চট্টগ্রামে বিএনপি নেতাকর্মীদের জাগিয়ে গেলেন খালেদা জিয়া
খালেদা জিয়ার সফরের পর চট্টগ্রাম অঞ্চলে পুরোদমে শুরু হয়েছে বিএনপির নির্বাচন ও আন্দোলনমুখী রাজনীতি। বৃহত্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলের বিএনপি নেতাকর্মী, সমর্থকদের জাগিয়ে দিয়ে গেলেন চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। দীর্ঘ পাঁচ বছর পর তার টানা ৪ দিনের এ সফরে এই অঞ্চলের গণ মানুষের মাঝেও ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। বিএনপি নেত্রীর অন্যরকম এই কর্মসূচিকে ঘিরে জাতীয় রাজনীতিতে চলছে নানা আলোচনা, বিশ্লেষণ। এই অঞ্চলে বিএনপির সর্বস্তরের নেতাকর্মী ও সমর্থকেরা এখন দারুণ চাঙ্গা। বেগম খালেদা জিয়ার গাড়ি বহরে জনতার বাঁধভাঙ্গা জোয়ার বিএনপির নেতাদের আরও বেশি আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছে বলে মনে করেন দলের নেতারা। ফেনীতে দুই দফা অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সফর ছিল উৎসব মুখর।
বিএনপি নেতাদের অনেকে এই সুযোগে নির্বাচনের আগাম শোডাউনও সেরে ফেলেছেন। তারা এখন নিজ নিজ এলাকায় নির্বাচন ও নির্দলীয় সরকারের দাবিতে আন্দোলনের প্রস্তুতিতে মনোনিবেশ শুরু করেছেন। কোন বিশৃঙ্খলা ছাড়াই সফর শেষ হওয়ায় প্রশাসনেও স্বস্তি বিরাজ করছে। মিয়ানমারে ইতিহাসের নিষ্ঠুরতম গণহত্যার মুখে প্রাণ বাঁচাতে পালিয়ে আসা মজলুম রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়াতে কক্সবাজারের উখিয়ায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পে যান বেগম খালেদা জিয়া। মানবিক এই কর্মসূচিকে ঘিরে টানা চার দিন ১২শ কিলোমিটার (আসা-যাওয়া) পথ পাড়ি দেয় বেগম খালেদা জিয়ার গাড়ি বহর। তার গাড়ি বহরকে ঘিরে জনতার অভ‚তপূর্ব জাগরণ দেখা যায়। মাঠের প্রধান বিরোধী দল ও বিশ দলীয় জোটের নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সফর নিয়ে এখন চট্টগ্রাম অঞ্চলে চলছে নানা হিসাব নিকেশ। বিএনপির নেতাদের দাবি এই সফর শতভাগ সফল। কোন রকম রাজনৈতিক কর্মসূচি ছাড়াই বেগম খালেদা জিয়ার সফরকালে জনতা যেভাবে রাস্তায় নেমে এসেছে তা ছিল নজিরবিহীন। এতে আবারও প্রমাণ হয়েছে বিএনপি দেশে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় দল। খালেদা জিয়া গণমানুষের আস্থার প্রতীক। তবে সরকারি দলের নেতারা এই সফরকে ত্রাণ বিতরণের নামে নির্বাচনী শোডাউন বলে মন্তব্য করেছেন। এই মানবিক কর্মসূচিতে সরকার কোন বাধা দেয়নি। পুলিশ ও সিভিল প্রশাসনের কর্মকর্তাদের ভ‚মিকা ছিল ইতিবাচক। সরকারের এই দৃষ্টিভঙ্গিকে আগামী দিনের রাজনীতির জন্য শুভ ইঙ্গিত বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা। তারা বলছেন, বিএনপিসহ নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলসমুহকে তাদের স্বাভাবিক রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনের সুযোগ দেওয়া উচিত। কারণ সরকারি তরফে একটি অংশগ্রহণমূলক জাতীয় নির্বাচনের যে কথা বলা হচ্ছে এর মধ্যদিয়ে তার একটি পরিবেশ তৈরী হবে।
