একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের সর্ববৃহৎ দুই রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নিজেদের জোট ভারী করতে কিংবা মিত্রশক্তি বাড়াতে তুমুল প্রতিযোগিতায় নেমেছে। কে কত বেশি সংখ্যক দলকে কাছে টানতে পারে, এখন চলছে যেন সেই প্রতিযোগিতা। এজন্য তারা প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে ছুটছে ছোট-মাঝারি-ক্ষুদ্র, নিবন্ধিত-অনিবন্ধিত বিভিন্ন দলের কাছে। এনিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গণসহ প্রায় সবখানে এখন যেসব প্রশ্ন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে তা হলো, আওয়ামী লীগ ও বিএনপি তো দেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দল, দেশের রাজনীতি ও জনগণকে নিয়ন্ত্রণও করছে এই দুটি দল; তাহলে তারা ‘নাম-পরিচয়হীন’ এসব দলের দ্বারস্থ হচ্ছে কেন? আর ছোট দলগুলোই বা কী কারণে বড় দলের সঙ্গে জোটসঙ্গী হয়ে থাকছে, কেন নিজেরাও জোটচক্র ছাড়ছে না? জনভিত্তিহীন অসংখ্য আরও ছোট-ক্ষুদ্র দলই বা কেন নতুন করে ভিড়ছে বড় দুই দলের ছাতার নিচে?
আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দল, বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলের নেতা-কর্মীদের নিজেদের আলাপ-আড্ডায় কান পাতলেও এমন প্রশ্ন শোনা যায়। কেউ বলেন, আওয়ামী লীগ ও বিএনপি তো গর্ব করেই বলে- দেশের জনগণ তাদের সাথে, ভোটাররাও তাদের পক্ষে রায় দেয়ার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষমান। জনগণের কাছে এরকম একচেটিয়া অবস্থান থাকার পরেও কেন তারা ছোটদের কাছে ধর্ণা দিচ্ছে? আওয়ামী লীগ ও বিএনপি বিভিন্ন সময়ে অন্য একাধিক দলের সমর্থন নিয়ে সরকার গঠন করলেও কার্যত সেগুলো হয়েছে ‘একদলীয় সরকার’। সরকার গঠনের পর বড় দুই দলের নেতারাও বক্তবে-মন্তব্যে ‘আওয়ামী লীগ সরকার’ কিংবা ‘বিএনপি সরকার’ বলে থাকে। তখন নির্বাচনে সঙ্গী হওয়া এবং সরকার গঠনে সমর্থন দেওয়া ছোট ও ক্ষুদ্র দলগুলোকে নিজেদের অস্তিত্ব হাতড়ে বেড়াতে হয়।
অফিস-আদালত ও চা-দোকানে সাধারণ মানুষের আলোচনায় কান দিলেও এরকম প্রশ্ন শোনা যায়, নাম-গোত্রহীন ছোট দলগুলো তো নিজেরা একা নির্বাচন করে কোথাও জিততে পারে না বা পারবেও না। শতাধিক দলের নাম-ঠিকানাও খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। এরপরেও বিপুল জনসমর্থনধারী বৃহত্ দুই রাজনৈতিক শক্তিকে কেন ছুটতে হচ্ছে ওইসব অখ্যাত-জনসমর্থনহীন দলগুলোর কাছে? কেন-ই বা সাইনবোর্ড আর নামসর্বস্ব এসব দলকে সঙ্গে রেখে দুর্নাম কুড়াচ্ছে?  বরং দুটি দলই কেন ভোটের হিসাবে নস্যি দলগুলোকে ঝেড়ে ফেলে দেয় না? কেন এককভাবে নির্বাচন করে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করার মাধ্যমে নিজেদের রাজনৈতিক একক শক্তির জানান দিতে চায় না?
এসব প্রশ্ন যখন প্রায় সব মহলে ঘুরপাক খাচ্ছে তখন বেশ কয়েকটি দলের নেতা-কর্মীদের নিজেদের মধ্যে আলোচনার সারবত্তা ছিল এরকম, ভোটের অঙ্কে গুরুত্বহীন ছোট দলগুলোকে সঙ্গে নিয়ে অযথা দুর্নামের ভার থেকে মুক্ত হওয়ার এখনই উপযুক্ত সময়। সামনে ভোট, এসব অখ্যাত দলগুলোকে বাদ দিয়ে আওয়ামী লীগ-বিএনপি নিজেরা এককভাবে নির্বাচন করে নিজেদের শুদ্ধতা বজায় রাখার পাশাপাশি বিরাট জনভিত্তিরও পরিচয় দিতে পারে।
ছোট-বড়, নতুন-পুরনো বিভিন্ন জোট এবং আরও যারা জোটবদ্ধ হওয়ার জন্য দৌড়ঝাঁপ করছে এমন বহু দলের নেতা-কর্মী নিজেদের ঘরোয় আলোচনায় এমন কথাও বলাবলি করছেন যে, আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নেতাদের চলন-বলন, ভাবসাব, শরীরি ভাষা কিংবা চেহারা পাঠ করলে প্রতীয়মান হয়, তারা আসলে জোটের সঙ্গীদের কোনো ফ্যাক্টরই মনে করে না। এই প্রসঙ্গে আলোচনায় উদাহরণ হিসেবে কেউ কেউ জাতীয় পার্টি (জাপা) চেয়ারম্যান এইচএম এরশাদের বিভিন্ন সময়ে করা, ‘আওয়ামী লীগ, বিএনপি কেউ আমাদের মূল্যায়ন করেনি’, ‘২১ বছর পর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসেছে আমাদের সমর্থন নিয়ে, এরপরেও আমাদের সমর্থন ছাড়া আওয়ামী লীগ কখনও সরকার গঠন করতে পারেনি, কিন্তু বিনিময়ে কি পেয়েছি!’ ‘বিএনপিকেও সরকার গঠনে সমর্থন দিয়েছিলাম, বিনিময়ে পেয়েছি অবজ্ঞা আর মামলা’- এসব উক্তি সামনে আনছেন। এসব উক্তি নিয়ে বিশ্লেষণ শেষে আলোচনায় অংশগ্রহণকারীরা পরে এই প্রশ্নও তুলছেন, যদি অযত্ন-অবহেলাই করা হবে তাহলে অন্য দলকে নিয়ে বড় দলদুটো কেন জোট বাঁধে? আর যদি মূল্যায়ন না পায় কিংবা নিজেরা তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের শিকার হচ্ছেন বলে মনে করেন, তাহলে অন্যরাও বা কী কারণে বড় দলের সঙ্গে গাঁটছড়া হয়ে থাকছেন, কেন তারা নিজেরাও বড় দলকে ছেড়ে যাচ্ছেন না- এ যেন কোটি টাকার প্রশ্ন।
Share Button