ইত্যাদির একটি দৃশ্য।

ইত্যাদির রিভিউ বা একজন দর্শক চোখের মুগ্ধতার বয়ানে হয়ত বারবার একই প্রশ্ন জাগায় আমাদের অন্যান্য অনুষ্ঠানের দায়বোধ নিয়ে। আমি যখন এই লেখাটি লিখছি, ততক্ষণে লক্ষকোটি দর্শক দেশে বিদেশে থেকে ইত্যাদির অনুষ্ঠানটি দেখে ফেলেছেন। এইসময় দর্শকদের চোখ সবচেয়ে অস্থির। ফেসবুক ওয়াচ, ইউটিউবের অগনিত কন্টেন্ট আর ওটিটি প্লাটফর্ম তো রয়েছেই। তবু ইত্যাদি ঠাঁয় দাঁড়িয়ে তার সঠিক অবস্থানে। না; আমি অনুষ্ঠানের ভিউ গুনে কোনো আত্মতুষ্টি গুনবোনা। সেদিক দিয়ে ‘ইত্যাদি’র প্রতিটি পর্ব বরাবরই ইউটিউব ট্রেন্ডিং (যে অনুষ্ঠানটি ইউটিউবে সর্বাধিক আগ্রহের তালিকায় থাকে) এ শীর্ষে থাকে।

 আমার প্রশ্ন এদেশে সবচেয়ে কমসময়ে ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানো মানুষটির নাম হানিফ সংকেত। অথচ সবচেয়ে বেশি দৃষ্টান্ত দেখানো মানুষ তিনি! এক এক করে অনেক উদাহরণ দেয়া যাবে। শুধু দু-একটি কথা খরচ করেই বলি, আমাদের দেশে ‘আলোকিত মানুষ’ বলে যে বিষয়টি রয়েছে। তা পরবর্তীতে একটি গণমাধ্যম তাদের বিশাল ব্র্যান্ডিং করে প্রচারণার মাধ্যমে নিজেদের বিজ্ঞাপিত করেছেন। অথচ সেই ‘আলোকিত মানুষ’ ভাবনার প্রথম উপস্থাপন করেছিলেন হানিফ সংকেত। এমন গল্প অগনিত। এবারের পর্বে যেমন এনেছেন জাহিদুল নামের এক ব্যক্তিকে। যিনি কাঠবাঁশের সেতু নির্মাণ করা এক নির্মোহ ব্যক্তি। ত্যাগী মানুষের সংখ্যা সব সমাজেই কম থাকে। কিন্তু তাদেরকেই প্রচারে আনা জরুরী একজন অনুষ্ঠান নির্মাতার পক্ষ থেকে। যাতে অন্যরাও অনুপ্রাণিত হতে পারে। দেখে দেখে হলেও ত্যাগের স্বভাব গড়ে তুলতে পারে। আফসোস! গণমাধ্যমে আজ ‘ত্যাগী’ নয় ‘ভোগী’ মানুষের প্রচারের জঞ্জাল। ফলে ভুল গণিতে অনুপ্রাণিত হয়ে সেই একই ধারায় সকলেই ভোগীদের পেছনেই ক্যামেরা ছুটছে। তাদেরকেই করছে কর্পোরেট ব্র্যান্ডিং। স্বাভাবিক ভাবেই সমাকালীন বেড়ে ওঠা কোনো তরুন তাই সেটাকেই জীবনের আদর্শগত পথ হিসেবে ভাবছে। এইসব ভ্রান্তধারণা থেকে উত্তরণের পথ বাতলে দেয় একেকটি ইত্যাদি। তাই ইত্যাদির প্রতিটি তথ্যচিত্র বা পর্বেও এক একটি দর্শণ তৈরি হয়। যা শুধু ভাবায় না। বরং অন্যের বানিজ্যিক বোধকে লজ্জা দেয়। সে কারণেই ধানমন্ডি লেকের আশেপাশে গণমাধ্যমের এত বড় মানুষদের বসবাস হলেও কাজের কাজটি ইত্যাদিই করলেন। উদ্যোগী হয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে দিয়ে লেকের পরিচ্ছন্নতার কাজটি করলেন। প্রশ্ন থাকে এই প্রতিবেদনে প্রায় কয়েক ডজন চ্যানেলের কর্তাদের কী লজ্জাবোধ তৈরি হলো? তাদের কী জেদ চাপলো? যে- ইত্যাদি একটা লেকের উদ্যোগ নিয়েছে ত্রৈমাসিক অনুষ্ঠানে। আমরা তো প্রতিদিন প্রতিঘন্টায় কতরকম অনুষ্ঠান বানায়। আমরা দেখিয়ে দেব! সব লেক পরিষ্কার করবো। এই লড়াইটা কি জাগলো তাদের মনে? প্রত্যাশা তাই- সেই জেদটা অন্তত তৈরি হোক। না হানিফ সংকেত এখানে কোনো ব্র্র্যান্ডিং যুক্ত করেননি পরিষ্কার অভিযানে। দেখা যায়নি সেই ব্র্যান্ডের লোগোসমেত গেঞ্জি পরে ঝাড়ুদারীর নাটক! তিনি শুধু কাজের কাজটি করেছেন।

