ঢাকার বেদখলকৃত খালগুলি উদ্ধার ও তাহা সংরক্ষণের গুরুত্ব এখন সকলেই স্বীকার করিতেছেন। এবারের ভয়াবহ জলাবদ্ধতা হইতে সকলের এই উপলব্ধি হইয়াছে যে, ঢাকাকে বাঁচাইতে হইলে আগে দরকার ইহার খালগুলির উন্নয়ন সাধন করা। আশার কথা হইল, ঢাকার খালগুলি উদ্ধারে বিলম্বে হইলেও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান কাজ শুরু করিয়াছে। ইতোমধ্যে ঢাকা জেলা প্রশাসন একটি প্রতিবেদন তৈরি করিয়াছে যেখানে খালগুলির একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র ফুটিয়া উঠিয়াছে। তাহাতে দেখা যায়, চিহ্নিত ৫৮টি খালের মধ্যে ৩৭টি খালই দখল হইয়া গিয়াছে। ফলে খালগুলিতে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ নাই। সবচাইতে দুঃখজনক বিষয় হইল, খাল দখলে খোদ সরকারি প্রতিষ্ঠানও জড়িত। এই প্রতিবেদন অনুযায়ী রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)সহ তিনটি সরকারি প্রতিষ্ঠান খালের অংশবিশেষ দখলের জন্য দায়ী। ইহাছাড়া দায়ী সাতটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক দল এবং ২৪৮ জন ব্যক্তি। অন্যদিকে, যে খালগুলি এখনো টিকিয়া আছে, তাহার অধিকাংশই ময়লা-আবর্জনাসহ নানা দূষণের শিকার। এই প্রতিবেদনের উপর ভিত্তি করিয়া ঢাকার খালগুলি উদ্ধার ও  সংস্কারে ব্যাপক ও সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। এই উদ্যোগের সহিত মহানগরবাসীকেও সম্পৃক্ত করিতে হইবে। কারণ খাল উদ্ধার ও দূষণ রোধে তাহাদেরও সচেতনতার কোনো বিকল্প নাই।

 

নগর বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকা শহরে যে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা আছে, তাহাতে খাল ও কৃত্রিম নিষ্কাশন ব্যবস্থা উভয়ই অতীব গুরুত্বপূর্ণ। ইহার আগে আমরা রাজধানীর ক্যাচপিটগুলি সংরক্ষণের কথা বলিয়াছি। এখন খালগুলি উদ্ধার ও উন্নয়ন এই কারণেই প্রয়োজন যাহাতে অবাধে পানি নিষ্কাশনের জন্য খালগুলির মাধ্যমে ঢাকার আশেপাশের নদীগুলির সংযোগ সাধন করা সম্ভব হয়। অনেক খাল হারাইয়া যাইবার কারণে সেই সংযোগ বিচ্ছিন্ন হইয়া গিয়াছে। এই কারণে দিন দিন বাড়িতেছে জলাবদ্ধতার সংকট। বৃষ্টির পানি যাহাতে খালবাহিত হইয়া নির্বিঘ্নে নদীতে পড়িতে পারে তাহা নিশ্চিত করা জরুরি হইয়া পড়িয়াছে। কোথাও পানি বাধাপ্রাপ্ত হইলেই তৈরি হইবে জলাবদ্ধতা। এই বত্সর জলাবদ্ধতা দেখা দিবার প্রধান কারণ পানি নিষ্কাশনের এই প্রতিবন্ধকতা। সুতরাং ঢাকাকে বাসযোগ্য করিতে হইলে এবং জলাবদ্ধতার মতো দুর্যোগ হইতে রক্ষা পাইতে হইলে প্রথমত বেদখল হইয়া যাওয়া খালগুলি উদ্ধার ও সংস্কারে সর্বশক্তি নিয়োগ করিতে হইবে। ঢাকার উন্নতি ও পরিবেশগত ভারসাম্য বহুলাংশে এই খালগুলির ওপর নির্ভরশীল। অতএব, এই ব্যাপারে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন ও ওয়াসাসহ সংশ্লিষ্ট সকল সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানকে সক্রিয় হইতে হইবে। খালগুলি উদ্ধারের পর ইহার সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব একক কর্তৃপক্ষের ওপর দেওয়া উচিত। এইক্ষেত্রে সিটি করপোরেশনই নেতৃত্ব দিতে পারে। খালগুলি উদ্ধারের পর ইহার দুইপাড় বাঁধাই করিয়া নিয়মিত তদারকি, পরিচর্যা ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার ব্যবস্থা করিতে হইবে। তৈরি করিতে হইবে সবুজ বেষ্টনী ও ওয়াকওয়ে বা হাঁটাপথ।  নতুবা ইহা আবার বেদখল হইয়া যাইবার আশঙ্কা থাকিবে। একইসঙ্গে বুড়িগঙ্গা, বালু, তুরাগ ও শীতলক্ষ্যাসহ ঢাকার চারিপাশের নদীগুলি খনন ও দখলমুক্ত করিবার প্রয়োজনীতাও অনস্বীকার্য। আমরা এই ব্যাপারে জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সরকারের নীতিনির্ধারক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করিতেছি।
Share Button