রাষ্ট্রায়ত্ত চার ব্যাংক ঋণ অবলোপন করেছে ১৫ হাজার ৫৯৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি সোনালী ব্যাংকের। প্রতিষ্ঠানটি অবলোপন করেছে ৭ হাজার ১৯ কোটি টাকা।

 এরপর জনতা ৩ হাজার ৫৫৩ কোটি, অগ্রণী ৪ হাজার ৪২৪ কোটি এবং রূপালী ব্যাংক ৬০১ কোটি টাকা অবলোপন করে।

যে খেলাপি ঋণ তিন বছরে আদায় করা সম্ভব হয়নি, তা ব্যাংকের মূল হিসাব থেকে বাদ দিয়ে আলাদা খাতায় উল্লেখ করার নামই ঋণ অবলোপন। আগে এটা পাঁচ বছর ছিল। এখন তা তিন বছর করা হয়েছে।

অবশ্যই এর আগে শতভাগ প্রভিশন সংরক্ষণ (নিরাপত্তা সঞ্চিতি) এবং অর্থঋণ আদালতে মামলা করতে হয়।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক এবং বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) সাবেক মহাপরিচালক ড. মইনুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। বরং অবলোপন আরও বাড়বে।

বড় বড় ঋণখেলাপি ও রাঘববোয়ালদের সুবিধা দিতে ইতোমধ্যে ঋণ অবলোপন নীতিমালা শিথিল করা হয়েছে। আগে পাঁচ বছর পর অবলোপন করা যেত। এখন তা তিন বছর করা হয়েছে।

এর মাধ্যমে খেলাপি ঋণকে কার্পেটের তলে লুকিয়ে রাখা হচ্ছে। ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের আরও ঋণ দেয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সোনালী ব্যাংকের অবলোপন ছিল ৭ হাজার ৪৯ কোটি টাকা।

চলতি বছরের জুন শেষে তা কমেছে মাত্র ৩০ কোটি টাকা, যা মোট অবলোপনের শূন্য দশমিক ৪৩ শতাংশ। একই সময়ে রূপালী ব্যাংকের অবলোপন ছিল ৬০৩ কোটি টাকা।

ছয় মাসে ব্যাংকটি কমিয়েছে মাত্র ২ কোটি টাকা, যা মোট অবলোপনের শূন্য দশমিক ৩৩ শতাংশ। তবে এ সময়ে ঋণ অবলোপন কমানোর দিক থেকে সুবিধাজনক অবস্থানে আছে রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ও অগ্রণী ব্যাংক। ২০১৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত জনতা ব্যাংকের অবলোপন ছিল ৫ হাজার ৬ কোটি টাকা।

চলতি বছরের জুন শেষে তা থেকে ব্যাংকটি কমিয়েছে ১ হাজার ৪৫৩ কোটি টাকা, যা মোট অবলোপনের ২৯ দশমিক ০৩ শতাংশ। একই সময়ে অগ্রণী ব্যাংকের অবলোপন ছিল ৫ হাজার ৫১০ কোটি টাকা।

ছয় মাসে ব্যাংকটি কমিয়েছে ১ হাজার ৮৬ কোটি টাকা, যা মোট অবলোপনের ১৯ দশমিক ৭১ শতাংশ।

জানতে চাইলে অগ্রণী ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) আবদুস সালাম মোল্যা যুগান্তরকে বলেন, ঋণ অবলোপনের টাকা আদায়ে অগ্রণী ব্যাংক অনেক সোচ্চার ছিল। এখনও বিভিন্ন তৎপরতা অব্যাহত রেখেছে। আশা করি, বাকি টাকা আদায়েও সফল হব।

সূত্র জানায়, সাড়ে ১৫ হাজার কোটি টাকা অবলোপনের মধ্যে প্রায় অর্ধেকই সোনালী ব্যাংকের। এর মধ্যে বেসরকারি শীর্ষ ২০ প্রতিষ্ঠানেই রয়েছে ২ হাজার ৫৭৮ কোটি, যা মোট অবলোপনের এক-তৃতীয়াংশের বেশি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খেলাপি ঋণের বোঝা কমাতে অনেকে অবলোপনের পথে হাঁটছেন। কিন্তু এটাই সমাধান নয়, উল্টো দীর্ঘমেয়াদে সমস্যায় আরও জর্জিত হয়ে উঠবে ব্যাংকিং খাত।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, অবলোপন আসল সমাধান নয়। এর মাধ্যমে প্রকৃত খেলাপি ঋণ ঢেকে রাখা হয়।

কিন্তু তা আদায়ে খুব বেশি তৎপরতা দেখা যায় না। অবলোপন নীতিমালা শিথিল করাও ঠিক হয়নি। এখন এ টাকা আদায়ে আরও কড়াকড়ি আরোপ করতে হবে।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সোনালী ব্যাংকের বেসরকারি শীর্ষ ২০ প্রতিষ্ঠান থেকে আদায় হয়েছে মাত্র ৭ কোটি ২৯ লাখ টাকা, যা নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার ২ দশমিক ৮৩ শতাংশ।

