আমদানিকৃত পণ্যচালানে মিথ্যা ঘোষণার পণ্য থাকার গোয়েন্দা তথ্য থাকায় ওই চালানটি খালাস না করতে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজকে অনুরোধ জানায় শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগ। কিন্তু স্থগিতাদেশ থাকা (বিন লক) ওই চালান অবসরে যাওয়া এক কর্মকর্তার আইডি ও পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে খালাস হয়ে গেছে। অভিনব এই ঘটনা তদন্ত করতে গিয়ে জানা যায়, কেবল দুই কর্মকর্তার আইডি ব্যবহার হয়েছে চার হাজারবার।

এ প্রক্রিয়ায় শত শত মিথ্যা ঘোষণার পণ্য চালান বন্দর থেকে বেরিয়ে গেছে বলে আশঙ্কা করছে শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগ। এর ফলে সরকারের বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ক্ষতির শঙ্কা ছাড়াও রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য ক্ষতিকর কিছু আমদানি হলো কিনা, তা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছে।

অভিনব এ ঘটনা নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে পুরো রাজস্ব প্রশাসনে। গত সপ্তাহে শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগ এনবিআর চেয়ারম্যানকে চিঠি পাঠিয়ে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে এনবিআর, চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজ ও শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগ আলাদা তিনটি কমিটি গঠন করে আরো অনিয়ম বের করতে বিশদ অনুসন্ধান শুরু করেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ইতোমধ্যে ঢাকার রমনা থানায় একটি মামলা হয়েছে। অভিযুক্ত এক সিএন্ডএফ এজেন্টকে গ্রেফতারও করা হয়েছে। এই আলোচনার মধ্যেই চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজের কমিশনার ড. এ কে এম নুরুজ্জামানকে বদলি করে তার স্থলে ঢাকা দক্ষিণ ভ্যাট কমিশনার কাজী মোস্তাফিজুর রহমানকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কেবলমাত্র একজন কর্মকর্তার আইডি ব্যবহার করে কিংবা একজনের মাধ্যমেই এ ধরনের অনিয়ম করা সম্ভব নয়। এর সঙ্গে একটি চক্র জড়িত থাকতে পারে। এ প্রক্রিয়ায় বছর বছর ধরে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজে কী ধরনের অনিয়ম হয়েছে, তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। শুধু তাই নয়, অন্যান্য শুল্ক স্টেশনগুলোতেও এ প্রক্রিয়ায় পণ্য চালান খালাস হয়েছে বলে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। কর্মকর্তারা বলছেন, এটি বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি যাওয়ার মতই আশঙ্কাজনক ঘটনা।

শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. শহীদুল ইসলাম ইত্তেফাককে বলেন, অভিনব কায়দায় এ অনিয়ম হয়েছে। একক প্রচেষ্টায় এ ধরনের পণ্য চালান মূল্যায়ন কিংবা খালাস করা সম্ভব নয়। এর পেছনে আর কারা কারা জড়িত আছে তা খুঁজে বের করার চেষ্টা করছি। এছাড়া এ প্রক্রিয়ায় দেশব্যাপী সব শুল্ক হাউজ থেকে কী পরিমাণ পণ্য চালান বের হয়েছে তা বের করতে তদন্তকাজ চলছে। এর মাধ্যমে বিশাল অঙ্কের রাজস্ব সরকার হারিয়েছে বলে আশঙ্কার কথা জানান তিনি।

শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগ সূত্র জানায়, ঢাকার আহসানউল্লাহ রোডের জারার এন্টারপ্রাইজ নামে একটি প্রতিষ্ঠান আমদানিকৃত পণ্যচালানের বিষয়ে গোপন সংবাদ থাকায় সেটি খালাসে আপত্তি দেয় শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগ। এর ভিত্তিতে পণ্য চালানটির শুল্ক মূল্যায়ন ও খালাস প্রক্রিয়া স্থগিত করা হয়। এনবিআরের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাও (সিআইসি) একই পণ্য চালান খালাসে আপত্তি দেয়। কিন্তু আমদানি চালানটির কায়িক পরীক্ষা করার জন্য গোয়েন্দা বিভাগ অনুরোধ জানিয়ে চিঠি পাঠালেও রহস্যজনক কারণে দীর্ঘদিনেও তা হয়নি। এর মধ্যেই গোয়েন্দা বিভাগ জানতে পারে, ওই পণ্য চালানটি খালাস হয়ে গেছে। এরপরই অনুসন্ধান করতে গিয়ে দেখা যায়, ডিএএম মুহিবুল ইসলাম নামে চট্টগ্রাম হাউজের অবসরপ্রাপ্ত এক কর্মকর্তার ইউজার আইডি ব্যবহার করে আমদানিকারক জারার এন্টারপ্রাইজের লক হওয়া বিন অবমুক্ত করে পণ্য মূল্যায়ন ও খালাস করে তা ফের লক করে দেওয়া হয়েছে। একজন কর্মকর্তা অবসরে যাওয়ার পর যথারীতি তার আইডিও বন্ধ হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু এক্ষেত্রে তা হয়নি। এরপর ব্যাপক অনুসন্ধানে নামার পর কেঁচো খুঁড়তে অজগর বেরিয়ে আসে। তদন্তে বেরিয়ে আসে, ওই কর্মকর্তার আইডি একবার নয়, ১১৬ বার ব্যবহার হয়েছে। প্রতিবার একটি করে চালান মূল্যায়ন হয়ে খালাস হয়ে থাকলে, অবৈধ পন্থায় বেরিয়ে গেছে ১১৬টি চালান। একইভাবে জালিয়াতির মাধ্যমে ফজলুল হক নামে আরেক কর্মকর্তার আইডি ব্যবহার হয়েছে প্রায় ৩ হাজার ৭শ’ বার!

