করোনা সবকিছু বদলে দিয়েছে। আপনি ব্যবসা করেন তো আপনার মনে এখন বড় প্রশ্ন হলো, করোনা পরিস্থিতি আর কত দিন চলবে? ব্যবসা-বাণিজ্য আবার কবে স্বাভাবিক হবে? এ মুহূর্তে বিশ্বজুড়েই সব ব্যবসায় সবচেয়ে বড় চিন্তার বিষয় এটি। প্রলম্বিত মন্দাভাব এখন ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনীতির বড় ঝুঁকি। সবাই চান, ব্যবসা-বাণিজ্য আবার স্বাভাবিক হোক, অর্থনীতি চাঙা হোক। আপনার মনের এ কথাটিই যেন বলেছে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম (ডব্লিউইএফ)।

ডব্লিউইএফ সম্প্রতি এক সমীক্ষায় বলেছে, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের জন্য আগামী দেড় বছরে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো বিশ্ব অর্থনীতির দীর্ঘ মন্দাবস্থা। এখন কোম্পানি দেউলিয়া হওয়ার পাশাপাশি পণ্যের সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার মতো বড় ঝুঁকিও আছে।
অর্থনীতি ও ব্যবসায় খাতে ৩৫০ জন ঝুঁকি বিশ্লেষকের মতামত নিয়ে ডব্লিউইএফ সমীক্ষাটি করেছে। এতে দুই-তৃতীয়াংশ বিশ্লেষক জানান, অর্থনৈতিক মন্দাবস্থাই হবে আগামী দেড় বছরের জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি।

অথচ করোনার আগে ডব্লিউইএফের এ–সংক্রান্ত আরেকটি জরিপে বলা হয়েছিল, বিভিন্ন দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক সংঘাতই ২০২০ সালের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি। তাতে মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের বাণিজ্যযুদ্ধকেই ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক মেরুকরণ ও জলবায়ুর চ্যালেঞ্জ শীর্ষ ঝুঁকির তালিকায় ছিল। কিন্তু করোনা সব পাল্টে দিয়েছে।

ডব্লিউইএফের সমীক্ষায় কোভিড-১৯ পৃথিবীর জন্য কী ধরনের ঝুঁকি সৃষ্টি করছে, সেই বিবেচনায় তিনটি খাতকে বেছে নেওয়া হয়েছে। এগুলো হলো বিশ্বের সম্ভাব্য পরিণতি, সবচেয়ে বড় উদ্বেগ ও কোম্পানির জন্য বড় চিন্তা। এ তিনটি খাতেই মন্দা দীর্ঘায়িত হওয়াকেই বড় ঝুঁকি বলা হয়েছে।

অবশ্য করোনাভাইরাসের কারণে ইতিমধ্যে দেশে দেশে অর্থনৈতিক মন্দার পদধ্বনি পাওয়া যাচ্ছে। করোনার উৎপত্তিস্থল চীনের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি বেশ কমেছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে বড় অর্থনীতির দেশ ভারতের জিডিপি প্রায় ২৫ শতাংশ সংকুচিত হয়েছে। ইউরোপ-আমেরিকার বড় দেশগুলোতে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছে বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলসহ (আইএমএফ) বিভিন্ন সংস্থা। ভোগ চাহিদা কমে যাওয়ায় বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের উৎপাদন কমেছে।

ডব্লিউইএফের সমীক্ষায় কোভিড-১৯ পৃথিবীর জন্য কী ধরনের ঝুঁকি সৃষ্টি করছে, সেই বিবেচনায় তিনটি খাতকে বেছে নেওয়া হয়েছে। এগুলো হলো বিশ্বের সম্ভাব্য পরিণতি, সবচেয়ে বড় উদ্বেগ ও কোম্পানির জন্য বড় চিন্তা। এ তিনটি খাতেই মন্দা দীর্ঘায়িত হওয়াকেই বড় ঝুঁকি বলা হয়েছে।

সংস্থাটি বলছে, করোনা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড কমিয়ে দিয়েছে। ট্রিলিয়ন ডলার প্রণোদনার প্রয়োজন হচ্ছে। বিশ্ব অর্থনীতি নতুন একধরনের কাঠামোর মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন দেশের মধ্যে পারস্পরিক অর্থনৈতিক সম্পর্কগুলো বদলে যাচ্ছে।

