রংপুর ব্যুরো॥
রংপুর অঞ্চলে অবৈধ ইট, বালু, মাটি বহনকারী ট্রলি ও ট্রাক্টরের দৌরাত্ম্য দিন দিন বেড়েই চলেছে। এদের বেপরোয়া গতিতে চলাচলের কারণে প্রতিনিয়ত ঘটছে দুর্ঘটনা। ফলে অকালে ঝরে যাচ্ছে তরতাজা প্রান। কাউকে আবার সারা জীবনের মতো বরণ করতে হচ্ছে পঙ্গুত্ব। এছাড়া এগুলোর বিকট শব্দের কারণে ঘটছে শব্দ দূষণও। ফলে জনসাধারণ সার্বক্ষণিক আতংকের মধ্যে দিনাতিপাত করছেন। কিন্তু চোখের সামনে অবৈধ এই যানের অবাধ চলাচল দেখেও অদৃশ্য কারণে কার্যকর কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করছে না পুলিশ প্রশাসন। ফলে তাদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠেছে।
জানা যায়, একাধিক প্রয়োজনীয়তা ও সুবিধার ভিত্তিতে কৃষিজমি চাষাবাদের জন্য গ্রাম বাংলার চাষীদের কাছে ট্রাক্টর খুব জনপ্রিয়। আর দেশের কৃষি উন্নয়ন তথা চাষবাসের কাজে ব্যবহার করার জন্যই সরকার বিদেশ থেকে ট্রাক্টর আমদানি করার অনুমতি দেয়। কিন্তু চাষাবাদের জন্য আমদানিকৃত এই ট্রাক্টর অবৈধ ট্রলি-ট্রাক বা নানা পরিবহনে রূপান্তিরত হয়ে মানুষের সর্বনাশ ঘটাতে শুরু করেছে। আবাদি জমি ছেড়ে দাবড়ে বেড়াচ্ছে গ্রামাঞ্চল, শহর ও বাজার কেন্দ্রিক সড়কগুলোতে। ড্রাইভিং লাইসেন্সের প্রয়োজন না হওয়ায় শিশু-কিশোররাও অদক্ষভাবে এসব ট্রাক্টর অবাধে চালাবার সুযোগ পাচ্ছে। ফলে প্রতিনিয়ত ঘটছে সড়ক দুর্ঘটনা।
হাইওয়ে পুলিশ সূত্রে জানা যায়, রংপুর বিভাগের গাইবান্ধা, রংপুর, লালমনিটরহাট, কুড়িগ্রাম, নীলফামারী, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড় জেলায় গত বছর মহাসড়কে ছোট বড় প্রায় সাড়ে ৩ হাজার দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে করে প্রাণ হারিয়েছেন ৫৬২  জন এবং পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন হাজার হাজার মানুষ। বে-সরকারি হিসেবে এ সংখ্যা দ্বিগুন হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন। এছাড়া বিভিন্ন জন বিভিন্ন স্থানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করলেও হিসেবের খাতায় তা আসে নি। ঘটনা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, প্রায় প্রতিটি ঘটনাতেই আছে অবৈধ যান। যার মধ্যে অন্যতম বেপরোয়া গতির এই ট্রাক্টর।
এদিকে, বেপরোয়া গতি ও কানফাটা আওয়াজে চলাচলকারী এসব ট্রাক্টরের কারণে শহরের পাশাপাশি গ্রামগুলোতে ব্যাপকভাবে পরিবেশ দূষণ দেখা দিয়েছে। শব্দ ও বায়ুদুষণ এখন গ্রামের প্রতন্ত অঞ্চলেও পৌঁছে দিয়েছে এসব ট্রাক্টর ও ট্রলি। এছাড়া এই এদের বিশাল আকৃতির চাকার কারণে রাস্তার ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। পাকা রাস্তার পেভমেন্ট ভেঙে যাচ্ছে। চুর্নবিচুর্ন হচ্ছে ইটের রাস্তা। গ্রামের মেঠো পথগুলোর মাটি আলগা হয়ে জমিতে মিশে যাচ্ছে। বিলীন হতে শুরু করেছে মেঠো পথগুলো। সরকারের কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত রাস্তাঘাট বিনষ্ট হচ্ছে। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশের অর্থনৈতিক দিক।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, সরকারি সুযোগকে কাজে লাগিয়ে এক শ্রেণীর আমদানিকারক অবাধে আমদানি করে ট্রাক্টর। আমদানিকারকরা এসব ট্রাক্টর বিক্রি করে ইটভাটার মালিক, মাটি ও বালু ব্যবসায়ী, কাঠ ব্যবসায়ী ও শিল্প মালিকসহ সাধারণ পরিবহন ব্যবসায়ীদের কাছে। ট্রাক্টর ও এর ড্রাইভারের জন্য কোনো লাইসেন্সের প্রয়োজন না হওয়ায় সহজেই এসব পরিবহন কিনে আনে ব্যবসায়ীরা। তারা এসব ট্রাক্টর কিনে কৃষি কাজের পরিবর্তে ব্যবহার করছে পরিবহন কাজে। ফলে গ্রামগঞ্জ ও শহরে ট্রাক্টরের সংখ্যা ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। রংপুর অঞ্চলের বিভিন্ন জেলায়ও তার ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেছে। বিভাগে অবৈধ এই ট্রলি-ট্রাক্টরের সংখ্যা কত, সে বিষয়ে জেলা প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট কারও কাছে কোনো তথ্য নেই। তবে বিভাগজুড়ে হাজার হাজার ট্রলি-ট্রাক্টর হাইওয়ে থেকে শুরু করে গ্রামের রাস্তাগুলোতে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। সড়কগুলোতে এ ধরনের যানের কারণে এখন পা ফেলাই দায়। বিশাল চাকার জটিল প্রযুক্তির এ যান রাস্তায় চলাচলের সময় কার উপর গিয়ে উঠে তা বলা মুশকিল। তাই ট্রলি-ট্রাক্টরের ভয়ে রাস্তা-ঘাটে চরম উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার মধ্যে চলাচল করছে মানুষ। সড়কে এই অবৈধ যান চলাচল বন্ধ করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের জোর দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল।
