[ফাইল ছবি]

স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতি রোধে দুদকের ২৫ সুপারিশ বাস্তবায়নের তাগিদ হাইকোর্টের

স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতি রোধে দুদকের করা ২৫ সুপারিশ বাস্তবায়নে তাগিদ দেওয়া হয়েছে। উচ্চ আদালত কর্তৃক ঘোষিত এক রায়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে এই তাগাদা দেওয়া হয়। একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় অর্থ যথাযথভাবে ব্যয়ের লক্ষ্যে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিতে দেশের সকল পর্যায়ের সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাসামগ্রী ও যন্ত্রপাতি কেনা ও রক্ষণাবেক্ষণে বেশ কিছু নিয়মনীতি অনুসরণ করতে বলা হয়েছে।

 আদালত বলেছে, সরকারি হাসপাতালে যন্ত্রপাতি ও চিকিৎসাসামগ্রী কেনার ক্ষেত্রে অবাস্তব ও উচ্চমূল্য নির্ধারণ করে প্রাক্কলন তৈরি করা হয়। প্রাক্কলন নির্ধারণে সঠিক ও বাস্তবসম্মত মূল্য নির্ধারণ করতে হবে। এ ধরনের যন্ত্রপাতি ও চিকিৎসাসামগ্রী বা ওষুধ কেনার আগে অবশ্যই বিশেষজ্ঞ কমিটি দ্বারা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের চাহিদা নিরূপণ করতে হবে। বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মোস্তাফিজুর রহমানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ গতকাল মঙ্গলবার এ রায় দেয়।

রায়ে আরো বলা হয়, চাহিদা নিরূপণ করে সরকারি ক্রয় বিধিমালা অনুসরণ করে সর্বোচ্চ মানসম্পন্ন চিকিত্সাসামগ্রী ও যন্ত্রপাতি কিনতে হবে। ঠিকাদারদের কাছ থেকে যন্ত্রপাতি গ্রহণ বা বুঝে নেওয়ার আগে সরবরাহকৃত পণ্যের মান ও গুণাগুণ সম্পর্কে নিশ্চিত করতে হবে।

রায়ে দেশের একমাত্র ক্যানসার রিসার্চ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সার্বিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে হাইকোর্ট বলেছে, এ ধরনের একটি বিশেষায়িত হাসপাতালে চরম অব্যবস্থাপনা, দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের কর্তব্যে অবহেলা শুধু দুঃখজনকই নয়, তা নিন্দনীয় বটে। এই হাসপাতালের ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটের (আইসিইউ) ভেন্টিলেটরসমূহ এক যুগ আগে প্রায় ৬ কোটি টাকা দিয়ে কেনা হলেও হাসপাতালের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের চরম অবহেলা ও দায়িত্বহীনতার কারণে তা স্থাপন করা সম্ভব হয়নি। উচ্চমূল্যের এই ভেন্টিলেটরগুলো সংস্থাপন না হওয়ার কারণে তা ব্যবহারের অনুপোযোগী ও অকেজো হয়ে পড়ে। অবহেলার জন্য ডা. এ এ এম শরিফুল আলম ও ডা. মোল্লা ওবায়দুল্লাহর কাছ থেকে ৫ লাখ টাকা করে ক্ষতিপূরণ আদায় করতে স্বাস্থ্যসচিবকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আদায়কৃত ঐ অর্থ সংশ্লিষ্ট হাসপাতালের উন্নয়ন তহবিলে জমা দিতে বলা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ক্ষতিপূরণ দিতে ব্যর্থ হলে পিডিআর আইনের বিধানমতে ঐ অর্থ আদায় করতে বলা হয়েছে। ডা. মানস কুমার বসুর বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি ৫ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ আদায় করতে বলা হয়েছে। এছাড়া ডা. মোয়াররফ হোসেন ভেন্টিলেটর সচলের অনুরোধ জানিয়ে ন্যাশনাল ইলেকট্রো মেডিক্যাল ইকুইপমেন্ট মেইনটেন্যান্স ওয়ার্কশপ অ্যান্ড ট্রেনিং সেন্টারকে (নিমিউ অ্যান্ড টিসি) দুই দফায় চিঠি দেওয়ার যে দাবি করেছেন, তা সঠিক কি না, তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে হাইকোর্ট। দুই সপ্তাহের মধ্যে তদন্ত করে যদি দাবির পক্ষে সত্যতা প্রমাণিত না হয়, তাহলে তার কাছ থেকে একই পরিমাণ ক্ষতিপূরণের অর্থ আদায় করতে বলেছে হাইকোর্ট।

