কিছুদিন হলো বিশ্বজুড়ে দেখেছি-শুনছি তারকার আত্মহত্যার খবর। তার মধ্যে একজন হলেন বাংলাদেশে মেকানিকস ও নেমেসিস ব্যান্ডের বেস গিটারিস্ট জেহিন। এর রেশ কাটতে না কাটতেই আত্মহত্যা করে বসলেন মডেল রিসিলা। তারকাদের আত্মহত্যার সারিতে নাম যোগ হচ্ছেই তো হচ্ছে, আর বিয়োগ হচ্ছেন অনেকের প্রিয় কোনো নাম।

আমি বুঝে–শুনেই আত্মহত্যা শব্দটা ব্যবহার করলাম, কারণ নামকরণ ঠিক রাখা চাই, পাছে ভুল বোঝাবুঝি হয়। আমি যদি বলি, তাঁরা নিজের জীবন নিয়েছেন, তাহলে তাঁদেরই দোষারোপ করা হবে তাঁদের মৃত্যুর জন্য। সেই ভুল আমি করতে চাই না। বরং চাই আমরা সবাই যাতে আত্মহত্যার কাঠামোগত কারণগুলোর দিকে নজর দিই। কাঠামোগত কারণগুলোর সঙ্গে যুক্ত হয় ব্যক্তিগতভাবে অপ্রীতিকর ঘটনা মেনে না নেওয়ার অক্ষমতা। সেটাও নির্ভর করে জীবনের অন্য অভিজ্ঞতা কেমন ছিল তার ওপর। গবেষণায় দেখা গেছে, যাঁদের ছোটবেলায় প্রতিকূল ঘটনা ঘটে, যেমন ধরুন যৌন নিপীড়ন বা নিয়মিত প্রহার, তার প্রভাব পরবর্তী জীবনেও পড়তে পারে এবং পড়েও থাকে সাধারণত। আসলে সেসব প্রতিকূল ঘটনা ঘিরেই তাঁদের ট্রমা (মানসিক আঘাত) থেকে যাওয়ার আশঙ্কা থাকেই। যদিও অনেক সময় তার বহিঃপ্রকাশ হয়তো ঘটে না। তবে সেটার প্রভাব পড়তে পারে জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রেও মানসিক, শারীরিক, আর্থিক, শিক্ষাবিষয়ক ইত্যাদি। এসব ট্রমা নিয়ে বেড়ে ওঠা মানুষের জীবন কেমন হবে বা হতে পারে, সেটা বোঝা মুশকিল। কারণ, কিছু মানুষ প্রাণোচ্ছল হন, কিছু হন না।

অনেকেই বলেন, আত্মহত্যা করার মতো স্বার্থপর কাজ আর কিছুই হতে পারে না। যাঁরা এটা বলেন, তাঁরা আত্মকেন্দ্রিকতার জায়গা থেকে এটা বলে থাকেন এবং এই বলাটায় বিদ্রূপ ও শ্লেষ মিশে থাকে। হয়তো বলেন, কারণ তাঁরা মানতে পারেন না যে একজন মানুষ আর কোনো উপায় পেল না! বা এটাও ভাবতে পারেন যে তাঁরা হয়তো আত্মহত্যার দিকে ঝুঁকে থাকা মানুষটিকে সাহায্য করতে পারতেন। তাঁরা ভাবেন, এমন মর্মান্তিক ঘটনা এড়ানো যেত। তবে একটা মাত্রা পর্যন্ত এমনটা ভাবা সুস্থই আছে।

অনেক সময় মানুষের দুঃখ অপরাধবোধে পরিণত হয়, সেটা অনেক সময়ই নিতে পারে বিরূপ প্রকৃতি। এটা তাঁদের আত্মহত্যার দিকেও ঠেলে দিতে পারে। সেটা নির্ভর করে তাঁদের জীবনের ও মানসিক অবস্থার ওপর। নির্ভর করে তাঁদের জীবনযাত্রার ওপরও।

সামাজিক মাধ্যমেও আমরা সচিত্র দেখেছি মানুষকে আত্মহত্যা করতে। কেউ কেউ লাইভ ভিডিও চালু করেও আত্মহত্যা করেছেন। সামাজিক মাধ্যমে যেহেতু তরুণ-তরুণীই বেশি, এ রকম প্রকাশ্যে আত্মহত্যা দেখে অভিভূত হওয়ার এবং আত্মহত্যা করার প্রচেষ্টার ঝুঁকিতে তাঁরাও পড়তে পারেন। একই রকমভাবে প্রিয় গায়ক বা তারকার বা শ্রদ্ধার পাত্রের আত্মহত্যা তীব্র প্রভাব ফেলতে পারে মানুষের ওপর। কারণ, এঁরা তাঁদের জীবনে কোনোভাবে মূল্যবান স্থান করে নিয়েছেন। বিশেষ করে যদি তাঁদের নিজেদের জীবনে কোনো ঘাটতি বা অপূর্ণতা থাকে, তখন প্রিয় তারকাদের প্রস্থানে তাঁরা খুব আপন কেউ চলে যাওয়ার কষ্ট পান।

তবে আত্মহত্যা করার প্রবণতা আছে কি না, তা আমরা জানব কীভাবে, বিশেষ করে যদি তার কোনো বহিঃপ্রকাশ না থাকে?

