গত ৫ বছরে প্রতি হিজড়ার পেছনে ব্যয় প্রায় ৫৪ হাজার টাকা

তৃতীয় লিঙ্গ হিসেবে স্বীকৃতি মেলায় ভোটার তালিকায় উঠে এসেছে অনেক হিজড়ার নাম। ভোটার হিসেবে বেড়েছে তাদের মূল্যও। কিন্তু গুরুত্ব পাচ্ছে না সরকারের বয়স্ক ভাতা কর্মসূচির তালিকায়। প্রবীণ হয়েও অনেকের নাম বাদ পড়ছে এ তালিকা থেকে। যদিও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় হিজড়াদের জন্য পৃথক বয়স্ক ভাতা চালু করেছে সরকার।
অনেক হিজড়ার অভিমত, ভোটের জন্য গুরুত্ব বাড়লেও ভাতার জন্য বাড়ছে না। অনুসন্ধানে জানা গেছে, সরকার গত ছয় বছরে একজন হিজড়ার পেছনে ব্যয় করেছে গড়ে সাড়ে ৫৩ হাজার টাকা।
বয়স্ক ভাতা, প্রশিক্ষণ ও উপবৃত্তি কর্মসূচির নামে অধিকাংশ ব্যয় গেছে নগদ সহায়তা হিসেবে। সুবিধা পেয়েছে ৫ হাজার ৩২০ জন। অথচ সুবিধাভোগী অধিকাংশই ফিরছে আগের পেশায়। অন্যদিকে হিজড়ার বড় একটি অংশ এখনও সুবিধাবঞ্চিত রয়েছে। প্রকৃত অনেক হিজড়া এসব সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
ফলে হিজড়াদের পেছনে সরকারের বড় অঙ্কের ব্যয় ও কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বয়স্ক ভাতা থেকে অনেকে বাদ পড়া প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সমাজকল্যাণ সচিব মো. জিল্লার রহমান যুগান্তরকে বলেন, বয়স্ক ভাতা থেকে কোনো হিজড়ার নাম বাদ পড়ার বিষয়টি জানতে পারলে তার নাম অন্তর্ভুক্ত করা হবে। সরকার হিজড়াদের ব্যাপারে উন্মুক্ত। তিনি আরও বলেন, হিজড়াদের কিছু গাফিলতি থাকতে পারে।
অনেক ক্ষেত্রে তারা তালিকায় নাম উঠানোর ক্ষেত্রে আগ্রহ দেখায় না। সরকারের টাকা ব্যয়ের কার্যকারিতা সম্পর্কে জানতে চাইলে সমাজসেবা অধিদফতরের মহাপরিচালক গাজী মোহাম্মদ নরুল কবির যুগান্তরকে বলেন, হিজড়াদের প্রশিক্ষণের ব্যাপারে মূল্যায়ন করা হচ্ছে। প্রশিক্ষণ নিয়ে কারা পুনরায় আগের পেশায় যাচ্ছে, তা বের করা হবে। এছাড়া সরকার একটি প্লাটফর্ম করার চিন্তা করছে।
কমপক্ষে ১০টি জেলায় ২ একর খাস জমি নিয়ে শিল্পকারখানা গড়ে তোলা হবে। সেখানে হিজড়া সম্প্রদায় অগ্রাধিকার পাবে। জানা গেছে, ২০১৩-১৪ অর্থবছর থেকে হিজড়াদের বয়স্ক ভাতা দিচ্ছে সরকার। ওই বছর ভাতা দিয়েছে ১ হাজার ৭১ জনকে। পরবর্তী বছরে ১ হাজার ৩০০ জনকে দেয়া হয়। ২০১৫-১৭ এ দুই অর্থবছরে পর্যায়ক্রমে ২ হাজার ৩৪০ জন করে ৪ হাজার ৬৮০ জনকে ভাতা দেয়া হয়। অপরদিকে হিজড়াদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অনেকেই এ সুবিধা পাচ্ছেন না প্রবীণ হওয়ার পরও।
মিরপুরের ১০ নম্বর বাসিন্দা আখতার হোসেন বিজয় সরণি থেকে উত্তরা ব্রিজ পর্যন্ত ২০০ হিজড়ার নেতৃত্ব দিচ্ছেন। বয়স্ক ভাতা নিয়ে কথা হয় তার সঙ্গে। আখতার হোসেন বলেন, তার গুরু মা আনুরি বেগম (৬০) কোনো ভাতা পাচ্ছেন না। সে জানায়, গুরু মায়ের ভরণপোষণসহ সব ধরনের দায়িত্ব নিয়ে তিনি এ বিট চালাচ্ছেন। আখতার জানান, আনুরি বেগমের মতো অনেকে বয়স্ক হলেও ভাতা পাচ্ছেন না।
অপরদিকে সন্ধান করে পাওয়া গেছে হিজড়া রেশমি, সজল, আখতার, লাভনীসহ অনেকে এখন ভোটার। অনেক আগেই ওঠেছে তাদের নাম। আখতারের মতে, স্থানীয় লোকজন ভোটার বানাতে তাকে সহায়তা করছে। পুরুষ বা স্ত্রী লিঙ্গের পরিচয়ে তাদের ভোটার বানিয়েছে। এসব হিজড়াকে ভোটার বানাতে যত গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে, ভাতার তালিকায় নাম তুলতে ততটা গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে না। সরকারের নিয়ম অনুযায়ী ৫০ বছর বা এর ঊর্ধ্বে অক্ষম এবং অসচ্ছল হিজড়াকে প্রতিমাসে ৬০০ টাকা হারে ভাতা দেয়ার কথা।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, হিজড়াদের সহায়তা দিতে বিগত ৫ বছরে বিভিন্ন কর্মসূচিতে ২৬ কোটি ৩৮ লাখ টাকা খরচ করেছে সরকার। চলতি অর্থবছরে বরাদ্দ দিয়েছে ১১ কোটি টাকা। এসব কর্মসূচিতে তাদের কাউন্সিলিংয়ের মাধ্যমে স্বাভাবিক ধারায় ফিরিয়ে আনা, বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ও আর্থিক সহায়তা দান, বয়স্ক ভাতাসহ নানা উদ্যোগ নিয়েছে সমাজসেবা অধিদফতর। কিন্তু সেখান থেকে সুবিধা নিয়ে পুনরায় তারা আগের পেশায় ফিরছে।
জানা গেছে, সরকারের দুর্বল মনিটরিং, সঠিক ব্যক্তিকে প্রশিক্ষণ না দেয়ার কারণে এমনটি ঘটছে। পাশাপাশি একটি সিন্ডিকেটের কবল থেকে তাদের মুক্ত করতে করা যাচ্ছে না। এক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা পালন করেন কথিত গুরুমাতারাও। যারা সাধারণ হিজড়াদের দিয়ে চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড করিয়ে নিজেরা হাতিয়ে নিচ্ছেন মোটা অঙ্কের টাকা। এসব গুরুমাতার কারও কারও ঢাকায় ফ্ল্যাটও রয়েছে।
Share Button