিয়া ঠেকাতে অভিযানে নামবেন। মশক নিধন স্বাস্থ্য অধিদফতরের কাজ না হলেও চিকুনগুনিয়া নির্মূলে বিকল্প কোনও পথ নেই। সে কারণেই চিকুনগুনিয়ার প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে সিটি করপোরেশনকে সহায়তা করতে এ উদ্যোগ নিয়েছে অধিদফতর।

স্বাস্থ্য অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, চলতি মাসের ১ থেকে ৫ তারিখ পর্যন্ত রাজধানীর ৪৭টি ওয়ার্ডে এডিস মশার প্রজনন ক্ষেত্র শনাক্ত করার একটি জরিপ চালানো হয়। জরিপে ২৩টি ওয়ার্ডে স্বাভাবিক মাত্রার অনেক বেশি পরিমাণে পাওয়া গেছে এডিস মশার উপস্থিতি। এডিস মশার উপস্থিতি শনাক্তের জন্য ব্যবহার করা হয় ব্রুটো ইনডেক্স। এই ইনডেক্সের স্বাভাবিক মাত্রা ২০ হলেও ৪৭টি ওয়ার্ডে এর মাত্রা স্বাভাবিকের দ্বিগুণেরও বেশি— ৫২। এর মধ্যে ধানমন্ডি, কলাবাগান, কাঠালবাগান এলাকার ব্রুটো ইনডেক্স পাওয়া গেছে ১৩৩! এসব এলাকায় চিকুনগুনিয়ার প্রকোপও বেশি।

ডা. আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘এককভাবে স্বাস্থ্য বিভাগ বা সিটি করপোরেশনের পক্ষে এডিস মশা নির্মূল করা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন সামাজিক আন্দোলন। এ কারণেই সবার মনোযোগ আকর্ষণ করতে অভিযান চালাবেন মেডিক্যাল সংশ্লিষ্টরা।’ তিনি বলেন, ’১৭ জুন রাজধানীর ৯২টি স্পটে সাদা অ্যাপ্রোন পরিহিত চিকিৎসাবিজ্ঞান সংশ্লিষ্ট হাজার হাজার শিক্ষার্থী এডিস মশা নিধনে নামবেন।’ এ অভিযান চালানোর জন্য ১৪, ১৫ ও ১৬ জুন মেডিক্যাল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষার্থীদের ওরিয়েন্টেশন করানো হবে বলেও জানা গেছে অধিদফতর সূত্রে।

মেডিক্যাল শিক্ষার্থীদের অভিযানে নামানোর কারণ জানতে চাইলে আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘কেবল ঘরের বাইরে নয়, ঘরের ভেতরে অর্ধস্বচ্ছ পানি, ফুলের টব, ফেলে রাখা কৌটা বা বোতল, পানির ট্যাংক, ছাদে জমে থাকা পানি, পরিত্যক্ত টায়ার, আবর্জনার স্তুপ বা ডাবের খোসার ভেতরেও জন্ম নেয় এডিস মশা। সিটি করপোরেশনের কর্মীরা ঘরের ভেতরে ঢুকতে পারে না। তাই ঘরে ঘরে সচেতনতা ছড়িয়ে দিতে সাদা অ্যাপ্রোন পরে মেডিক্যাল শিক্ষার্থীরা কাজ করবে।’

এডিস মশার ক্ষতিকর প্রভাবের কথা জানাতে গিয়ে আবুল কালাম বলেন, ‘এই মশা চিকুনগুনিয়া, ডেঙ্গু ও জিকা রোগের বাহক। এর মধ্যে চিকুনগুনিয়া প্রাণঘাতী না হলেও সঠিক সময়ে রোগ নির্ণয় না করা গেলে ডেঙ্গু মৃত্যুর কারণ হতে পারে। আবার, চিকুনগুনিয়া জ্বরে মৃত্যু না হলেও ভোগান্তি পোহাতে হয় মাসের পর মাস। সম্পূর্ণ স্বাভাবিক হতে কারও কারও চার থেকে ছয় মাসও লেগে যাচ্ছে।’ তিনি জানান, আমাদের দেশে এখনও তেমন প্রাদুর্ভাব না দেখা গেলেও জিকা ভাইরাসও অত্যন্ত ক্ষতিকর। গর্ভবতী নারী এই ভাইরাসে আক্রান্ত হলে নবজাতক মাইক্রোসেফালি রোগে আক্রান্ত হতে পারে। এই রোগে নবজাতকের মস্তিষ্কের আকার ছোট হয়, যার পরিণতি অনিরাময়যোগ্য বুদ্ধি প্রতিবন্ধিতা। এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ না করা গেলে সেটা তাই জাতীয় দুর্যোগ বয়ে আনতে পারে বলে মন্তব্য করেন স্বাস্থ্য অধিদফতরের এই কর্মকর্তা।

Share Button