রেলপথে দুর্ঘটনা তুলনামূলক কম হলেও লেভেল ক্রসিংয়ে দুর্ঘটনায় জানমালের অনেক ক্ষতি হয়। সড়কপথে যানবাহন ও রেললাইনে ট্রেন আলাদা দুটি পথ ধরে চলে এবং শুধু লেভেল ক্রসিংয়েই এ দু’ধরনের বাহনের ‘সাক্ষাৎ’ হয়। কাজেই রেললাইন ও সড়কের যানবাহনের মধ্যে সংঘর্ষজনিত দুর্ঘটনা ঘটা একেবারে অপ্রত্যাশিত। অথচ সেটাই ঘটে চলেছে বারবার। গত ৯ আগস্ট জামালপুর শহরের চন্দ্রা লেভেল ক্রসিংয়ে কমিউটার ট্রেনের ধাক্কায় ইজিবাইক ছিটকে পড়ে দুমড়ে-মুচড়ে গেলে চালকসহ ৫ জন নিহত ও ৩ জন আহত হয়। লেভেল ক্রসিংয়ে গেটম্যান উপস্থিত থাকলে এবং সময়মতো গেটবার নামানো হলে ট্রেনের সঙ্গে ইজিবাইকের সংঘর্ঘের প্রশ্নই আসত না। পরিসংখ্যানে জানা যায়, বিগত ১০ বছরে রেলপথের ৬৩টি বৈধ ও অবৈধ লেভেল ক্রসিংয়ে ৯৬০টি দুর্ঘটনায় মারা গেছেন ২৮৬ জন। বস্তুত অরক্ষিত লেভেল ক্রসিং এবং লেভেল ক্রসিংয়ে নিয়মিত গেটম্যানের অনুপস্থিতির কারণেই দুর্ঘটনা ঘটছে। রেলওয়েতে কর্মরত অনেক চালক, গেটম্যান এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দায়িত্ব পালনে অবহেলার কারণে রেল যোগাযোগ ব্যবস্থার আশানুরূপ প্রসারও ঘটছে না।
টঙ্গী থেকে নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত ৩৫ কিলোমিটার রেলপথের মধ্যে ২৯ কিলোমিটারই রয়েছে রাজধানীর ভেতরে। এতটুকু রেলপথের ৩৫টি লেভেল ক্রসিংয়ের মধ্যে ২৫টিই অবৈধ। আর এসব লেভেল ক্রসিংয়ের কাছাকাছি গড়ে উঠেছে ২১টি বাজার, দোকানপাটসহ নানা অবৈধ স্থাপনা। এমনকি রেললাইনের ওপরই প্রতিদিন পণ্য বেচাকেনা করতে জড়ো হন অসংখ্য মানুষ। কমলাপুর থেকে টঙ্গী ব্রিজ পর্যন্ত লেভেল ক্রসিং অতিক্রম করে প্রতিদিন পার হয় শতাধিক ট্রেন। এখানে বেশিরভাগ ক্রসিং থাকে অরক্ষিত। পথচারী ও যানবাহনকে ক্রসিং পেরুতে হয় নিজ দায়িত্বে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে। এছাড়া রেলওয়ের মালিকানা ছাড়া রয়েছে কিছু অবৈধ অ্যাপ্রোচ রাস্তা। বিভিন্ন এলাকার অসচেতন জনগোষ্ঠী নিজেদের বাড়ির রাস্তা সোজা করতে রেললাইনের ওপর দিয়ে এখানে-সেখানে অবৈধভাবে অ্যাপ্রোচ সড়ক তৈরি করে। রাজধানীর মধ্যে অবস্থিত লেভেল ক্রসিং, লাইনের ওপর গড়ে ওঠা কাঁচাবাজার এবং অনুমোদনহীন অ্যাপ্রোচ সড়ক নগরবাসীর জন্য মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। রেললাইনে চলাচলকারী ট্রেনে প্রায়ই কাটা পড়ে মানুষ। নারায়ণগঞ্জ থেকে বঙ্গবন্ধু সেতু পর্যন্ত রেলওয়ের একটি থানা এলাকায় গেল বছরের ৯ মাসে বিভিন্ন সময়ে ট্রেনে কাটা পড়ে ১০৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। রেলওয়ে পুলিশের তথ্যানুসারে ওই ৯ মাসে দেশব্যাপী রেলপথ থেকে ৭২৯টি লাশ উদ্ধার করা হয়।
সারা দেশে মোট ২ হাজার ৮৩৫ কিলোমিটার রেলপথে অনুমোদিত ও অননুমোদিত ২ হাজার ৪৯৫টি লেভেল ক্রসিং রয়েছে। এর মধ্যে মাত্র ২৫৯টিতে গেটম্যান আছে, বাকি ২ হাজারের বেশি লেভেল ক্রসিং সম্পূর্ণ অরক্ষিত। কমলাপুর থেকে টঙ্গী পর্যন্ত ৩৭টি লেভেল ক্রসিংয়ের মধ্যে ২৪টি অনুমোদিত। বাকি ১৩টির অনুমোদন নেই। নরসিংদী জেলার প্রায় ৩০ কিলোমিটার রেলপথে শতাধিক লেভেল ক্রসিংয়ে রেলগেট, গেটবার ও গেটকিপার নেই। কাজেই অরক্ষিত লেভেল ক্রসিংয়ে ট্রেন দুর্ঘটনার আশঙ্কা থেকেই যায়।
দুর্ঘটনা এড়াতে লেভেল ক্রসিংয়ে গেটম্যানের সার্বক্ষণিক উপস্থিতির পাশাপাশি ট্রাফিক পুলিশের কর্মতৎপরতা নিশ্চিত করতে হবে। অনেক লেভেল ক্রসিংয়ের সংস্কার করা জরুরি। ট্রেন দুর্ঘটনা প্রতিরোধে দক্ষ চালকসহ রেল বিভাগের সর্বস্তরে যোগ্য ও প্রশিক্ষিত জনবল নিয়োগ করা আবশ্যক। পাশাপাশি ট্রেন দুর্ঘটনার জন্য দায়ী রেল বিভাগের কর্মচারীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

Share Button