২০২০ সালে এই ২০ প্রতিষ্ঠান থেকে আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ২৫৭ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। কিন্তু ১৭টি প্রতিষ্ঠান এক টাকাও পরিশোধ করেনি। এর মধ্যে হলমার্কের বিপুল অঙ্কের টাকাও রয়েছে।

তথ্যে আরও দেখা যায়, সোনালী ব্যাংকের বেসরকারি খাতের অবলোপনকৃত ঋণের তালিকায় সবার উপরে রয়েছে মেসার্স ম্যাক্স স্পিনিং মিলস লিমিটেড। সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির ৫২৫ কোটি ৬০ লাখ টাকা ঋণ অবলোপন করা হয়েছে হোটেল শেরাটন কর্পোরেট শাখায়।

২০২০ সালে অবলোপনকৃত মোট ঋণের ১০ শতাংশ আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও এখন পর্যন্ত কোনো টাকা পরিশোধ করেনি প্রতিষ্ঠানটি। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে মেসার্স আনোয়ারা স্পিনিং মিলস লিমিটেড। শেরাটন কর্পোরেট শাখার এই গ্রাহক প্রতিষ্ঠানের অবলোপনের পরিমাণ ৪৭৪ কোটি ৩৬ লাখ টাকা।

চলতি বছরের ৯ মাসে এ প্রতিষ্ঠানটি থেকে ৪৭ কোটি ৪৩ লাখ টাকা আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু আদায় হয়নি এক টাকাও। এরপরে রয়েছে হোটেল শেরাটন শাখার গ্রাহক মেসার্স ওয়ালমার্ট ফ্যাশন লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটির অবলোপনকৃত ঋণের পরিমাণ ১৭০ কোটি ৫ লাখ টাকা।

এই প্রতিষ্ঠান থেকেও কোনো টাকা আদায় করা সম্ভব হয়নি। চতুর্থ স্থানে রয়েছে নারায়ণগঞ্জ কর্পোরেট শাখার মেসার্স নিউ রাখী টেক্সটাইল মিলস লিমিটেড। এখন পর্যন্ত ১২৩ কোটি ৫ লাখ টাকার ঋণ অবলোপন করা হয়েছে প্রতিষ্ঠানটির। কিন্তু আলোচ্য সময়ে আদায় হয়নি এক টাকাও।

মেসার্স জাসমির ভেজিটেবল অয়েল লিমিটেডের অবলোপনকৃত ঋণের পরিমাণ ১০৫ কোটি ৫৫ লাখ টাকা। প্রতিষ্ঠানটি চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ কর্পোরেট শাখার গ্রাহক। চলতি বছর ১০ কোটি ৫৫ লাখ টাকা আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও সমাপ্ত নয় মাসে কোনো টাকা আদায় করা সম্ভব হয়নি।

এছাড়া এই তালিকায় আরও রয়েছে ঢাকার রমনা কর্পোরেট শাখার গ্রাহক মেসার্স ফেয়ার এক্সপো, যশোর কর্পোরেট শাখার গ্রাহক মেসার্স আলফা টোব্যাকো, ঢাকার স্থানীয় কার্যালয়ের গ্রাহক মেসার্স ওয়ান স্পিনিং মিলস লিমিটেড, বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ কর্পোরেট শাখার গ্রাহক মেসার্স ইম্পেরিয়াল ডাইয়িং অ্যান্ড হোশিয়ারি লিমিটেড, ফরিদপুর শাখার মেসার্স রোকেয়া টেক্সটাইল মিলস লিমিটেড, নারায়ণগঞ্জ কর্পোরেট শাখার মেসার্স সাহিল ফ্যাশন লিমিটেড, আগ্রাবাদ কর্পোরেট শাখার মেসার্স ইমাম ট্রেডার্স, ঢাকার স্থানীয় কার্যালয়ের মেসার্স রিভারসাইড লেদার অ্যান্ড ফুটওয়্যার লিমিটেড, রমনা কর্পোরেট শাখার মেসার্স সুমি’স সোয়েটার লিমিটেড, নারায়ণগঞ্জ কর্পোরেট শাখার মেসার্স ইউনিটি নিটওয়্যার, চট্টগ্রামের লালদীঘি কর্পোরেট শাখার মেসার্স সিদ্দিক ট্রেডার্স, নারায়ণগঞ্জ কর্পোরেট শাখার মেসার্স কেপিএফ টেক্সটাইল, মেসার্স মুন নিটওয়্যার, মেসার্স সাহিল নিটওয়্যার লিমিটেড এবং ঢাকার স্থানীয় কার্যালয়ের মেসার্স এ আর খান সাইজিং অ্যান্ড ফেব্রিকস।

Share Button