মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের ওপর সরকারি বাহিনীর নির্যাতন বৃদ্ধির বিষয়টি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। বিশ্বের অন্যতম নিগৃহীত এই জনগোষ্ঠী যুগ যুগ ধরে মিয়ানমারে নির্যাতনের শিকার হলেও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহানুভূতি কমই পেয়েছে তারা। দেশটিতে শত শত বছর ধরে বসবাসকারী এই জনগোষ্ঠীর কয়েক লাখ সদস্য এখন বাংলাদেশে অবস্থান করছে। যখনই রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গারা হামলার শিকার হয়েছে, তারা দলে দলে বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নিয়েছে। এই আশ্রিত জনগোষ্ঠী যে একসময় আমাদের জন্য বহুমুখী সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়াবে, তা বলাই বাহুল্য। কয়েকদিন আগে সশস্ত্র হামলার পর রাখাইন রাজ্য অশান্ত হয়ে ওঠার জন্য দেশটির সরকার আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি নামের সংগঠনকে দায়ী করলেও বিভিন্ন সূত্রে জানা যাচ্ছে, রাখাইন রাজ্যে সরকারি বাহিনীর নির্মমতা অব্যাহত রয়েছে। দেশটির সেনাবাহিনীর সদস্যরা গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দিচ্ছে। গত কয়েকদিন ধরে সীমান্তের জিরো পয়েন্টে হাজার হাজার রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ-শিশু-বৃদ্ধ খোলা আকাশের নিচে দিন কাটাচ্ছে।
জানা গেছে, সাম্প্রতিক সহিংসতার ঘটনায় রাখাইনে শত শত রোহিঙ্গাকে নির্বিচারে হত্যা করা হয়েছে। হাজার হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। সীমান্তের ওপারে থেমে থেমে শোনা যাচ্ছে গুলির শব্দ আর মানুষের আর্তচিৎকার। এমনকি মাঝে মাঝে বোমার শব্দও শোনা যাচ্ছে। এছাড়া সীমান্তের ওপারে আকাশে কালো ধোঁয়া দেখে ফেলে আসা আপনজনের কথা ভেবে কাঁদতে দেখা গেছে অনেককে। এ ধরনের নির্যাতনের ফল কখনই ভালো হয় না। দেশটির সরকারি বাহিনীর উচিত সাম্প্রতিক সশস্ত্র হামলার সঙ্গে যারা জড়িত তাদের খুঁজে বের করা। তারা তা না করে নির্বিচারে নির্যাতন অব্যাহত রেখেছে।

মিয়ানমারে দীর্ঘদিন ধরে সামরিক শাসন চলাকালে শাসকগোষ্ঠী নানা অজুহাতে রোহিঙ্গাসহ আরও কয়েকটি সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠীর ওপর ব্যাপকভাবে নির্যাতন চালিয়ে এসেছে। সম্প্রতি দেশটিতে গণতন্ত্রের চর্চা শুরু হওয়ায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় আশা করেছিল এবার হয়তো রাখাইন রাজ্যের রোহিঙ্গারা তাদের ন্যায্য অধিকার ফিরে পাবে। কিন্তু তা হয়নি। মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের নেত্রী শান্তিতে নোবেল বিজয়ী অং সান সুচি দীর্ঘদিন গৃহবন্দি ছিলেন। বিশ্ববাসীর মনে এই ধারণা জন্মেছিল যে, তার বন্দিদশার অবসান হলে, দেশটিতে গণতন্ত্রের চর্চা শুরু হলে রেহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন বন্ধ হবে, তারা তাদের ন্যায্য অধিকার ফিরে পাবে। কিন্তু বিশ্ববাসী বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ্য করল, সুচি এসব বিষয়ে কোনো ইতিবাচক ভূমিকা রাখার চেষ্টা করছেন না। এটা দুঃখজনক।

রাখাইনে গত এক বছরে পুলিশের ওপর দু’বার হামলার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনার জন্য সশস্ত্র গোষ্ঠীকে দায়ী করা হয়। রোহিঙ্গাদের মধ্যে কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠীর উত্থান পুরো পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ দমনে সে দেশের সঙ্গে মিলে সীমান্তে যৌথ অভিযান চালানোর আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ। মিয়ানমার এ প্রস্তাবে ইতিবাচক সাড়া না দিলে এ সমস্যা আরও জটিল আকার ধারণ করতে পারে। যেহেতু রোহিঙ্গারা দলে দলে এসে বাংলাদেশে আশ্রয় নিচ্ছে, এ অবস্থায় বাংলাদেশের উচিত বিষয়টি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে যথাযথভাবে তুলে ধরা। মিয়ানমারের সরকার যদি রোহিঙ্গা সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধানের পরিবর্তে বল প্রয়োগের মাধ্যমে তাদের দমন করতে চায়, তাহলে সেখানে সহিংসতার মাত্রা আরও বৃদ্ধির আশঙ্কা থেকেই যায়।

Share Button