‘আইসিইউ অন সিকবেড’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত হয়। ঐ প্রতিবেদনে বলা হয়, জাতীয় ক্যানসার রিসার্চ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এক যুগ আগে আটটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন জীবন রক্ষাকারী ভেন্টিলেটর কেনা হলেও তা স্থাপন করেনি। প্রতিটি ভেন্টিলেটরের মূল্য ৭০ লাখ টাকা। তাই গুরুতর অসুস্থ রোগীদের আইসিইউ সেবা না দিয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এই প্রতিবেদন আমলে নিয়ে গত ২ জানুয়ারি হাইকোর্ট স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে রুল জারি করে। ঐ রুলের চূড়ান্ত শুনানি নিয়ে হাইকোর্ট বেশ কিছু পর্যবেক্ষণ দিয়ে রায় দেয়।

রায়ে সরকারি হাসপাতালে যন্ত্রপাতি স্থাপনে অবকাঠামো নির্মাণ প্রয়োজন কি না, তা নিরূপণ সাপেক্ষে কিনতে হবে। এসব যন্ত্রপাতি পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণে পর্যাপ্তসংখ্যক উপযুক্ত কর্মকর্তা ও কর্মচারি নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ দিতে হবে। এদের নিয়োগ রাজস্ব খাতে হওয়া উচিত, আউটসোর্সিং নয়। কেননা, আউটসোর্সিং নিয়োগকৃতদের কোনো জবাবদিহি থাকে না। প্রতিটি হাসপাতাল সার্বক্ষণিক তদারকির জন্য উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি করতে হবে। এদের দায়িত্ব হবে যন্ত্রপাতি ও চিকিত্সাসামগ্রীর যথাযথ মান নিরীক্ষা করা। জেলা, উপজেলা ও কেন্দ্রীয় পর্যায়ে কমিটি গঠন করা, যাতে যন্ত্রপাতিগুলো সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে থাকে। এছাড়া কোনো যন্ত্রের আর্থিক ক্ষতি হলে যার কারণে ক্ষতি হবে, তার কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায়ের ব্যবস্থা রাখতে হবে।

দুদকের ২৫ সুপারিশ

স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতির ১১টি উত্স চিহ্নিত করে তা প্রতিরোধে ২৫ দফা সুপারিশ করেছিল দুদক গত বছরের ৩১ জানুয়ারি এসংক্রান্ত প্রতিবেদন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেকের হাতে হস্তান্তর করে সংস্থাটি ঐ প্রতিবেদনে দুর্নীতি রোধে উল্লেখযোগ্য সুপারিশ ছিল :প্রতিটি সরকারি হাসপাতালে জনসাধারণের দৃষ্টিগোচর হয় এমন উম্মুক্ত স্থানে সিটিজেন চার্টার প্রদর্শনের বিধান নিশ্চিত করা। হাসপাতালে কী কী ওষুধ মজুত আছে তা প্রদর্শন করা ওষুধ ও মেডিক্যাল যন্ত্রপাতি কেনাকাটায় দুর্নীতি ও অনিয়ম বন্ধ করার জন্য ক্রয় কমিটিতে সংশ্লিষ্ট বিষয়ের বিশেষজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত করা। জনবল না থাকলে যন্ত্রপাতি ক্রয় না করা। সংঘবদ্ধ দালালচক্র প্রতিরোধে কঠোর নজরদারি ও তদারকির ব্যবস্থা রাখা।

Share Button