এনবিআরের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইত্তেফাককে বলেন, মূলত মিথ্যা ঘোষণায় আমদানি করা পণ্য চালান খালাস করার জন্যই এটি ঘটেছে বলে মনে করছি। কারণ স্বাভাবিক মূল্য ঘোষণায় আনা পণ্য খালাসের জন্য এই জালিয়াতির প্রয়োজন নেই। একই ধরনের জালিয়াতি মংলা, বেনাপোলসহ অন্যান্য কাস্টম হাউজগুলোতে হয়ে থাকলে তা রীতিমত ভয়াবহ রাজস্ব ক্ষতির ইঙ্গিত করে। তবে তিনি বলেন, একক ব্যক্তির মাধ্যমে এ ধররের জালিয়াতি সম্ভব নয়।

প্রায় তিন বছর আগে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজের দুর্নীতি ও অনিয়মের উপর একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। ওই প্রতিবেদনে অনিয়মের বিস্তারিত তুলে ধরে এ ধরনের অনিয়ম প্রতিরোধের লক্ষ্যে কিছু সুপারিশও করেছিল সংস্থাটি। গতকাল টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান ইত্তেফাককে বলেন, আমদানিকারকের সঙ্গে সিএন্ডএফ এজেন্ট ও শুল্ক কর্মকর্তাদের যোগসাজশ ছাড়া এ ধরনের অনিয়ম সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায় রয়েছে।

স্বয়ংক্রিয় শুল্কায়ন পদ্ধতি নিরীক্ষা হয়নি তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে

বর্তমানে বাংলাদেশ শুল্কায়ন কার্যক্রম সহজীকরণ করতে অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড পদ্ধতি ব্যবহার হচ্ছে। এটি স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা। স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার জন্য নিয়মিত বিরতিতে তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে এই ব্যবস্থাটি নিরীক্ষা করা দরকার। অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড পদ্ধতির সঙ্গে সম্পৃক্ত এনবিআরের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ইত্তেফাককে বলেন, ২০১৫ সালে এ প্রক্রিয়াটি চালুর পর থেকে এখন পর্যন্ত এ ধরনের নিরীক্ষা হয়নি। সরকারের হিসাব মহা নিয়ন্ত্রকের (সিজিএ) অফিস থেকে কয়েক বছর আগে একটি উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা আর এগোয়নি।

আরও পড়ুন: বিশ্বের শীর্ষ চিন্তাবিদদের তালিকায় শেখ হাসিনা

আলোচ্য ঘটনায় ঢাকার রমনা মডেল থানায় একটি মামলা দায়ের করেছে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্তর অধিদপ্তর। মামলাটি (গতকাল বুধবার) সিআইডিতে হস্তান্তর করা হয়েছে। এতে অর্থপাচারের অভিযোগও রয়েছে।

রাজস্বে কমতি : বদলি হলেন চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজের কমিশনার

অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল রাজস্ব আদায় কমে যাওয়ার কারণ জানতে চেয়েছেন এনবিআর চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়ার কাছে। সম্প্রতি চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজের বেশকিছু জালিয়াতি ও অনিয়মের খরবও গণমাধ্যমে এসেছে। এমন আলোচনার মধ্যেই গত সোমবার চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজের কমিশনার ড. এ কে এম নুরুজ্জামানকে বদলি করা হয়েছে। সেখানে নতুন করে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে কাজী মোস্তাফিজুর রহমানকে।

Share Button