বিশ্বজিত্ দাস

 

‘আর খাব না আব্বু। অনেক হয়েছে।’ মাথা নেড়ে বলল মোহনা। শিল্পপতি মনির খানের একমাত্র মেয়ে। স্কুলে পড়ে। বড় হয়েছে, কিন্তু বাপের হাতে আদুরে ভঙ্গিতে খেতে এখনো ভালোবাসে।

মেয়ে খাওয়া বন্ধ করতেই নিজে খেতে বসলেন মনির খান।

এমন সময় চাকর এসে খবর দিল, জহির সাহেব এসেছেন।

তুষার জহির নামকরা একজন চিত্রনাট্যকার। তার লেখা অনেক মুভি সুপার-ডুপার হিট হয়েছে। মনির খানই তাকে ডেকেছেন আজ। বছরে দুটো বাণিজ্যিক সিনেমা তার প্রোডাকশন থেকে নির্মিত হয়।

জহির কিছুদিন থেকেই তার সঙ্গে দেখা করতে চাইছে। দারুণ একটা মুভির গল্প রেডি হয়ে আছে তার। এখন দরকার উপযুক্ত একজন প্রযোজক। মনির খানই নাকি এমন মার্ভেলাস মুভি নির্মাণের বিষয়টা বুঝতে পারবেন।

বসার ঘরে ঢুকতেই তুষার জহির উঠে দাঁড়াল।

‘স্যার, ক্যামন আছেন?’

‘আছি ভালো। কী খবর?’

‘স্যার, দারুণ একটা মুভির স্ক্রিপ্ট লিখে ফেলেছি। এখন দরকার আপনার মতো জাঁদরেল একজন প্রযোজক।’

‘হুমম। সিনেমা কি আজকাল প্রযোজকের নামে চলে? সিনেমা চলে ভালো গল্পের কারণে।’

‘ভালো গল্পের নির্মাতাও তো ভালো হতে হবে স্যার। আর ভালো নির্মাতা তো আপনার মতো প্রযোজকরাই জোগান দিতে পারে।’

‘হুমম। ঠিক আছে। বলো, শুনি তোমার গল্পটা কেমন?’

জহির শুরু করতে যাবেন, অমনি মোহনা নিঃশব্দে ঘরে ঢুকে বাবার পাশে বসে পড়ল। হাতে মোবাইল। ফেসবুক দেখছে।

জহির ইতস্তত করল। মনির ইশারায় শুরু করতে বললেন তাকে। তিনি জানেন, নতুন মুভির গল্প শুনতেই এসে বসেছে মোহনা।

জহির শুরু করল—

‘এই ছবিতে আমাদের হিরোর নাম বাদল। বাবা-মা নেই। ভাই-ভাবির সংসারে মানুষ। নিঃসন্তান ভাবি তাকে ছেলের মতো স্নেহ করেন। বড়ভাই কারখানায় চাকরি করেন। শ্রমিকদের জন্য মালিক পক্ষের সাথে প্রায়ই তার বিরোধ দেখা দেয়।

একদিন মালিক পক্ষ খুন করে তাকে এবং ভাই হত্যার দায়ে ফাঁসিয়ে দেয় বাদলকে। জেলে গিয়ে বাদল বদলে যায়। চার কয়েদি বন্ধু জোটে তার। তাদের সহায়তায় জেল ভেঙে পালায় এবং নতুন পরিচয়ে প্রতিশোধ নেওয়ার পালা শুরু করে। তাকে হেল্প করতে এগিয়ে আসে তার প্রেমিকা বেগম জান।’

এই পর্যন্ত বলে থামল জহির।

‘ছবির নাম ভূমিকায় কাকে ভেবেছ তুমি?’ মনির খান বললেন।

‘শাকিব খান হলে সবচেয়ে ভালো হয়। নইলে কলকাতা থেকে জিত্-কে নিলে মানাবে ভালো।’

‘হুমম। নাম কী হবে তোমার এই মুভির?’

‘ফ্যান্টাস্টিক নাম স্যার। মুভির নাম হবে—বাদল।’

‘এই নামে তো আগে মুভি হয়েছে। সেই মুভি তো সুপারহিট ছিল।’

‘জানি স্যার। সেজন্যই তো স্যার ‘বাদল’ নামটা পছন্দ করেছি। পুরোনো যুগের বাদলের

 

 

দর্শকরা নুতন যুগের বাদলকে তুলনা করবে। মিডিয়াও সেটা লুফে নেবে।’

‘কিন্তু, এই গল্প তো নকল।’ এফবি দেখতে দেখতে বলল সোহানা। সে একজন মুভিপোকা। যেকোনো মুভির নায়ক-নায়িকা, পরিচালক, মিউজিক ডিরেক্টর থেকে শুরু করে গানের লাইন পর্যন্ত মুখস্থ থাকে।

‘নকল!’ জহির বিস্ময় প্রকাশ করল।

‘হ্যাঁ। অমিতাভ বচ্চনের ‘কালিয়া’ ছবির কাহিনিও তো এটাই। তফাত্ হলো ওখানে নায়কের নাম কালিয়া আর এখানে নায়কের নাম বাদল।’

খুক খুক করে কাশল জহির।

কাশি থামতেই বলল, ‘মোটেও না। আমি পাঁচ-ছয়টা তামিল মুভি দেখে দেখে এই মৌলিক কাহিনি লিখেছি। নকল হতেই পারে না।’

মোহনা বাবার দিকে ঘুরে বলল, ‘আচ্ছা বাবা, তোমার রিয়েল হিরো নিয়ে কেন সিনেমা বানাও না। ইন্ডিয়াতে রিয়েল হিরো নিয়ে কত তো সিনেমা নির্মাণ হয়—ভাগ মিলকা ভাগ, দঙ্গল, সুলতান, প্যাডম্যান আরও কত। সবই সুপারহিট সিনেমা। তোমরা কেন এমন মুভি বানাও না?’

‘এমন রিয়েল হিরো পাব কোথায় বল।’ হেসে বললেন মনির খান।

জবাবে ফেসবুকে দৈনিক পত্রিকার একটি নিউজ বড় করে দেখাল মোহনা, ‘এই যে দেখ, আমাদের রিয়েল হিরো। নাম তার ইউনুস বাদল। ১০ বছর আগে গাড়ির চোরের হোতা হিসেবে পুলিশের হাতে ধরা পড়েছিলেন। এখন ব্যাংকের ঋণের টাকায় গড়েছেন ২২টি শিল্প প্রতিষ্ঠান। নিজস্ব হেলিপ্যাডও আছে। মন্ত্রীর হাত থেকে পুরস্কার পর্যন্ত নিয়েছে। এমন রিয়েল হিরো থাকতে তুমি পয়সা খরচ করে খামোকা তামিল মুভির কপি কেন বানাবে। তার চেয়ে এই বাদলের জীবন নিয়ে তুমি মুভি বানাও বাবা। মুভির নাম রাখবে ব্যতিক্রম। যেমন— গাড়িচোর কেন কোটিপতি। দেখবে দর্শক সিনেমা হলে হুমড়ি খেয়ে পড়ে। দারুণ হবে তাই না আঙ্কেল?’

জহিরের দিকে প্রশ্ন ছুঁড়ল মোহনা।

জহির কোনো জবাব দিল না।

শুধু সোফায় কোনায় বসে থাকা পোষা বিড়ালটা বলল, ‘মিউ।’

Share Button