কীটপতঙ্গ-বিশারদদের বলতে শুনেছি যে এ বছর ডেঙ্গু-এক্সপার্ট-এডিস মশা নাকি আগের চাইতে বিপজ্জনক অ্যাকটিভিটিতে নেমেছে। একই সঙ্গে তাদের তিনটি প্রকল্পে কাজ চলছে। চিকুনগুনিয়া, ডেঙ্গু ও জিকা। এগুলোকে ছড়িয়ে দেওয়ার ব্যাপক ব্যস্ততা যাচ্ছে তাদের। তবে ফার্স্ট প্রায়োরিটি চিকুনগুনিয়ায়। আমার ধারণা, এবারের মশা ডিজিটাল। তিনটি অপশন নিয়ে নেমেছে।
তারা কার্যপরিচালনা ও এক্সিকিউশনের মূল জায়গা নির্ধারণ করে নিয়েছে রাজধানী শহরকে। আর ডেরা বেঁধেছে আক্রমণ-সংক্রমণের জন্য বনেদি এলাকায়। তাদের প্রকোপ এতটাই দুর্বিনীত আর দুর্বিষহ যে প্রতিরোধ বা ধ্বংসে মনুষ্য-মস্তিষ্ক কোনো বুদ্ধি বের করার আগেই নিজেদের কাজ সিদ্ধি করে নিচ্ছে নির্বিঘ্নে। এই স্ট্র্যাটেজিতে তাদের সাফল্য শতকরা এক শ ভাগ।
আমাদের বিশারদদের মতে, তারা এখনো মানুষের মরে যাওয়া নিয়ে ভাবছে না। রোগে তেমন মৃত্যুসংবাদ নেই। শুধু প্রচণ্ড ব্যথার ভোগান্তিটাই রয়েছে মানুষের, মরছে না। এ ব্যাপারে পরিচিত একজন চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত ভুক্তভোগী বন্ধু বলেছেন, নরকের শাস্তির প্রাথমিক প্র্যাকটিস। সেখানে নাকি ব্যথা-বেদনায় আধমরা হলেও পুনরায় মারা যাওয়ার ব্যবস্থা নেই। যন্ত্রণা ভোগ করে যেতেই হবে। সেই রকমের টেস্টে আছি, ভাই।
তো, মশা গবেষকদের কথায় জানলাম, ডেঙ্গুর পাশাপাশি এ বছর অ্যাডিশনাল বড় কাজটি হলো চিকুনগুনিয়া। প্রধান কাজই বলা যায়। এই রোগের বাহক এডিস মশার শরীরের সাইজ দেখলে আসলে বিশ্বাসই হয় না, এরা অত বড় ঘটনা ঘটাচ্ছে। নিতান্তই ক্ষুদ্র। শূককীট আর মূককীট অবস্থা থেকে মাত্রই অবয়ব পাওয়া। অতি ক্ষুদ্র। খালি চোখে প্রায় দেখাই যায় না। গায়ে বসলেই শুধু টের পাওয়া যায়।
বোঝাই যাচ্ছে যে বড়রা শিশুদের এই কাজে নামাচ্ছে। অনেকটা সন্ত্রাসীদের মতো। আফ্রিকার কোনো কোনো অঞ্চলে বিদ্রোহীরা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে নাকি এই দুর্মতি করে। তো, এই এডিস মশারা তো আফ্রিকা থেকেই এসেছে শোনা যায়। সবকিছুই শিখে এসেছে মনে হয়। তবে এই পিচ্চিরাই রক্ত চুষে চুষে ইয়া ঢোল পেট করে ফেলে নিমেষে। বড় আকার ধারণ করেছে। ছবিতে এ রকমটাই দেখা যায়।
এই ক্ষুদ্র মশকগোষ্ঠী এত শক্তিধর যে কোনো চ্যাম্পিয়ন কুস্তিগিরকে মাসখানেকের জন্য অন্তত শয্যাশায়ী করে রাখার ক্ষমতা রাখে। কুস্তিগির না হলেও কয়েকজন ইয়া-দশাসই মানুষকে প্রায় নির্জীব হয়ে যেতে দেখেছি। দশাসই হলেও মশাসই এডিসের কাছে দারুণ কুপোকাত হয়েছেন। মোটাসোটা হলেও চিকুন থেকে রক্ষা পাননি।