এক্ষেত্রে সরকারের ভ‚মিকা বেশি বলে মনে করেন বিশিষ্ট রাজনীতি বিশ্লেষক চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগের প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইয়াহইয়া আখতার। তিনি বলেন, সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক ধারা বজায় রাখতে স্বাভাবিক রাজনৈতিক কর্মসূচি বাধাহীন করতে হবে। খালেদা জিয়ার মানবিক কর্মসূচিতে রাজনীতি আসবে এটাই স্বাভাবিক মন্তব্য করে তিনি বলেন, কারণ তিনি তিনবারের প্রধানমন্ত্রী একটি বড় রাজনৈতিক দলের প্রধান। শেখ হাসিনা এবং খালেদা জিয়া যেখানেই যান সেখানে রাজনীতি আসবেই। তাছাড়া খালেদা জিয়া দীর্ঘদিন কোন রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করতে পারছেন না। তার দল বিএনপিকে ঘরেও সভা করার অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না। এই কারণে তাকে দেখতে তার দলের নেতা-কর্মী ও সমর্থকেরা হুমড়ি খেয়ে পড়েন। সাধারণ লোকজনও তাকে দেখতে রাস্তায় নেমে আসেন। খালেদা জিয়ার এই সফর আগামী দিনের জাতীয় রাজনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে জানিয়ে তিনি বলেন, তার এ সফর সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে লেভেল প্লেয়িংফিল্ড তৈরীতেও ভ‚মিকা রাখতে পারে। তবে সবকিছু নির্ভর করছে সরকারের উপর। একদল রাষ্ট্রীয় সকল সুযোগ-সুবিধা ব্যবহার করে সভা-সমাবেশ করছে নির্বাচনী প্রচার চালিয়ে যাচ্ছে। আর অন্যদল নিজের টাকায় সভা-সমাবেশ করার চেষ্টা করেও পারছেনা। এটাই যদি হয় লেভেল প্লেয়িংফিল্ডের নমুনা তাহলে-গণতন্ত্রের সজ্ঞা নতুন করে লিখতে হবে।
বিএনপির জাতীয় স্বায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, খালেদা জিয়ার গাড়ি বহরে জনতার ঢল সরকারকেও বার্তা দিয়েছে। সরকারের উচিত গণমানুষের কেড়ে নেওয়া ভোটের অধিকার ফিরিয়ে দিতে একটি সুষ্ঠু রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরী করা। বিরোধী দলকে কথা বলার সুযোগ করে দেওয়া। জনগণের ভাষা বুঝতে না পারলে সরকারের জন্য কঠিন সময় অপেক্ষা করছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তিনি বলেন, খালেদা জিয়ার গাড়ি বহরে জনতার বাঁধভাঙ্গা জোয়ার প্রমাণ করে বিএনপির প্রতি গণমানুষের আস্থা রয়েছে। মানুষ পরিবর্তন চায়, দুঃসহ অবস্থার অবসান চায়। জনগণ গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে বেগম জিয়াকেই তাদের আস্থার প্রতীক মনে করে।
বেগম খালেদা জিয়ার সফরকে ঘিরে নেতাকর্মীরা ছিল উল্লসিত। জুলুম নির্যাতন আর হামলা মামলায় জর্জরিত নেতাকর্মীরা আনন্দে আত্মহারা হয়ে রাস্তায় নেমে আসে। চট্টগ্রাম মহানগরীসহ এই অঞ্চলের সর্বত্রই বিএনপি নেতাকর্মীরা খালেদা জিয়ার যাত্রা পথ মিছিলে মিছিলে মাতিয়ে রাখেন। দলীয় প্রধানের আগমনে তারা উজ্জীবিত হয়ে উঠে। বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান বলেন, জুলুম নির্যাতন চালিয়ে মানুষকে বেশিদিন দাবিয়ে রাখা যায় না চট্টগ্রামের লাখো মানুষ সেটাই প্রমাণ করেছে। আমাদের দলের নেতাকর্মীরাও এখন চাঙ্গা, আগামী দিনে নির্বাচন ও আন্দোলনে তারা যে কোন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় প্রস্তুত। চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সভাপতি ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, জনগণ সুযোগ পেলেই যে সরকারের বিরুদ্ধে রাস্তায় নামবে তা আবারও প্রমাণ হয়েছে। আর এই কারণেই সরকার বিএনপিকে রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করতে দিচ্ছে না। চট্টগ্রামের জনগণ গণতন্ত্রের পক্ষে, বিএনপি এবং খালেদা জিয়ার পক্ষে।
