জামালপুরের সরিষাবাড়ীতে ৩.২৮ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্র থেকে দেশে প্রথমবারের মতো সরাসরি জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সঞ্চালন শুরু হয়েছে। এ ছাড়া দেশের অনেক জায়গায় চালু হয়েছে মিনি গ্রিড সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্র। সৌরবিদ্যুতের এসব কেন্দ্রের কারিগরি নকশা করেছেন শাহরিয়ার আহমেদ চৌধুরী। এক দশক আগে জার্মানিতে গবেষণা শিক্ষার্থী হিসেবে শাহরিয়ার আবিষ্কার করেছিলেন নতুন একধরনের সৌরবিদ্যুৎ কোষ। এখন বাংলাদেশে সৌরবিদ্যুতের আলো ছড়িয়ে দিতে কাজ করছেন প্রতিনিয়ত। শাহরিয়ার আহমেদ চৌধুরীকে নিয়েই এবারের প্রচ্ছদ প্রতিবেদন

‘১০ বছর আগে আপনাকে বলেছিলাম দেশে নবায়নযোগ্য শক্তির একটা গবেষণাগার (ল্যাব) খুবই দরকার। আজ সেটি বাস্তব। এলেই দেখতে পাবেন।’ সাক্ষাৎকার নেওয়ার জন্য দিনক্ষণ ঠিক করতে কদিন আগে যখন ফোন করেছিলাম, তখন শাহরিয়ার আহমেদ চৌধুরী কথাগুলো বলছিলেন এভাবেই।

১০ বছরের বেশি সময় আগের স্মৃতি ফিরে এল মনে। ২০০৭ সালের ৫ মে প্রথম আলোর শনিবারের ক্রোড়পত্র ‘ছুটির দিনে’র বিশেষ তরুণ সংখ্যায় নির্বাচিত হয়েছিলেন শাহরিয়ার। তখন টগবগে তরুণ তড়িৎ প্রকৌশলী ও গবেষক শাহরিয়ার দারুণ এক কাজ করে ফেলেছিলেন। জার্মানির ওল্ডেনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে গিয়ে তিনি কাজ করতে চাইলেন সৌরশক্তি ও হাইড্রোজেন গবেষণাকেন্দ্রে। সেখানে শাহরিয়ার এমন এক সৌরবিদ্যুৎ কোষ (সোলার সেল) আবিষ্কার করলেন, যা সূর্যের আলো থেকে প্রচলিত সোলার প্যানেলের চেয়ে বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে।

সৌরবিদ্যুৎ প্যানেলে কাজ করছেনএবার ফিরে আসি হাল সময়ে। গত আগস্ট মাসে দারুণ এক ঘটনা ঘটল বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে। সূর্যের আলো থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ যুক্ত হলো বিদ্যুতের জাতীয় গ্রিডে। জামালপুরের সরিষাবাড়ীতে পিডিবি প্রাঙ্গণে আট একর জায়গার ওপর বিশাল এক সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্র। হাজার হাজার সোলার প্যানেল সেখানে। সূর্যের আলো যখন থাকবে, তখন এখানে উৎপাদিত হবে ৩ দশমিক ২৮ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। আর তা সরাসরি যোগ হবে জাতীয় গ্রিডে। এই বিশাল সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রের ডিজাইন করেছেন শাহরিয়ার আহমেদ চৌধুরী। এনগ্রিন পাওয়ার প্ল্যান্টের পরামর্শক হিসেবে কারিগরি নকশার কাজটা করেছেন শাহরিয়ার। ১০ বছর আগে যেমন বলেছিলেন বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য শক্তি, বিশেষ করে সৌরবিদ্যুৎ নিয়ে কাজ করতে চান তিনি।

শাহরিয়ারের সেই স্বপ্নের ল্যাবও এখন বাস্তব। ঢাকার ধানমন্ডির ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি (ইউআইইউ) প্রাঙ্গণে সেই গবেষণাগার। শাহরিয়ারের ভাষায় ‘চিলেকোঠা’য় যার ঠিকানা। ২৪ অক্টোবর যাওয়া হলো ইউআইইউর সেন্টার ফর এনার্জি রিসার্চ নামের গবেষণাগারে। দালানের মূল ছাদ থেকে একতলা উঠলে ৩ হাজার বর্গফুটের ঘর, চিলেকোঠাই বটে। ঘরের ওপরে সোলার প্যানেল একটার পর একটা। ল্যাবে ওঠার আগে ছাদের এক কোণে চোখে পড়ে সোলার প্যানেল ছাওয়া ১০ বাই ১০ ফুটের আরেকটি ঘর। এটা নাকি হিমাগার (কোল্ড স্টোরেজ)। সৌরবিদ্যুতে হিমাগারও চালানোর গবেষণা করছেন শাহরিয়ার। তারই নমুনা এটা।