বিজ্ঞাপন
দীর্ঘ মন্দাবস্থাই এখন সবচেয়ে বড় ঝুঁকি

ভোগের ধরন পাল্টে যাওয়া এবং উৎপাদন কমার কারণে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো ভুগছে।
বিশ্ব মন্দা দীর্ঘায়িত হলে তা বাংলাদেশের অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যে কতটা ঝুঁকি তৈরি করবে—এমন প্রশ্নের জবাবে ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি ও খ্যাতনামা এ কে খান গ্রুপের পরিচালক আবুল কাসেম খান প্রথম আলোকে বলেন, দেশের অর্থনীতি এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। ইউরোপ-আমেরিকার বড় চেইন শপগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। ফলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের চাহিদাও কমতে পারে, যা অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকা শক্তি রপ্তানিতে প্রভাব ফেলবে। এ ছাড়া সব দেশেই মন্দার সময়ে সবাই খরচ কম করে সঞ্চয়ী হবে। এতে চাহিদা কমবে। এ ছাড়া অর্থনৈতিক মন্দা দীর্ঘায়িত হলে কিছু অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। যেমন, বাংলাদেশের প্রবাসী শ্রমিকেরা আবারও বিদেশে ফিরে যেতে পারবে কি না, তা নিয়ে শঙ্কা আছে। তাঁর মতে, কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি চাঙা রাখা এখন জরুরি।

কোম্পানির চিন্তা

ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনাকারী কোম্পানিগুলোর জন্য সবচেয়ে বড় চিন্তার বিষয় হলো মন্দা দীর্ঘায়িত হওয়া। এটাকেই আগামী ১৮ মাসের জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হিসেবে দেখছেন জরিপে অংশ নেওয়া ৬৬ শতাংশ ঝুঁকি বিশ্লেষক। তাঁদের মধ্যে অর্ধেকের বেশিই মনে করেন, দেউলিয়া বা সর্বস্বান্ত হওয়ার প্রবণতা বৃদ্ধির ঝুঁকিও আছে। করোনার কারণে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে নতুন আরেক ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। ৫০ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন, করোনায় কাজের ধরন পাল্টে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম প্রাধান্য পাচ্ছে। এতে সাইবার আক্রমণের ঝুঁকিও বাড়ছে।

বিজ্ঞাপন
দীর্ঘ মন্দাবস্থাই এখন সবচেয়ে বড় ঝুঁকি
ছবি: রয়টার্স

বিশ্বের সম্ভাব্য পরিণতি

বিশ্বের সম্ভাব্য পরিণতি কী? এ ক্ষেত্রে করোনা বিশ্বকে কী ধরনের ঝুঁকিতে ফেলেছে? এসব প্রশ্নের উত্তরে ঝুঁকি বিশ্লেষকদের ৬৮ শতাংশের জবাব হলো, দীর্ঘায়িত মন্দাই বিশ্বের সম্ভাব্য পরিণতি হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে। এটিই এখন সবচেয়ে বড় ঝুঁকি। ৫৬ শতাংশ উত্তরদাতার কাছে বিভিন্ন কোম্পানি দেউলিয়া হয়ে যাওয়াও অন্যতম ঝুঁকি। তৃতীয় বড় ঝুঁকি হলো, কিছু দেশের নির্দিষ্ট কিছু শিল্প খাত সঠিকভাবে পুনরুদ্ধার না হওয়া। ৫৫ শতাংশ এটিকে ঝুঁকি মনে করেন।

উদ্বেগ

এই শ্রেণিতেও দীর্ঘ মন্দাই সবচেয়ে বড় ঝুঁকি। এর মানে, দীর্ঘ মন্দা গভীর উদ্বেগ তৈরি করছে। ৫৮ শতাংশ বিশ্লেষক ডব্লিউইএফের জরিপে এই মত দিয়েছেন। তবে আরেকটি বড় উদ্বেগ হলো—কর্মসংস্থান। বিশেষ করে তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করাও বড় চ্যালেঞ্জ। উচ্চমাত্রায় কাঠামোগত বেকারত্ব তৈরি হচ্ছে বলে মনে করেন ৪৪ শতাংশ ঝুঁকি বিশ্লেষক। আবার করোনার দ্বিতীয় ঢেউ নতুন করে চিন্তায় ফেলছে। এটি এখন বিশ্বের জন্য তৃতীয় চিন্তার বিষয়। ৪০ শতাংশ বিশ্লেষক এই মত দিয়েছেন।

Share Button