এনবিআর

করোনার ধাক্কা সামলে গতি পাচ্ছে অর্থনীতি। গত কয়েক মাস ধরে রপ্তানি বাড়ছে, বাড়ছে আমদানিও। স্থানীয় উত্পাদন ও সরবরাহেও গতি আসছে। ফলে রাজস্ব আদায়ও আগের চেহারায় ফিরছে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) হিসাব অনুযায়ী, গত কয়েক মাসের খরা কাটিয়ে সর্বশেষ সেপ্টেম্বরে রাজস্ব আদায় বেড়েছে পূর্বের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ১০ দশমিক ৭৬ শতাংশ। সেপ্টেম্বরে আয়কর, মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) ও আমদানি শুল্ক মিলিয়ে এনবিআর আদায় করেছে ১৯ হাজার ৮৩০ কোটি টাকা। গত বছরের সেপ্টেম্বরে আদায় হয়েছিল ১৭ হাজার ৯০৪ কোটি টাকা। অবশ্য সেপ্টেম্বরে আদায় বাড়লেও চলতি অর্থবছরে প্রথম তিন মাসে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) সার্বিকভাবে রাজস্ব আদায়ে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় বেশ পিছিয়ে রয়েছে এনবিআর।

গত তিন মাসে ৬৩ হাজার ৭১৪ কোটি টাকা লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে রাজস্ব আদায় হয়েছে ৪৯ হাজার ৯৯০ কোটি টাকা। অর্থাত্ আলোচ্য সময়ে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ঘাটতি ১৩ হাজার ৭২৪ কোটি টাকা। পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা গেছে, চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রথম তিন মাস জুলাই থেকে আগস্ট পর্যন্ত রাজস্ব বেড়েছে ৪ দশমিক ১১ শতাংশ।

সার্বিকভাবে রাজস্ব আদায়ে গতি ফিরতে শুরু করায় স্বস্তি এসেছে রাজস্ব প্রশাসনেও। গত ২১ অক্টোবর বুধবার এনবিআরের রাজস্ব বিষয়ক এক সভায় এ নিয়ে সন্তোষ জানিয়েছেন এনবিআর চেয়ারম্যান আবু হেনা মো. রহমাতুল মুনিম। মাঠ পর্যায়ের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত ঐ সভায় রাজস্ব আদায়ের বর্তমান গতি ধরে রাখার পাশাপাশি আগামী মাসগুলোতে আদায় আরো বাড়ানোর উপায় খুঁজতে কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দিয়েছেন। এছাড়া আলাদা সভায় ফাঁকি রোধে আইনি কার্যক্রম জোরদারেরও নির্দেশনা দিয়েছেন বলে সূত্র জানিয়েছে।

চীনে করোনার প্রকোপ শুরু হওয়ার পর গত ফেব্রুয়ারি থেকেই আমদানিতে ছেদ পড়ে, যার নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা যায় রাজস্বে। মার্চে দেশে করোনার প্রকোপ শুরু হওয়ার পর থেকে আমদানি রপ্তানি ও স্থানীয় উত্পাদন এবং সরবরাহ মুখ থুবড়ে পড়ে। ফলে গত ২০১৯-২০ অর্থবছরে রাজস্বে ঘাটতি রেকর্ড সৃষ্টি করে।

জুন শেষে দেখা গেল, গত অর্থবছরে মূল লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে রাজস্ব আদায় কম হয়েছে ১ লাখ ৭ হাজার ৯৪ কোটি টাকা। আর সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ঘাটতি ৮২ হাজার ৯২ কোটি টাকা। শুধু তাই নয়, আগের অর্থবছরের চেয়ে রাজস্ব আদায় না বেড়ে উলটো কমে গিয়েছিল ২ দশমিক ২৬ শতাংশ। স্বাধীনতার পর এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়নি।

নতুন অর্থবছরে এসে গত জুলাইয়েও রাজস্ব আদায় কমেছিল প্রায় পৌনে ৭ শতাংশ। আগস্টে এসে কিছু বেড়ে দুই মাসে প্রবৃদ্ধি নেতিবাচক ধারা থেকে বেরিয়ে আসে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে আয়কর আদায় বেড়েছে ১৩ দশমিক ৬৩ শতাংশ, ভ্যাট ৭ দশমিক ৮৮ শতাংশ এবং শুল্ক ১০ দশমিক ৭৬ শতাংশ বেড়েছে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, করোনা পরিস্থিতির উন্নতি হতে থাকলে আগামী মাসগুলোতে অর্থনৈতিক কার্যক্রমে ভালো গতি আসবে। সে ক্ষেত্রে রাজস্ব আদায়ের এই ধারা অব্যাহত রাখা সম্ভব হবে। তবে আশঙ্কা হলো করোনার দ্বিতীয় ঢেউ নিয়ে। ইতিমধ্যে ইউরোপ ও আমেরিকার কোনো কোনো দেশে দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হওয়ায় ফের আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার বাড়ছে। বাংলাদেশেও এমন আশঙ্কা রয়েছে। সে ক্ষেত্রে আদায় ব্যাহত হতে পারে।

অন্যদিকে গত বছরের আদায়ের ব্যাপক ঘাটতি সত্ত্বেও চলতি অর্থবছর ফের বিশাল রাজস্বের লক্ষ্যামাত্রা নেওয়া হয়েছে। চলতি বছর প্রায় ৪৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নিয়ে এনবিআরকে আদায় করতে হবে ৩ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব। অথচ বিগত পাঁচ বছরে গড়ে রাজস্ব আদায় হয়েছে ১০ দশমিক ২০ শতাংশ।

এত বিশাল রাজস্ব আদায় করা বাস্তবে সম্ভব নয় বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। সেক্ষেত্রে চলতি বছরও লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অন্তত ৮০ হাজার কোটি টাকা ঘাটতি হতে পারে বলে শঙ্কার কথা জানিয়েছেন অর্থনীতিবিদ ও পলিসি রিসার্স ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর।

Share Button