চট্টগ্রাম মহানগর এবং জেলা বিএনপিতে দলীয় কোন্দল ও নেতায় নেতায় দ্ব›দ্ব আছে। এনিয়ে মাঝে মধ্যে অপ্রীতিকর ঘটনাও ঘটে। দলীয় কোন্দলের জেরে দলীয় কর্মসূচিতে সহিংসতার অভিযোগে কয়েক মাস আগে চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপির সদস্য সচিব ও দক্ষিণ জেলার সাধারণ সম্পাদককে দল থেকে বহিস্কারও করা হয়েছে। সিনিয়র নেতাদের মধ্যেও বিরোধ আছে। আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে মনোনয়ন লড়াইয়ে দ্ব›দ্ব প্রকট হচ্ছে সিনিয়র নেতাদের মধ্যেও। তবে বেগম খালেদা জিয়ার সফরকে ঘিরে ব্যাপক শোডাউন হলেও তাতে দলীয় কোন্দলের কোন প্রভাব দেখা যায়নি।
এই প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির সভাপতি জাফরুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, বেগম খালেদা জিয়ার দীর্ঘ যাত্রাপথে বিএনপির নেতাকর্মীরা যে শৃঙ্খলার নজির দেখিয়েছে তা অভ‚তপূর্ব। কোথাও কোন ধরনের বিশৃঙ্খলা দেখা যায়নি। গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও একটি সফল নির্বাচনের জন্য যেরকম সৃশৃঙ্খল কর্মী বাহিনী দরকার বিএনপির তা রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন বিএনপি এখন অতীতের যেকোন সময়ের তুলনায় ঐক্যবদ্ধ। বেগম খালেদা জিয়ার এ সফল সফর আগামীদিনের রাজনীতি ও নির্বাচনে বিএনপির জন্য ইতিবাচক হবে বলেও মনে করেন তিনি।
স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান, মীর মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন ও গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী, চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা গোলাম আকবর খন্দকার, এসএম ফজলুল হক, মহিলা দলনেত্রী নূরি-আরা সাফা, মহানগর বিএনপির সভাপতি ডা. শাহাদাত হোসেন, সাধারণ সম্পাদক আবুল হাশেম বক্কর, বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুবুর রহমান শামীম, দক্ষিণ জেলা বিএনপির সভাপতি জাফরুল ইসলাম চৌধুরীসহ মহানগরী চট্টগ্রাম উত্তর ও দক্ষিণ জেলার সিনিয়র নেতারা সফরের পুরো সময়জুড়ে নেতাকর্মীদের নিয়ে বেগম খালেদা জিয়ার গাড়ি বহরে ছিলেন। তবে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান এম মোর্শেদ খানকে চট্টগ্রামে দেখা যায়নি। জাতীয়তাবাদী মহিলা দল, শ্রমিক দল, যুবদল, ছাত্রদল ছাড়াও বিএনপির সহযোগী ও সমমনা পেশাজীবী সংগঠনের নেতাকর্মীরাও স্বতঃস্ফূর্তভাবে বেগম জিয়ার কর্মসূচিতে শরিক হন। খালেদা জিয়ার সফরকে ঘিরে মিরসরাই থেকে টেকনাফ পর্যন্ত চট্টগ্রাম অঞ্চলের ৫ জেলার ২৩টি সংসদীয় আসনের মনোনয়ন প্রত্যাশীরা কমবেশি শোডাউন করেছেন। দলীয় চেয়ারপার্সনের সফর পরবর্তী চাঙ্গা নেতাকর্মীদের নিয়ে তারা এখন মাঠে। নিজ নিজ এলাকায় ভোটের প্রস্তুতি শুরু করেছেন সম্ভাব্য প্রার্থীরা।

Share Button