চট্টগ্রাম বন্দরের প্রস্তাবিত ‘বে টার্মিনাল’ কারিগরি ও অর্থনৈতিকভাবে নতুন বন্দর হিসেবে গড়ে তোলার উপযুক্ত। চট্টগ্রাম বন্দরের সমান লম্বা এই টার্মিনালের মূল অবকাঠামো নির্মাণে খরচ হতে পারে ২ বিলিয়ন ডলার। যন্ত্রপাতিসহ খরচ হবে ২ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার। এই টাকা খরচ করেই চট্টগ্রাম বন্দরের চেয়ে তিন গুণ বেশি পণ্য পরিবহনক্ষমতার জাহাজ ভেড়ানো সম্ভব হবে।

বে টার্মিনাল নির্মাণের কারিগরি, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় এই চিত্র উঠে এসেছে। জার্মানির পরামর্শক প্রতিষ্ঠান শেল হর্নের নেতৃত্বে একই দেশের এইচপিসি হামবুর্গ পোর্ট কনসালটিং এবং দেশীয় কেএস কনসালট্যান্টস লিমিটেড নামের দুটি প্রতিষ্ঠান এই সমীক্ষা করেছে। সম্প্রতি সমীক্ষার চূড়ান্ত খসড়া প্রতিবেদন বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দিয়েছে পরামর্শক প্রতিষ্ঠানটি।

বন্দর জলসীমার শেষ প্রান্তে চট্টগ্রাম ইপিজেডের পেছনে সাগরপাড় থেকে জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামের অদূরে রাসমনিঘাট পর্যন্ত প্রায় ছয় কিলোমিটার লম্বা এলাকায় এই টার্মিনাল গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে বন্দরের। এর মধ্যে সাড়ে তিন কিলোমিটার লম্বা এলাকাজুড়ে পণ্য পরিবহনের তিনটি টার্মিনাল নির্মাণ করা হবে। চট্টগ্রাম বন্দরের ১৯টি জেটিও লম্বায় সাড়ে তিন কিলোমিটার।

বন্দর পর্ষদের সদস্য (প্রশাসন ও পরিকল্পনা) যুগ্ম সচিব মো. জাফর আলম বলেন, প্রস্তাবিত স্থানে কারিগরিভাবে বন্দর নির্মাণ সম্ভব বলে সমীক্ষা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। অর্থনৈতিকভাবেও এই প্রকল্প আকর্ষণীয়। জাহাজ চলাচলের পথে (চ্যানেলে) পলি জমার হারও কম। সমীক্ষায় এমন বহুবিধ সুবিধার কথা তুলে ধরা হয়েছে।

সমীক্ষার তথ্য উদ্ধৃত করে মো. জাফর আলম বলেন, প্রস্তাবিত টার্মিনালে প্রাথমিকভাবে ৩০০ মিটার লম্বা এবং ১২ মিটার ড্রাফটের (জাহাজের পানির নিচের অংশের দৈর্ঘ্য) জাহাজ ভেড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। খননকাজ, স্রোতনিরোধক প্রাচীর, তিনটি টার্মিনালসহ মূল অবকাঠামো নির্মাণে খরচ হবে ২ বিলিয়ন ডলার। তবে যন্ত্রপাতি, পরিচালন খরচসহ ধাপে ধাপে দীর্ঘ মেয়াদে ৩ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার খরচ হতে পারে। এই বিনিয়োগ উঠে আসবে সাড়ে ১১ বছরে।

আমদানি-রপ্তানি পণ্য পরিবহন বাড়তে থাকায় চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ২০১২ সালে প্রথম এই টার্মিনাল নির্মাণের উদ্যোগ নেয়। এরই অংশ হিসেবে এই সমীক্ষা প্রণয়ন করা হয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরের সীমাবদ্ধতা থাকায় বড় আকারের জাহাজ জেটিতে ভেড়ানো যায় না। বন্দরে এখন গড়ে দেড় হাজার একক কনটেইনারবাহী জাহাজ ভেড়ানো হলেও প্রস্তাবিত টার্মিনালে চার হাজার একক কনটেইনারবাহী জাহাজ ভেড়ানো সম্ভব হবে।

