ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রেলপথে প্রতিদিন লক্ষাধিক যাত্রী-আসা যাওয়া করিলেও যাত্রীসেবার মান উন্নত হইতেছে না। যাত্রীসংখ্যার তুলনায় ট্রেনে বগির সংখ্যা কম, বগিগুলিতে নাই পয়ঃনিষ্কাশনের সুব্যবস্থা। রেল স্টেশনগুলিতে বসিবার স্থান অপরিচ্ছন্ন। সন্ধ্যার পর রেল স্টেশনগুলি অসামাজিক কার্যকলাপের আখড়ায় পরিণত হয়। সাপ্তাহিক ও সরকারি ছুটির দিন ব্যতীত এই রুটে সরকারি ও বেসরকারিভাবে ১৬ জোড়া ট্রেন চলাচল করে। নারায়ণগঞ্জ রেল স্টেশন হইতে ঢাকা কমলাপুর রেল স্টেশনের দূরত্ব মাত্র ১৮ কিলোমিটার। কিন্তু এই অল্প দূরত্বের রেলপথই যেন ঝুঁকিপূর্ণ এক দুর্গম পথ। ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রেললাইন ঘেঁষিয়া গড়িয়া উঠিয়াছে কাঁচাবাজার, ফলের দোকান, মার্কেটসহ অসংখ্য বস্তি। এই ১৮ কিলোমিটার রেলপথে বৈধ রেল গেট রহিয়াছে ১৩টি। আর অবৈধ রেল ক্রসিং রহিয়াছে কমপক্ষে ৪৫টি যেইখানে কোনো নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নাই। যে যাহার সুবিধামতো যত্রতত্র এইসকল অবৈধ রেলক্রসিং তৈরি করিয়াছে।

 

কিন্তু এই পরিস্থিতি কতকাল আর একইরূপ থাকিবে? রেল চলাচলের জন্য কেবল সমান্তরাল লাইন নহে, নিরাপত্তার জন্য লাইনের উভয় পার্শ্বে যথেষ্ট পরিসর থাকা প্রয়োজন। কিন্তু এইরুটে রেলযাত্রা দেখিলে মনে হয় দোকানপাটের সুড়ঙ্গের ভিতর দিয়া কায়ক্লেশে এক অসহায় যান কচ্ছপগতিতে আগাইয়া চলিয়াছে। অবাঞ্ছিত বস্তি ও দোকানপাটের কারণে প্রায়শই দুর্ঘটনা ঘটিয়া থাকে। হতাহতের ঘটনাও ঘটিতেছে। রেল কর্তৃপক্ষ রহিয়াছে, প্রশাসন রহিয়াছে, সিটি কর্পোরেশন রহিয়াছে, তবুও যুগ যুগ ধরিয়া একইরকম পরিস্থিতি কীভাবে বহাল থাকে তাহা আমাদের বোধগম্য নহে। অভিযোগ আছে, এইসকল অবৈধ দখলদাররা নানান পক্ষকে বখরা প্রদান করিয়া এই অবৈধ দখলদারি চালাইয়া যাইতেছে। আইনের রক্ষক, ভ্রষ্ট সমাজে যেইরূপ হয়, ভক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ। জানা যায়, নারায়ণগঞ্জ রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ গ্রহণ করিতেছে ডাবল লাইন ও প্যারালাল লাইন প্রকল্প। আর তেজগাঁও অঞ্চলের রেললাইনের উপর দিয়া মেট্রোরেলের কাজ শুরু হইবে। তখন এইসকল দোকানপাট আপনাআপনি সরিয়া যাইবে কিনা তাহা আমরা জানি না। আবার সেই আশায় বসিয়া থাকাটাও যুক্তিযুক্ত হইতে পারে না।

 

নিরাপত্তার দিকটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। এই ক্ষেত্রে কোনো প্রকার শৈথিল্য কিংবা আপস চলিতে পারে না। রাজধানীর সম্মান ও সৌন্দর্যের বিচারেও এইসকল ভাসমান দোকান বা বস্তি অনাকাঙ্ক্ষিত। একটি মহানগরের শৃঙ্খলা হানিতে এইসকল অবৈধ ও অপরিকল্পিত দোকানপাট যথেষ্ট অবদান রাখিয়া থাকে। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি আমাদের এইসকল সম্মান-শৃঙ্খলা-সৌন্দর্যের দিকেও মনোযোগ দিতে হইবে। যেহেতু এইসকল দোকানপাটের সহিত গরিব মানুষেরা যুক্ত, তাই কেবল উচ্ছেদই একমাত্র সমাধান হইতে পারে না। তাহাদের জীবিকার বিকল্প ব্যবস্থা বা পরিসর সৃষ্টি করিতে হইবে। আবার উচ্ছেদ করিয়া বসিয়া থাকিলে চলিবে না, ইহার নজরদারি অব্যাহত রাখিতে হইবে। কারণ অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, এইসকল দোকানপাট উচ্ছেদ করিবার অল্প কয়েকদিন পরই পুনরায় বাজার বসিয়া গিয়াছে। সমন্বিতভাবে পুরা বিষয়টি বিবেচনা করিতে হইবে যাহাতে সকল কিছুর সুষ্ঠু সমাধান করা সম্ভব হয়। সর্বোপরি, রেলযাত্রা নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন রাখিতে হইবে। নিশ্চিত করিতে হইবে রেলসেবার মান।
Share Button