জাতীয় পার্টির (জাপা) চেয়ারম্যান এইচএম এরশাদের ‘গুরুতর’ অসুস্থতা, ঢাকা সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) একদিনের চিকিত্সা শেষেই হাসপাতাল ত্যাগ করা, বারিধারায় প্রেসিডেন্ট পার্কে নিজ বাসায় না গিয়ে গোপন স্থানে অবস্থান করা, মোবাইল ফোন বন্ধ রাখা এবং নির্ধারিত কয়েকজন ছাড়া অন্য কারও সাক্ষাতের অনুমতি না থাকা নিয়ে নানা জল্পনা-কল্পনা চলছে। খোদ দলটির ভেতরেই নেতাদের মুখে মুখে নানা কথা।

এরশাদের ঘনিষ্ঠজনরা জানান, বয়সের কারণে দীর্ঘদিন ধরেই নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগছেন এরশাদ। বিশেষ করে, তার রক্তে কখনও সোডিয়াম কমে যায়, কখনও হিমোগ্লোবিন কমে যায়। এজন্য কিছুদিন পরপরই হাসপাতালে গিয়ে তাকে রক্ত নিতে হয়। মাস খানেক আগে রক্তে সোডিয়ামের মাত্রা আশঙ্কাজনক মাত্রায় কমে যাওয়ায় তিনি কয়েকদিন সিএমএইচে ভর্তি ছিলেন, নিতে হয়েছিল কয়েক ব্যাগ রক্ত। এবার হিমোগ্লোবিন কমে যাওয়ায় বৃহস্পতিবার তিনি সিএমএইচে ভর্তি হন। চিকিত্সকরা তার কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করান। এরপর কোনো ধরনের চাপ না নিয়ে এবং সাক্ষাতপ্রার্থী এড়িয়ে নিরিবিলি স্থানে অবস্থানের পরামর্শ দিয়ে চিকিত্সকরা শনিবার তাকে ছেড়ে দেন। কিন্তু হাসপাতাল ত্যাগের পর এরশাদ তার বারিধারার বাসা ‘প্রেসিডেন্ট পার্ক’-এ যাননি। তিনি গুলশানে একটি বহুতল ভবনের ফ্ল্যাটে অবস্থান করছেন। গতকাল সোমবারও তিনি ওই গোপন স্থানেই ছিলেন।

জাপা নেতাদের কেউ কেউ বলছেন, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের কয়েকদিন আগেও এরশাদ ‘অসুস্থ’ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন, এবারও সেই ধরনের কিছু কি-না কে জানে। কারও মতে, বাসায় দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশীদের ভিড় এড়াতে তৃতীয় স্থানে অবস্থান করছেন তিনি। আবার কারও ধারণা, আগে কখনও দলে ছিলেন না-এমন কাউকে কাউকে মনোনয়ন দেওয়ার আগাম প্রতিশ্রুতি দিয়ে এখন ঝামেলা এড়ানোর কৌশল হিসেবেই মোবাইল ফোন বন্ধ করে অন্যত্র অবস্থান করছেন। তবে দলটির বেশিরভাগ নেতা-কর্মীর বিশ্বাস, এরশাদ আসলেই অসুস্থ, নেতা-কর্মী ও মনোনয়ন প্রতাশীদের চাপ এড়াতেই তিনি নিরিবিলি স্থানে থাকছেন।

জাপা মহাসচিব এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদার গতকাল ইত্তেফাকের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, ‘স্যার ভালো আছেন। আসলে অন্য কিছু নয়, নির্বাচনে মনোনয়ন প্রত্যাশীদের এত চাপ-যেটা সামাল দিতে গিয়ে স্যার দুর্বল হয়ে পড়ছিলেন, এজন্য অন্যত্র একটু নিরিবিলি অবস্থান করছেন।’

এরশাদের অসুস্থতার কারণে আসন্ন একাদশ সংসদ নির্বাচনে জাপার দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশীদের সাক্ষাতকার গ্রহণের সময়সূচিও পরিবর্তন করা হয়েছে। কথা ছিল ১৭ ও ১৮ নভেম্বর সাক্ষাতকার নেওয়া হবে। পরে পরিবর্তন করে বলা হয়েছিল ২০ ও ২১ নভেম্বর সাক্ষাতকার নেবে দলের পার্লামেন্টারি বোর্ড। গতকাল আরেক দফা পরিবর্তন এনে জাপার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দু’দিন নয়, আজ মঙ্গলবার একদিনেই সাক্ষাতকার শেষ করা হবে। সকাল ১০ টায় গুলশানের ইমান্যুয়েলস কনভেনশন সেন্টারে এই সাক্ষাতকার নেওয়া হবে। সাক্ষাতকার বোর্ডে এরশাদ উপস্থিত থাকবেন কি-না তা নিয়েও সংশয় দেখা দিয়েছে।

গোপন স্থানে অবস্থানের মধ্যেই যে কয়জন এরশাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করছেন তাদের মধ্যে অন্যতম জাপার প্রেসিডিয়াম সদস্য মেজর (অব.) খালেদ আখতার। তিনি এরশাদের ভাতিজা এবং ব্যক্তিগত সচিবও। খালেদ গতকাল ইত্তেফাকের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, ‘স্যার যদি গুরুতর অসুস্থ থাকতেন তাহলে চিকিত্সকরা নিশ্চয়ই একদিন পরেই তাকে ছেড়ে দিতেন না। স্যার ভালো আছেন। মনোনয়ন প্রত্যাশীদের চাপ এড়াতেই তিনি একটু নির্জঞ্ঝাট স্থানে থাকছেন। আমি দায়িত্ব নিয়ে বলছি- মঙ্গলবার (আজকের) মনোনয়ন প্রত্যাশীদের সাক্ষাতকার গ্রহণ অনুষ্ঠানে স্যার উপস্থিত থাকবেন।’ এরশাদের সঙ্গে যোগাযোগ থাকা আরেকজন হলেন জাপার প্রেসিডিয়াম সদস্য সুনীল শুভ রায়, তিনি ইত্তেফাককে বলেন, ‘মনোনয়ন প্রত্যাশীরা রাতদিন স্যারকে ফোন করতেছিলেন, যার কারণে স্যার অসুস্থ বোধ করেন। এই কারণে তিনি মোবাইল ফোন বন্ধ রেখেছেন।’

এদিকে, এরশাদের অসুস্থতা ও অন্যত্র অবস্থানকে ঘিরে সৃষ্ট জল্পনা-কল্পনার মধ্যে জাপার রাজনীতিতেও কিছু পরিবর্তন দৃশ্যমান। এরশাদের দৃশ্যমান অনুপস্থিতিতে দলে হঠাত্ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছেন এরশাদপত্নী রওশন এরশাদ ও দলের মহাসচিব এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদার।

Share Button