আমি ততটা দশাসই নই। তবে যথেষ্ট ওজনদার। সুযোগ পেলেই এ রোগ-সে রোগে ধরার সুযোগ থাকেই। তাই রোগবালাইয়ের ব্যাপারে সাবধানতা অবলম্বন করেই চলি। চিকুনগুনিয়া নিয়ে টিভিতে ডাক্তার আর বিশেষজ্ঞদের উপদেশ-পরামর্শে যা যা থাকে, সেসব আমি অক্ষরে অক্ষরে পালন করি। শুনেছি এর প্রতিষেধক নাকি তেমন নেই। কমপক্ষে দিন পাঁচেক ভুগতে হবে। এ কদিন একমাত্র সস্তায় প্যারাসিটামলের সঙ্গে লিটারকে লিটার পানি। তাই প্রতিরোধ আর সাবধানতাই একমাত্র প্রধান উপায়, কথাটা মেনে চলি। আমি কোনো ত্রুটি রাখি না। সব উপদেশকে শিরোধার্য করে চার মাস ধরে অগাধ খরচ-খরচা করে যাচ্ছি সরল বিশ্বাসে।
এই ব্যাপারে বলা যায়, মসকুইটো কয়েল কোম্পানি, কীটনাশক স্প্রে, মশা-জব্দে কারেন্টে চলা শিশির ওষুধ, কেরোসিন ইত্যাদির নির্মাণপ্রতিষ্ঠানগুলোকে কিছুটা হলেও বেশ সমৃদ্ধ হতে সহায়তা করেছি।
সিটি করপোরেশনের পরামর্শ অনুযায়ী বাসার ফুলের টবের, টায়ারের, ড্রেন-ডোবার পানি ছা-পোষা লিমিটেড প্যাকেট খালি করে লোক লাগিয়ে পানিহীন করেছি। অতিপ্রিয় ফুল-ফলের গাছগাছালি, ঝোপঝাড় কর্তন করেছি। কোনো কোনোটা নিশ্চিহ্ন করতেও দ্বিধা করিনি।
তারপরও আতঙ্ক যায় না। শরীর একটু বিগড়ে যাওয়ার ভাব দেখলেই মনে হয়, এই বুঝি ধরল চিকুনগুনিয়া কিংবা ডেঙ্গুতে। মাস দেড়েক আগে তবু দীর্ঘমেয়াদি ভাইরাল জ্বরে ভুগলাম। বন্ধুদের অনেকেই চিকুনগুনিয়া ভেবে বাসায় আসা থেকে বিরত থাকল। কিন্তু আনন্দের কথা, ভাবনাটা সত্যি হয়নি।
জ্বরের পর বেশ ফুরফুরে মেজাজে ছিলাম। কিন্তু দিন দশেক আগে সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি, বাম কনুইতে প্রচণ্ড ব্যথা। হাত ভাঁজ করা যায় না এমন দুরবস্থা। তবে কিছুটা নিশ্চিন্ত বোধ করলাম যে ছবি আঁকার হাতটিতে ব্যাপারটি হয়নি।
ছবি আঁকা, লেখা—সবই তো ডান হাতে। শুধু বাথরুমের ক্রিয়াকর্ম ছাড়া বাম হাতের তো তেমন কোনো গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহার নেই। এ-ও বললাম যে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন টেনিস খেলোয়াড় ফেদেরারদের এই রোগ কোনো দিন ধরেছে, এমনটা শুনিনি!
হঠাৎ মনে পড়ল, আরে তাই তো! চার মাস ধরে তো র‍্যাকেট হাতে নিয়ে একটি খেলাই খেলছি। চীনে নির্মিত টেনিস র‍্যাকেটসদৃশ জিনিসটি। মশা মারার নতুন প্রযুক্তি। তা-ই দিয়ে শাঁই শাঁই করে ঘুরিয়ে এডিস মশা মারার খেলা চালিয়ে যাচ্ছি। খুব কাজ হয় না। সারা দিনে নেহাতই বোকাসোকা দু-তিনটি মারা পড়ে। তা-ও সেসব এডিস নাকি ইদানীং আলোচনায় পিছিয়ে পড়া এনোফিলিস, কে জানে! পরক্ষণেই মনে হলো, আরে সেটাও তো বাম হাতে ধরি না, ডান হাতেরই কাণ্ড! আসলে ন্যাটা না হলে ডান হাতেই সব। খাওয়াদাওয়া, ছবি আঁকা, লেখালেখি, হ্যান্ডশেক, সালাম—এমনকি সভা-সমিতিতে গরম বক্তৃতাকালে প্রয়োজনে দক্ষিণহস্তই মুষ্টিবদ্ধ হয়ে ওঠানামা হয় মাইকের সামনে!