চরখিদিরপুরের নদীভাঙনে বাস্তুহারা মানুষের গল্প, তাদের অন্কারের গল্পে মন খারাপ হয়। শহুরে আলোর ছটায় থেকে আমরা প্রত্যেকে এক চিমটি করে আশার আলো এসব খিদিরপুরে নিয়ে গেলেও সমাজ বদলানো সম্ভব। নিশ্চয়ই ইত্যাদির এই প্রচারণার পর সেখানে তরুণরা উদ্যোগী হবেন। কারণ বর্তমানে এমন অনেক সামাজিক সংগঠন তৈরি হয়েছে দেশে। আশায় বুক বাঁধতেই পারি।

বাজার কমিটির প্রতিবেদন সমসাময়িক কিছু কিছু শহুরে সংগঠনের সভাপতি হবার অসুস্থ লড়াইকে মনে করিয়ে দিলো। যারা শুধু পদবীর লোভেই সামাজিক কাজে আসেন। কেউ সারিবাধা লাইনের পেছনে দাঁড়াতে চান না। ‘ওয়েব সিরিজ’ নিয়ে নানান আপত্তি-বিপত্তি ও পক্ষ-বিপক্ষের বাহাসের ভেতরে ইত্যাদির এই দৃঢ় অবস্থান অবশ্যই প্রশংসনীয়। কারণ এই ফেসবুক জমানায় আমরা যে কোনো খারাপ কিছুকেও দুই পক্ষের টানাটানিতে নিয়ে যাই।

শকুন নিয়ে দারুণ তথ্যচিত্র, করোনা নিয়ে টকশোর অতিথিদের নিয়ে স্যাটায়ার, মামা ভাগ্নে পর্ব সত্যিই অসাধারণ। অনুষ্ঠানের শেষভাবে সমেজ ডাক্তারের এতিমখানা ও বৃদ্ধাশ্রমের গল্প প্রমান করে অসহায়কে আশ্রয় দেবার নির্মোহ আনন্দের নামই জীবনের সাফল্য।

তাই প্রয়োজন শুধু বোধের জাগরণ। রাজশাহীতে ধারণকৃত এবারের ইত্যাদির শুরু থেকেই অপেক্ষায় ছিলাম এন্ড্রু কিশোরকে নিয়ে কখন বলবেন উপস্থাপক। অবশেষে শেষ করলেন হানিফ সংকেত তার বন্ধু দেশবরেণ্য এই গায়েনের সমাধিতে ফুল দিয়ে ছোট্ট কথামালায়। চোখ ভারী হয়ে এলো তাই! কারণ আমরাই খবর প্রকাশ করেছিলাম এন্ড্রু কিশোর সুস্থ হয়ে দেশে ফিরলে প্রথম ইত্যাদিতেই গাইবেন। জীবন কী আর প্রত্যাশার গাড়িতে চলে? কিন্তু আমাদের প্রার্থনা আর প্রত্যাশায় থাকুক ইত্যাদি যেন দেশের সামাজিক বিকাশের বাতিঘর হয়ে আলো ছড়াক প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে। শতায়ু হোন হানিফ সংকেত। রেখে যান নতুন প্রজন্মের মাঝে আপনার ভাবনার বুনিয়াদ। ভালবাসা। শ্রদ্ধা। আমি তাই ইত্যাদিকে আর কোনো অনুষ্ঠান বলি না। বলি সমাজ বিকাশের বাতিঘর।

Share Button