সমীক্ষা অনুযায়ী, প্রস্তাবিত বে টার্মিনালের বড় সুবিধা হচ্ছে এক বছর পরপর একবার রক্ষণাবেক্ষণ খননকাজ করে বন্দরে জাহাজ ভেড়ানো যাবে। এর ফলে বন্দর পরিচালনায় খরচও কমবে। আবার প্রস্তাবিত বে টার্মিনালের সঙ্গে সড়ক, অভ্যন্তরীণ নৌপথ ও রেলে পণ্য পরিবহনের সহজ যোগাযোগের সুবিধা রয়েছে। টার্মিনালের পাশে ঢাকামুখী সড়ক ও রেল যোগাযোগ থাকায় খুব বেশি বিনিয়োগ করতে হবে না।

বন্দর পর্ষদের সাবেক সদস্য হাদী হোসাইন বলেন, সমীক্ষা প্রতিবেদনে যেহেতু কারিগরি ও অর্থনৈতিক উপযুক্ততা তুলে ধরা হয়েছে তাই এখন নতুন বন্দর নির্মাণে দ্রুত কর্মপরিকল্পনা করা উচিত। কারণ চট্টগ্রাম বন্দর আমদানি-রপ্তানি পণ্য পরিবহনের চাপ আর নিতে পারছে না।

প্রসঙ্গত, দেশের সমুদ্রপথে আমদানি-রপ্তানি পণ্য পরিবহনের ৯৩ শতাংশই চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে আনা-নেওয়া হয়। বাকি ৭ শতাংশ মোংলা বন্দর দিয়ে পরিবহন করা হয়। তৃতীয় বন্দর হিসেবে পায়রাতে কনটেইনার পরিবহনের সুবিধা গড়ে তোলা যায়নি।

বন্দরসূত্রে জানা গেছে, সাগরতীর থেকে ১ কিলোমিটার দূরে জেগে ওঠা চরের মাঝের নৌপথ ব্যবহার করে জাহাজ আনা-নেওয়া হবে। সমীক্ষায় বলা হয়েছে, এই চর ব্যবহার করে ‘ব্রেকওয়াটার’ বা স্রোতনিরোধক প্রাচীর গড়ে তোলা সম্ভব। স্বাভাবিক জোয়ারের পাশাপাশি ঘূর্ণিঝড়ের সময় ঢেউয়ের আঘাত থেকে জাহাজ ও জেটি স্থাপনা রক্ষা করতে ‘ব্রেকওয়াটার’ গড়ে তুলতে হবে। এ জন্য সমীক্ষায় ১৪ মিটার উঁচু স্রোতনিরোধক প্রাচীর নির্মাণ করার সুপারিশ করা হয়।

বন্দরের তথ্য অনুযায়ী, প্রস্তাবিত বে টার্মিনালের চ্যানেলে (জাহাজ চলাচলের পথ) পানির স্বাভাবিক গভীরতা স্থানভেদে ৬ থেকে ১০ মিটার। সমীক্ষা অনুযায়ী, প্রস্তাবিত টার্মিনালে ১২ মিটার ড্রাফটের জাহাজ ভেড়ানোর জন্য মূল চ্যানেলে ৪৭ লাখ ঘনমিটার বালু উত্তোলন করতে হবে। সাগরের যে পথে জাহাজ আসবে, সেই পথেও খননকাজ করতে হবে। এ জন্য দেড় কোটি ঘনমিটার বালু অপসারণ করতে হবে। অবশ্য সাগরে খননকাজ না করেও শুধু চ্যানেলে খননকাজ করে সাড়ে ১০ মিটার গভীরতার জাহাজ ভেড়ানো যাবে বলে জানিয়েছেন বন্দর পর্ষদের সদস্য জাফর আলম।

বন্দর কর্মকর্তারা জানান, বে টার্মিনালের জন্য ৯০৭ একর জমি অধিগ্রহণের কাজ চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। জেটি নির্মাণের পর প্রায় ১ হাজার ৬০০ একর জমি সাগর থেকে পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হবে। বন্দর কর্তৃপক্ষ ২০২১ সালের মধ্যে প্রথম ধাপে বে টার্মিনালে পণ্য ওঠানো-নামানোর কাজ শুরু করার পরিকল্পনা নিয়েছে।

Share Button