পরদিন ঘুম থেকে ওঠার পর সবকিছু গোলমাল হয়ে গেল। এবার ডান হাতের কনুই। সব হিসাব-নিকাশ ভন্ডুল। দুপুরে ব্যথা নিয়েই জরুরি কাজে বের হয়েছিলাম। গাড়ি করে বাসায় ফিরলাম। নামতে যাব, দেখি পুরো শরীর ঐরাবতী-ওজন ধরে বসে আছে। নিজের শরীর নিজেই চিনতে পারি না। তুলতেও পারি না। হাত, আঙুল, গোড়ালি, কোমর, পায়ের তলা, হাঁটু—কিছুই কাজ করছে না। এগুলো যেন আমার নয়, অন্য কারোর আওতায়। তবে মাথাটা শুধু তখনো নিজের আছে, বুঝতে পারলাম। কারণ, চট করেই চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত পরিচিতজনদের বলা অভিজ্ঞতার কথা মনে পড়ে গেল। সিমটম মিলে যাচ্ছে হুবহু। বুঝলাম আমিতে আর আমি নেই। চিকুনগুনিয়া দখলে নিয়েছে শরীরটা। আমার হুকুমে কিছুই চলছে না। যা হোক, গাড়ি থেকে চ্যাংদোলা করে ঘরে নিয়ে আসার পর পরিচিত ডাক্তারকে ফোন করলাম। উনি পুরোটার ডেসক্রিপশন চাইলেন। বললাম সব। ডেসক্রিপশন শুনলেন কিন্তু প্রেসক্রিপশন দিতে পারলেন না। দিন পাঁচেক দেখতে বললেন। নিশ্চিত করলেন যে এডিসের কাণ্ডটাই ঘটেছে।
হঠাৎ শিল্পী আবুল বারক আলভীর কথা মনে পড়ল। সদ্য মুক্তি পাওয়া ভুক্তভোগী বলে তাঁর এক্সপার্ট ওপিনিয়ন জানতে ফোন করলাম। তিনি যা বললেন তার সঙ্গে আমার অবস্থাটার হুবহু মিল। যে জিনিসটা বাদ ছিল কিছুক্ষণ পর তা-ও এলএক শ দুই ডিগ্রি জ্বর। পূর্ণতা পেয়ে গেল এডিসের কুপোকাত করার সব প্রচেষ্টা। কমপ্লিট হলো কোর্স। চিকুনগুনিয়া আমাকেই গুনতিতে ধরে ফেলেছে।
ডাক্তার বলে দিয়েছিলেন ব্লাড টেস্ট করিয়ে নিতে। শরীরের যে নট নড়ন-নট চড়ন দুর্বিষহ অবস্থা, তাতে রক্ত আছে কি নেই, চলাচল করছে কি না, তা-ই তো বোঝার উপায় নেই। নিঃসাড় শুয়ে থাকতে থাকতেই ভাবনাটা মাথায় এল যে সংশ্লিষ্ট মশারা কি পরীক্ষার জন্য রক্ত শরীরে বাকি রেখেছে!
তা ছাড়া ক্লিনিকে যে সুই ফুটিয়ে রক্ত নেওয়ার ব্যাপার, তাতে আমার ভয় চিরকালের। ইনজেকশনেই ভীতি। এখন রোগে পড়ে সেই ভীতি কেটে গেছে অনেকটাই। মশারা ইনজেক্ট করে করে সেই ভয় কাটিয়ে দিয়েছে। এ নিয়ে গত শতকের আশির দশকে একটা কার্টুন এঁকেছিলাম। সেটি মনে পড়ে মাঝে মাঝেই। এবারও মনে পড়ল। কার্টুনটি ছিল এই রকমের—টোকাই সঙ্গে এক বয়ামভর্তি মশা নিয়ে ডাক্তারকে বলছে, ‘ডাক্তার সাব, এই যে নেন। এগো পেটভর্তি আমার রক্ত। পরীক্ষার জন্য ধইরা আনছি। ইনজেকশন-ভীতির কারণে ওই ব্যবস্থা।
আমার মনে হচ্ছিল সেই কাজ এবার আমিই করি। কিন্তু মশাগুলোকে তো চোখেই দেখা যায় না এমন। ধরার উপায় নেই। অবশ্য পাঁচ দিনের অপেক্ষা করে দেখার পালা এখনো কাটেনি। চতুর্থ দিন চলছে। ইতিমধ্যে অনেকেই জেনে গেছে। ভয়ংকর রোগ জেনে বন্ধুদের আসা বন্ধ। লাভের দিক হলো যে পাওনাদারেরাও ভয়ে পা মাড়াচ্ছেন না এদিক।
এরই মাঝে কাকতালীয় একটি ঘটনা ঘটল। হঠাৎ দুপুরে মোবাইলটা বেজে উঠল। ধরলাম। অপর প্রান্তে পরিশীলিত কণ্ঠ। বললেন, ‘নবী ভাই, আসসালামু আলাইকুম। কেমন আছেন? শহর সৌন্দর্যকরণ নিয়ে আমরা কয়েকজন একটু বসতে চাই। আপনাকে থাকতেই হবে। ব্যাপারটা জরুরি। বললাম, আমি তো চিকুনগুনিয়ায় শয্যাশায়ী। তা কে বলছেন,
নাম না বলে দুঃখ প্রকাশ করলেন তিনি, সর্বনাশ, আপনাকেও ধরেছে? সরি নবী ভাই। সুস্থ হয়ে নিন, পরে আলাপ করব।
এ কথা বলা শেষে নিজের নামটি বললেন, আমি আনিস বলছি। আনিসুল হক। মেয়র। ছাড়ি, ভালো থাকেন।
সামনে সকালের পত্রিকা। চোখ গেল প্রথম পৃষ্ঠায়। তাতে দেখি, দুই মেয়রের ওপরে কার্টুন আঁকা, মশা নিয়ে। বুঝলাম, তাঁরা হেভি সমালোচনার মধ্যে আছেন।
তবে আমি দুই ম-এর মধ্যে কে বড়, তুলনা করছিলাম—মানে মেয়র না মশা। এই মুহূর্তে মশাই চ্যাম্পিয়ন!

Share Button