জাতিসংঘের পুরস্কার গ্রহণের দিনল্যাবে ঢোকার পর প্রথমেই শাহরিয়ার বললেন, ‘পুরো ল্যাবই চলছে সৌরবিদ্যুতে। বিদ্যুৎ বিভাগ থেকে বিদ্যুৎ আমরা নিচ্ছি না।’ এই ল্যাবে শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র, অনেকগুলো বাতি, কম্পিউটার, প্রিন্টার—সবই চলছে সৌরবিদ্যুতে। এমনকি গবেষণার জন্য পানি তোলার দুটি মোটরও প্রায়ই চলে এখানে। এখানে সোলার প্যানেল থেকে পাওয়া বিদ্যুৎ জমা হয় ব্যাটারিতে। ফলে দিনরাত সব সময় বিদ্যুৎ পায় পুরো ল্যাবটি।

শাহরিয়ারের সঙ্গে এই ল্যাবে কাজ করেন ৮ জন গবেষণা প্রকৌশলী এবং ২০ জন গবেষণা শিক্ষার্থী। নানা কিছু নিয়ে গবেষণা চলছে এখানে। স্বয়ংক্রিয় সেচব্যবস্থার একটা মডেলও দেখা গেল। ফসলের খেতে নানা ধরনের সেন্সর ব্যবহার করে যখন জমিতে পানি দরকার হবে, তখনই সেচযন্ত্র চালু হয়ে প্রয়োজনীয় পানি দেবে। শাহরিয়ার জানালেন, জরিপ করে দেখা গেছে এক কেজি ধান উৎপাদনে বাংলাদেশে গড়ে ৩ হাজার ৫০০ লিটার পানি ব্যবহার করা হয়। এই স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থায় ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ লিটার পানিতেই কাজ হয়ে যাবে। আর পুরো ব্যবস্থাই সৌরবিদ্যুৎনির্ভর। এই প্রকল্পটি এরই মধ্যে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের ‘অদম্য বাংলাদেশ’ পুরস্কার পেয়েছে।

কথা শুরু হয়েছিল সরিষাবাড়ীর সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়ে। শাহরিয়ার বললেন, এছাড়াও ‘মিনি গ্রিড বা অফ গ্রিড প্রকল্প কিন্তু অনেকগুলো হচ্ছে বাংলাদেশে। ১১টা মিনি গ্রিড সম্পন্ন হয়েছে, আরও ২০টার কাজ চলছে। এগুলোর বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ১০০ থেকে ২৫০ কিলোওয়াট।’ সব কটার ডিজাইন করেছেন শাহরিয়ার আহমেদ। এই মিনি বা অফ গ্রিড বিষয়টা বোঝা যাক। এককথায় এই সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরত্বের মধ্যে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা যায়। কয়েকটি গ্রামের বিদ্যুৎ চাহিদা এগুলো থেকে মেটানো সম্ভব। এগুলো জাতীয় গ্রিডে যুক্ত নয়।

মিনি গ্রিড সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্রের কথা বলতে গিয়ে তৃপ্তির ছাপ পড়ে শাহরিয়ারের চোখেমুখে। বলতে থাকেন, ‘যেখানকার মানুষ কখনো ভাবেননি যে সেখানে বিদ্যুৎ যাবে, সে এলাকা এখন আলোকিত। শুধু আলো নয়, এসব এলাকায় ব্যবসা-বাণিজ্য, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও বেড়েছে দারুণভাবে।’ রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার চর আষাঢ়ীদহের কথা বললেন তিনি। ল্যাপটপের মনিটরে ছবি, ভিডিও দেখালেন। পদ্মার একটা চরাঞ্চল এটি। প্রচলিত বিদ্যুৎ নিয়ে যাওয়া প্রায় অসম্ভব। এখানে একটি এনজিওর উদ্যোগে তৈরি হয়েছে মিনি গ্রিড সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্র ও সরবরাহব্যবস্থা। এখন সেখানে ইজিবাইকও চলে। ভোজ্যতেল কল, ওয়েল্ডিং কারখানা—সবই রয়েছে।

