মানুষ অত্যন্ত আবেগপ্রবণ প্রাণী। আত্মসম্মানবোধে প্রবল আঘাত কিংবা আকস্মিক কোনো মানসিক বিপর্যয়ে কোনো কোনো মানুষ মনে করিতে পারেন— এই জীবনের বুঝি কোনো মূল্য নাই! মহামূল্যবান জীবনটিকে কেবল প্রবল আবেগের বশে, পারিপার্শ্বিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে মুহূর্তের সিদ্ধান্তে ধ্বংস করিয়া ফেলেন কেহ কেহ। রাজধানীর শাহজাহানপুরে গত মঙ্গলবার গলায় ফাঁস লাগাইয়া আত্মহত্যা করিয়াছে সুমাইয়া আক্তার মালিহা নামের চৌদ্দ বত্সর বয়সী একজন শিক্ষার্থী। শহীদ ফারুক ইকবাল বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্রী মালিহা সুইসাইড নোটে আত্মহত্যার জন্য দায়ী করিয়াছে তাহার স্কুলেরই এক শিক্ষিকাকে। সুইসাইড নোটে মালিহা জানাইয়াছে যে, তাহার সুইসাইড করিবার একমাত্র কারণ তাহার স্কুলের এক শিক্ষিকা। মালিহাকে দেখিয়া নাকি ওই শিক্ষিকা অযথা পরীক্ষার সময় খাতা লইয়াছেন এবং পরীক্ষায় কম নম্বর প্রদান করিয়াছেন। মালিহা ওই শিক্ষিকার মানসিক চিকিত্সার সুপারিশ করিয়াছে। মানসিক হাসপাতালে পাঠাইতে বলিয়াছে। কারণ, ওই শিক্ষিকা তাহাকে অভিশাপ দিয়াছে এবং মালিহার ভালো রেজাল্ট খারাপ হইয়াছে।
মালিহার বয়সটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মনোবিজ্ঞানীরা সবসময়ই বলিয়া আসিতেছেন, বয়ঃসন্ধিকালের এই সময়টিতে মানুষ সবচাইতে আবেগপ্রবণ হইয়া থাকে। আত্মসম্মানবোধ ও অপমানবোধ অত্যন্ত তীব্র হইয়া থাকে। জীবনকে দেখে স্বপ্নের রঙিন ফানুসে, সেই ফানুস কোনো কারণে ফুটা হইয়া গেলে মনে করে যে, জীবনের যেন আর কোনো মূল্য নাই! বলিবার অপেক্ষা রাখে না যে, এক ধরনের চরম অসহায়ত্ব হইতেই উত্সারিত হয় আত্মহত্যার ভাবনা। মালিহার সুইসাইড নোট সত্য হইয়া থাকিলে বলা যায় যে, অভিযুক্ত শিক্ষিকার মানসিক কাউন্সেলিং প্রয়োজন। কারণ, একজন শিক্ষার্থীর সহিত জেদবশত ক্ষমতা জাহির করিবার বিষয়টি কোনোভাবেই সুস্থ মানসিকতার পরিচয় হইতে পারে না। ইহা সর্বাগ্রে স্মরণে রাখিতে হইবে যে, শিক্ষকের নিকট একজন শিক্ষার্থী শিক্ষাগ্রহণের অনুগ্রহপ্রার্থী। সুতরাং শিক্ষার্থীর যদি কোনো সমস্যা থাকেও, তবে তাহার জন্য ওই শিক্ষার্থীকে মানসিকভাবে নির্যাতন করা অপরাধ সমতুল্য। মালিহার এই ঘটনার ক্ষেত্রে আরো অভিযোগ রহিয়াছে যে, স্কুল কর্তৃপক্ষের নিকট মালিহা ওই শিক্ষিকার ব্যাপারে মৌখিক অভিযোগ করিলেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় নাই। বরং প্রধান শিক্ষকের নিকট অভিযোগ করিবার কারণে ওই শিক্ষিকা আরো ক্ষিপ্ত হইয়া মালিহার খাতায় নম্বর কমাইয়া দেওয়ার পাশাপাশি ক্লাসে খারাপ ব্যবহার করেন। এই অভিযোগ সত্য হইয়া থাকিলে মালিহার আত্মহত্যার দায় স্কুল কর্তৃপক্ষও এড়াইতে পারে না।
আত্মহত্যা একটি বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্যজনিত সমস্যা। দ্রুত পরিবর্তনশীল সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রভাব আমাদের জীবনে গভীরভাবে ছাপ ফেলিতেছে নিরন্তর। মালিহা জানিত না, যাহাকে সে মানসিক চিকিত্সা দেওয়ার কথা বলিতেছে, সেই মানসিক চিকিত্সা তাহারও প্রয়োজন ছিল। কারণ, সে কি করিয়া মনে করিল— জীবন এত সস্তা? সে বরং জানিত না, আত্মহত্যাই একজন ব্যক্তির সবচাইতে বড় অপমান, সবচাইতে বড় পরাজয়। আত্মহত্যার মতো ভয়াবহ পরিণতির দিকে আমাদের প্রিয় মানুষগুলি যাহাতে পা না বাড়ায়, তাহার জন্য এই জীবনশিক্ষা ছড়াইয়া দেওয়া প্রয়োজন যে— জীবন বড় মূল্যবান। জীবন এত সহজে মূল্যহীন হয় না কখনো।
Share Button