চালবাজির সুযোগে প্রতি কেজি চালে এখন ব্যবসায়ীদের অতিরিক্ত মুনাফা হচ্ছে সাড়ে ৫ টাকা। আন্তর্জাতিক বাজার এবং দেশীয় বাজার পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, সব খরচ এবং মুনাফা ধরেও মোটা চালের বাজারমূল্য হওয়া উচিত সর্বোচ্চ ৪৪ টাকা। কিন্তু একই চাল (মাঝারি) বাজারে বিক্রি হচ্ছে গড়ে ৫০ টাকা। এই অতিরিক্ত মুনাফা হাতিয়ে নেয়া হলেও কোনো ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে। পাশাপাশি জোরদার হচ্ছে না সরকারের বাজার মনিটরিং ব্যবস্থা।
সূত্র মতে, এক কেজি মোটা চালের গড় আমদানি মূল্য ৩৫ টাকা। সব ধরনের মুনাফা যোগ হয়ে খুচরা বাজার পর্যন্ত এর মূল্য হতে পারে সর্বোচ্চ ৪৪ দশমিক ৩৩ টাকা। কিন্তু বর্তমানে তা বিক্রি হচ্ছে প্রতিকেজি গড়ে ৫০ টাকা।
সূত্র মতে, আগামী বছর প্রতিবেশী দেশগুলোর কাছ থেকে চীন ৫৩ লাখ টন চাল আমদানির লক্ষ্য স্থির করেছে। দেশটি আগের বছর মাত্র আড়াই লাখ টন চাল আমদানি করে। ইরান একই বছর ১৩ লাখ টন চাল আমদানির প্রস্তুতি নিচ্চে। অবশ্য আগের বছরে দুই লাখ টন আমদানি করে। এদিকে যুক্তরাষ্ট্র চাল রফতানির লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে দিয়েছে। গত বছর ৩৫ লাখ টন রফতানি করলেও চলতি বছর এক লাখ টনের বেশি করবে না বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পাকিস্তানও ৩৯ লাখ টন থেকে রফতানির পরিমাণ কমিয়ে এক লাখ টন করা হয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশে গত অর্থবছর তিন কোটি ৪৫ লাখ ৭৮ হাজার টন চাল উৎপাদিত হলেও চলতি বছর তা কমে তিন কোটি ৩৫ লাখ টনে নামবে। এতে আমদানি তিন লাখ টন থেকে বেড়ে ১০ লাখ টন হবে। এ সংকটের মুখে দেশে ও বিদেশে চালের বাজার অস্থির হয়ে উঠেছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, এ মুহূর্তে ভারত থেকে বেনাপোল বন্দর পর্যন্ত প্রতি টন চাল আমদানি মূল্য হচ্ছে ৪২০ ডলার। যা দেশীয় টাকায় ৩৪ হাজার ৪৪০ টাকা। ওই হিসাবে প্রতিকেজি চালের আমদানি মূল্য হচ্ছে ৩৪ দশমিক ৪৪ টাকা। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পণ্যের প্রকৃত মুনাফা কত হওয়া উচিত তা নির্ধারণের ফরমুলা অনুযায়ী এর সঙ্গে কেজিতে ৮০ পয়সা ডিউটি যোগ হয়ে মূল্য দাঁড়াচ্ছে গড়ে ৩৫ টাকা। আমদানি পর্যায়ে আরও ২ শতাংশ মুনাফা যোগ হয়ে চালের মূল্য হবে ৩৫ দশমিক ৭০ টাকা। পাইকারি বাজারে আসতে প্রতি কেজিতে পরিবহন ব্যয় এক টাকা পড়ছে। পাশাপাশি পাইকারি পর্যায়ে মুনাফা ৫ শতাংশ নির্ধারণ করে চালের পাইকারি মূল্য হবে ৩৮ দশমিক ৫৩ টাকা। এরপর খুচরা পর্যায়ে পরিবহন ব্যয় ও মুনাফা ১৫ শতাংশ যোগ হয়ে চালের প্রকৃত খুচরা মূল্য দাঁড়াবে ৪৪ দশমিক ৩১ টাকা। কিন্তু বাজারে বিক্রি হচ্ছে ৫০ টাকা। ওই হিসেবে অতিরিক্ত কেজিতে মুনাফা আদায় করা হচ্ছে গড়ে ৬ টাকা।