হয়তো জানব না। কিন্তু গবেষকেরা কিছু কারণ দেখিয়েছেন। মানসিক চাপ, বিষণ্নতা, আত্মসম্মানের অভাব, বাহ্যিক আচরণ নিয়ন্ত্রণ (এক্সটারনাল লোকাস অব কন্ট্রোল), আশাহীনতা, বেপরোয়া বোধ করা, হিস্টিরিয়াগ্রস্ত ব্যক্তিত্ব-বৈশিষ্ট্য (হিস্তেরিকাল পারসোনালিটি ট্রেট), দ্বিমেরুগত আচরণ বিভ্রাট (বাইপোলার পারসানালিটি ডিসঅর্ডার), উদ্বেগ, রাগ, আবেগ নিয়ন্ত্রণের সমস্যা ইত্যাদি। এসব মানুষকে ঠেলে দিতে পারে আত্মহত্যা করার দিকে। তবে এগুলো সবই লক্ষণ মাত্র, এসবের সঙ্গে যুক্ত আছে তাঁদের অতীতের কোনো মানসিক আঘাত বা ট্রমার ইতিহাস। এবং এসব ট্রমা, আগেই বলেছি কাঠামোগতভাবে সৃষ্টি হয় ব্যক্তির জীবনের শুরুতেই। আমাদের জীবনের ব্যবস্থাপনা, পুঁজিবাদী মতবাদ, সামাজিক নিয়ম-কানুন এবং পুরুষতান্ত্রিক নিয়মাবলি সবার ওপর চাপিয়ে দেয় সহিংসতা ও হিংস্রতা—এসব মিলেই এই কাঠামো, যার মধ্যে আমরা জীবন চালিয়ে নিই।

যাতে মানুষ এভাবে পিছলিয়ে না পড়ে, আমাদের সবার খেয়াল রাখতে হবে নিজেদের এবং অন্যের প্রতি।

আত্মহত্যার খবর কীভাবে মানুষের কাছে পৌঁছায়, সেটা গুরুত্বপূর্ণ। এ বিষয়ে দায়িত্বশীল হতে হবে সাংবাদিক ও গণমাধ্যমে যাঁরা খবর পরিবেশন করেন তাঁদের। গণমাধ্যম এবং সামাজিক মাধ্যম তথা ফেসবুক-টুইটার ইত্যাদিতে আত্মহত্যা নিয়ে উত্তেজনামূলক কথা বলা বা লেখার সময় সংবেদনশীল থাকতে হবে। কারণ, এ রকম খবর মানুষের মানসিক অবস্থার জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকারক। এটা আমরা এ কয়েক দিনের খবর দেখেই হয়তো বুঝতে পারছি যে একজনের আত্মহত্যা আরেকজনের ওপর সংক্রমিত প্রভাব ফেলে থাকতে পারে।

যেকোনো মৃত্যুই কষ্টদায়ক, তা পালটে দেয় আপনজনদের জীবন। পৃথিবী হয়ে যায় দুই ভাগে বিভক্ত: যাঁরা আপন কেউ হারিয়েছেন এবং যাঁরা হারাননি। মৃত্যু অনিবার্য, তারপরও কঠিন। তারপরও আমরা শিখিনি মৃত্যুকে বুঝতে। আমরা কাঁদতে পারি কিন্তু ভেতরে যে ফাঁকা জায়গা তৈরি হয় তা কীভাবে সামাল দিতে হয়, তা আমরা অনুধাবন করতে পারি না। আমরা ব্যস্ত হয়ে যাই নানান কাজে, ব্যস্ততায়, ভুলে থাকার জন্য। আর তাতে যদি কাজ না হয়, আমরা সহায়তা নিই কোনো মাদকদ্রব্যের বা অন্য কোনো নেশার। কিন্তু সান্ত্বনা হয়তো এই যে সাধারণভাবে মৃত্যু আমাদের হাতে না, তাই এটা মেনে নিতেও শিখেছি আমরা।

সে জন্যই হয়তো আত্মহত্যার মতো কোনো ঘটনার মুখোমুখি হলে আমরা প্রথমেই বলি, এটা কী করলেন? কেন করলেন? হতাশায় ভেঙে পড়ি। বুঝতে চাই না বা পারি না, ঠিক এমনটা হলো কেন বা হয় কেন?

কিন্তু বেঁচে যখন আছিই, চলুন ভেবে দেখি আমরাই বা কীভাবে বেঁচে আছি এই হিংস্র, ক্রুদ্ধ পৃথিবীতে? তাহলে হয়তো যাঁরা চলে গেলেন ,তাঁদেরও বুঝতে পারব।

নাদিন শান্তা মুরশিদ: সহকারী অধ্যাপক, ইউনিভার্সিটি অ্যাট বাফালো, স্টেট ইউনিভার্সিটি অব নিউইয়র্ক

Share Button