ইন্টারসোলার পুরস্কারের মঞ্চে‘মিনি গ্রিড প্রকল্পগুলো করে সবচেয়ে বেশি আনন্দ পাই। একটা অন্ধকার জায়গা যখন আলোকিত হয়ে ওঠে, সে জায়গার সবটাই পাল্টে যায়। জীবনযাপনের মান বেড়ে যায়।’ বলেন শাহরিয়ার। জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে এমন আরও বেশ কটি সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র গড়ে উঠবে বাংলাদেশে। এর মধ্যে কাপ্তাইয়ে হবে অনেক বড় আকারে সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র। সেগুলোরও ডিজাইন করছেন শাহরিয়ার আহমেদ চৌধুরী। নাইজেরিয়া, কেনিয়াতেও সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রের নকশা করেছেন তিনি।

ইউআইইউর উপাচার্য মুহম্মদ রিজওয়ান খান বললেন, ‘বাংলাদেশের প্রায় সব সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রের নকশা করেছেন শাহরিয়ার। খুবই কর্মঠ এবং কাজপাগল এক গবেষক। কয়েকটি আন্তর্জাতিক পুরস্কারও পেয়েছে তাঁর প্রকল্প।’ গত বছর জার্মানির ‘ইন্টারসোলার অ্যাওয়ার্ড ২০১৬’ এবং মরক্কোর ‘ইউএন মোমেন্টাম ফর চেঞ্জ, ২০১৬’ জিতেছে বাংলাদেশি প্রকল্প ‘পাইলট পিভি ডিসি পিয়ার-টু-পিয়ার স্মার্ট ভিলেজ গ্রিড’। এর অবস্থান শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার একটা গ্রামে। শাহরিয়ার আহমেদ চৌধুরী এই প্রকল্পের দলনেতা ও চিফ ইনভেস্টিগেটর।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সপ্তাহ ২০১৬ উপলক্ষে বাংলাদেশ সরকারের বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় আয়োজন করেছিল আন্তবিশ্ববিদ্যালয় প্রতিযোগিতার। সেখানে ইউআইইউর ‘অটোমেটেড ইরিগেশন সিস্টেম ইয়ুথ স্মার্ট মনিটরিং’ নামের প্রকল্পটি ‘অদম্য বাংলাদেশ’ পুরস্কার জেতে। এই প্রকল্পেরও দলনেতা ও প্রধান পর্যবেক্ষক শাহরিয়ার আহমেদ চৌধুরী।

এক দশক আগে নমনীয় উপাদানের সৌরকোষ আবিষ্কার করে শাহরিয়ার যে সাড়া জাগিয়েছিলেন নবায়নযোগ্য শক্তি খাতে, সেটির খবর কী? শাহরিয়ার বললেন, ‘জার্মানিতে বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন হচ্ছে এখন। তবে ব্যয়বহুল হওয়ায় বাংলাদেশের প্রকল্পগুলোতে সেটা ব্যবহার করছি না। দেশে আমি সৌরবিদ্যুতের ফলিত গবেষণা করছি। এখানে এরই দরকার বেশি।’

গবেষণাগারে সহকর্মীদের সঙ্গে। ছবি: ছুটির দিনেবাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তড়িৎ ও ইলেকট্রনিকস কৌশলে স্নাতক শাহরিয়ার আহমেদ চৌধুরী পিডিবির সরকারি চাকরিতে যোগ দিয়েছিলেন। এরপর জার্মানিতে পড়তে যান। ২০০৭ সালে ফিরে আসেন দেশে, পিডিবির চাকরি ছেড়ে যোগ দেন ইউআইইউতে। ২০০৯ সালে এখানে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে চালু হয় সেন্টার ফর এনার্জি রিসার্চ। বর্তমানে সরকারের নবায়নযোগ্য শক্তির নীতিমালা প্রণয়নেও যুক্ত হয়েছেন শাহরিয়ার।

শাহরিয়ারের নেশা-পেশা, অবসর— সব এই সৌরশক্তির গবেষণা নিয়েই। বললেন, মানুষের বসবাসযোগ্য ভবিষ্যৎ পৃথিবীর জন্য কার্বনমুক্তভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন দরকার। তাই নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎই আমাদের ভরসা। বাংলাদেশে সূর্যের আলোই এর বড় উৎস।’ তাই তো এই সৌরশক্তি সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়ার নিরন্তর চেষ্টা শাহরিয়ার আহমেদ চৌধুরীর।

Share Button