এদিকে অভিযোগ রয়েছে, প্রশাসন অবৈধ এ যান চলাচল প্রতিরোধে আইনগত ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো তাদের সহযোগিতা করছে। হাইওয়ে পুলিশসহ থানা পুলিশকে ম্যানেজ করে এসব ট্রলি-ট্রাক্টর সড়কে চলাচল করার কারণে জনসাধারণের প্রতিরোধের মুখেও তা বন্ধ হচ্ছে না। বেশ কিছু ট্রাক্টর মালিকের সাথে কথা হলে তারা জানান, প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্তা-ব্যক্তিদের মাসোহারা দিয়েই এসব ট্রলি-ট্রাক্টর সড়ক-মহাসড়কে চালাচ্ছেন তারা।
জানতে চাইলে সড়ক দুর্ঘটনা রোধে কাজ করা সংগঠন নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা)’র রংপুরের সভাপতি ডা. জিল্লুর রাব্বি বলেন, ট্রাক্টর ও পাওয়ার টিলার দুটিই মাঠে কৃষিকাজের জন্য অনুমোদিত, সড়ক-মহাসড়কে চলাচল কিংবা পণ্য সামগ্রী বহনের অনুমতি নেই। সম্পূর্ণ বে-আইনিভাবে এ যানটি সড়কে চলাচল করছে। এটা খুবেই বিপদজনক। এদের বেশিরভাগেরই লাইসেন্স নেই। অথচ প্রতিটি ইঞ্জিনচালিত যানবাহনের লাইসেন্স প্রয়োজন। এছাড়া ট্রাক্টর চালদেরও নেই কোন প্রশিক্ষণ। ফলে সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এ অবৈধ যান। তিনি আরো বলেন, সড়ক থেকে এসব অবৈধ যান চলাচল প্রতিরোধে আমরা বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করি।  ট্রাক্টর চালকদের প্রশিক্ষণ ও সার্টিফিকেট প্রদান করি।
সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ)’র রংপুর জেলা কার্যালয়ের নিবার্হী প্রকৌশলী সাজেদুর রহমান বলেন, সড়কে বে-আইনিভাবে ট্রাক্টর চলাচল করছে। সড়ক নিরাপত্তার জন্য এসব অবৈধ যানের চলাচল প্রতিরোধ করা জরুরি হয়ে পড়েছে। একই কথা বলেন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)’র রংপুরের সহকারী পরিচালক আব্দুল কুদ্দুস। তিনি জানান, সড়কে ট্রাক্টর চলাচল প্রতিরোধ করতে মাঝে মধ্যেই মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হচ্ছে। এছাড়া জোরদার পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য প্রশাসনের সহযোগিতা চাইবেন তারা।
বড়দরগা হাইওয়ে পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, অবৈধ এ যানের চলাচল প্রতিরোধে প্রতিদিনই বিভিন্ন স্থানে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। যারা ধরা পড়ছেন তাদের বিরুদ্ধে জড়িমানা ও মামলা করাসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।
রংপুর কোতয়ালী থানার ওসি বাবুল মিঞা বলেন, সড়কে বেআইনিভাবে ট্রাক্টর চলাচল করছে। আমরা যতটুকু সম্ভব অভিযান পরিচালনা করে ট্রাক্টর মালিক ও চালকদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়ার চেষ্টা করছি। প্রকৃতপক্ষে যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা ট্রাফিক বিভাগের কাজ। এ সংক্রান্ত বিষয়ে তারাই ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। এগুলো থানা পুলিশের কাজ না। পুলিশের ম্যান পাওয়ার সীমিত। এই সীমিত ম্যান পাওয়ার দিয়ে ক্রাইম, রিটেকশন, প্রটেকশন, প্রোটকল, মামলা তদন্তসহ পুলিশকে অনেক রকম কাজ করতে হয়। এরপরেও এডিশনাল কাজ হিসেবে আমরা তাদের দায়িত্ব পালন করছি।
রংপুর জেলা ট্রাফিক পুলিশের ইনচার্জ খাঁন মো. মিজানুর ফাহিমী বলেন, সড়ক নিরাপত্তার জন্য এসব অবৈধ যানের চলাচল প্রতিরোধে আমরা কাজ করছি। বিভিন্ন স্থানে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করছি। যারা ধরা পড়ছেন তাদের যান আটকে রাখা ও জড়িমানা করাসহ প্রয়োজনী আইনি ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।
রংপুর জেলা প্রশাসক এনামুল হাবিব বলেন, ট্রাক্টরের সড়ক-মহাসড়কে চলাচল কিংবা পণ্য সামগ্রী বহনের অনুমতি নেই। তারপরেও অবৈধভাবে এসব যান সড়কে চলাচল করছে। এদের বিরুদ্ধে শিগগিরই ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করবে জেলা প্রশাসন।

Share Button