যুক্তরাষ্ট্রের ফরেন এগ্রিকালচার সার্ভিসের (ইউএসডিএ) সম্প্রতি প্রকাশিত প্রতিবেদনের পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি অর্থবছর অভ্যন্তরীণ উৎপাদন কমায় বাংলাদেশকে ১০ লাখ টন চাল আমদানি করতে হবে। এ সুযোগ নিয়ে চাল রফতানিকারক দেশ ভারত, ভিয়েতনাম ও মিয়ানমার মূল্য বাড়িয়েছে। পাশাপাশি আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীরা একই সুযোগ নিয়ে মূল্য বাড়াচ্ছে।
চালের বিশ্ববাজারে পুর্বাভাস অনুযায়ী বাংলাদেশ, ফিলিপাইন ও শ্রীলংকার ত্রিদেশীয় প্রতিযোগিতায় আন্তর্জাতিক চালের বাজারে অস্থিরতা বেড়েছে। আগামী বছর চীন ও ইরানের বৃহৎ আমদানির প্রভাবে আবারও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে যাচ্ছে বাংলাদেশের চাল আমদানি। যুক্তরাষ্ট্রের ফরেন এগ্রিকালচার সার্ভিসের (ইউএসডিএ) সম্প্রতি প্রকাশিত প্রতিবেদনে এমন শঙ্কার কথা বলা হয়েছে।
প্রসঙ্গত, এ বছর হাওরে ফসলহানি ও উত্তরাঞ্চলে বন্যায় দেশে চালের উৎপাদন কমেছে। ফলে চাল আমদানি শুরু করেছে বাংলাদেশ। অপরদিকে নিজ দেশের অভ্যন্তরীণ সংকট মোকাবেলায় চাল আমদানি করতে হচ্ছে ফিলিপাইন ও শ্রীলংকাকেও। ফলে এখন বাংলাদেশ, ফিলিপাইন ও শ্রীলংকার ত্রিদেশীয় প্রতিযোগিতা বৈশ্বিক চালের বাজারকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে। সরবরাহ কমায় বর্তমানে চাল রফতানিকারক দেশগুলো দাম বাড়িয়ে যাচ্ছে। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত প্রচুর চাল রফতানি করলেও সেই সুফল পাচ্ছে না বাংলাদেশ।
আন্তর্জাতিক বাজারে গত এক বছরে ভারতীয় চালের মূল্য ৩৭ ডলার বেড়েছে। গত বছরের এ সময় ভারত প্রতি টন সিদ্ধ চাল ৩৬৭ ডলারে বিক্রি করেছে। কিন্তু বাংলাদেশ চাল আমদানি শুরু করার পর থেকেই টনপ্রতি ভারতীয় চালের এফওবি দাম ৪২০ ডলারে পৌঁছে যায়। এরপর থেকে প্রতি মাসেই ভারতীয় চালের দাম বাড়ছে। ফরেন এগ্রিকালচার সার্ভিসের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী বছর চালের শীর্ষ রফতানিকারক দেশ হবে ভারত। ওই বছর ভারত থেকে এক কোটি ১৮ লাখ টন চাল রফতানির পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ হিসাবে মিয়ানমারও আগামী বছর ২০ লাখ টন চাল রফতানি করবে।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) ‘এগ্রি মার্কেট’ শীর্ষক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত এক সপ্তাহে একমাত্র ভিয়েতনাম ছাড়া বিশ্বের মোটা চাল বিক্রয়কারী সব দেশে চালের দাম বেড়েছে। থাইল্যান্ডে ৫ দশমিক ১৭ শতাংশ, ভারতে ১ দশমিক ৫৪ শতাংশ ও পাকিস্তানে প্রায় ২ শতাংশ বেড়েছে।

Share Button