খেলাপি ও নন-পারফরমিং ঋণ আদায়ে গঠন হচ্ছে শতভাগ রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ‘অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি’। এ কোম্পানি নিজস্ব ক্ষমতাবলে খেলাপি প্রতিষ্ঠানের সম্পত্তি লিজ গ্রহণ ও বিক্রি করে অর্থ আদায় করবে। পাশাপাশি খেলাপির রুগ্ন ব্যবসা দক্ষভাবে পরিচালনার জন্য ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব নেবে। প্রয়োজনে অর্থ আদায়ের জন্য দখলে নিতে পারবে ঋণের বিপরীতে দেয়া জামানতের সম্পত্তি।

এছাড়া ক্রয় করা ঋণের গুণগত মান বিবেচনায় নিয়ে তা পুরোপুরি বা আংশিক শেয়ারে রূপান্তরের ক্ষমতা থাকবে এ কোম্পানির। এসব বিধান রেখে উল্লিখিত কোম্পানি গঠনের লক্ষ্যে ‘বাংলাদেশ অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট আইন-২০২০’-এর খসড়া প্রণয়ন করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। খসড়া চূড়ান্ত করতে মত চাওয়া হয়েছে স্টেকহোল্ডারদের (অংশীজন) কাছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে পাওয়া গেছে এসব তথ্য।

এর আগে ২০১৬ সালে সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত খেলাপি ঋণ আদায়ে ‘ডেট রিকভারি এজেন্ট কোম্পানি’ গঠনের লক্ষ্যে আইনের খসড়া প্রণয়ন করেন। কিন্তু ভারত ও পাকিস্তানে এজেন্ট থাকার তথ্য তুলে ধরে কোম্পানি গঠনের বদলে সুনির্দিষ্ট নীতিমালার আওতায় ঋণ আদায়ে এজেন্ট নিয়োগের পক্ষে মত দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। পাশাপাশি একই বিষয়ে উল্টো মত দিয়েছিল রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো। ফলে উদ্যোগটি আলোর মুখ দেখেনি।

অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি প্রসঙ্গে চলতি বছরের বাজেট ঘোষণার আগে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেছেন, এ ধরনের কোম্পানি হলে স্বাভাবিকভাবেই অনেক খেলাপি ঋণ আদায় করা যাবে। যেগুলো স্বাভাবিকভাবে আদায় করা কঠিন হবে, সেগুলো আদায়ে এ ম্যানেজমেন্ট কোম্পানিকে দায়িত্ব দেয়া হবে। এ কোম্পানি শক্তি খাটিয়ে নয়, নিয়ম-কানুনের মধ্যে থেকে ঋণ আদায় করবে। এটি বেসরকারি খাতের প্রতিষ্ঠানও হতে পারে। এ ধরনের প্রতিষ্ঠান যুক্তরাষ্ট্রেও রয়েছে।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর ও অর্থনীতিবিদ খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ যুগান্তরকে বলেন, অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানির মাধ্যমে খেলাপি ঋণ আদায় প্রক্রিয়া অনেক দেশেই বিদ্যমান আছে। কিন্তু এটি দেশে গঠন হলে রাষ্ট্রের অর্থ অপচয় হবে। কারণ এই কোম্পানি বিভিন্ন সরকারি ব্যাংকের কাছ থেকে টাকা দিয়ে খেলাপি ঋণ কিনে নেবে। এরপর তারা আদায় করবে। এতে ব্যাংকগুলো মুক্ত হলেও প্রশ্ন হচ্ছে খেলাপি ঋণ আদায়ে যেখানে ব্যাংক ব্যর্থ হচ্ছে, সেখানে এ ধরনের কোম্পানি কিভাবে আদায় করবে। এটি অত্যন্ত খারাপ হবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ভিয়েতনাম, দক্ষিণ কোরিয়া, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, তাইওয়ান এবং ফিলিপাইনে খেলাপি ঋণ আদায়ে অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি গঠন করেছে। এই সাতটি দেশ বড় অঙ্কের শ্রেণিকৃত ঋণ বা খেলাপি ঋণ খুব সফলভাবে নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়েছে। এর মধ্যে ইন্দোনেশিয়ার খেলাপি ঋণের অবস্থা ছিল ভয়াবহ। তখন দেশটির ব্যাংক খাতের মোট বিতরণ করা ঋণের ৫০ শতাংশই ছিল খেলাপি। কিন্তু ২০১৭ সালের শেষ নাগাদ দেশটির খেলাপি ঋণ কমে এসে দাঁড়িয়েছে ৩ শতাংশে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ অস্বাভাবিক বেড়েছে। ঋণ নেয়ার পর ইচ্ছাকৃত অনেকে খেলাপি হচ্ছেন। খেলাপি ঋণ আদায়ে ব্যাংকগুলো খুব বেশি সাফল্য দেখাতে পারছে না। শেষ পর্যন্ত অনেক ঋণ আদায় করতে না পেরে অবলোপন করা হচ্ছে। ফলে আগামীতে খেলাপি ঋণ আদায়ে অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি গঠন হলে ভালো ভূমিকা রাখতে পারবে। দেশে এটি প্রথম প্রতিষ্ঠান হবে। যা শতভাগ রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য মতে, গত জুন পর্যন্ত ব্যাংকিং খাতে খেলাপির পরিমাণ ৯৬ হাজার ১১৬ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণ করা ঋণের ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ।

বাংলাদেশ অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি গঠনের লক্ষ্যে অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রণয়নকৃত খসড়া আইনে বলা হয়, এই কোম্পানি হবে শতভাগ সরকারি বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান। এর অনুমোদিত মূলধন হবে ৫ হাজার কোটি টাকা। প্রতিটি ১০ টাকা মূল্যের ৫০০ কোটি সাধারণ শেয়ারে ভাগ করা হবে। আর পরিশোধিত মূলধনের পরিমাণ হবে ৩ হাজার কোটি টাকা। এ অর্থ সরকার থেকে বরাদ্দ দেয়া হবে। তবে উভয় মূলধনের পরিমাণ সরকার বাড়াতে পারবে।

বাংলাদেশ অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানির চেয়ারম্যান হবেন বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর পদমর্যাদার সাবেক কোনো কর্মকর্তা বা ব্যাংকিং পেশায় ২৫ বছরের অভিজ্ঞ কোনো ব্যক্তি। শর্তসাপেক্ষে সরকার চুক্তিভিত্তিক চেয়ারম্যান হিসেবে নিযুক্ত করবেন। যিনি পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।

এছাড়া এ কোম্পানির পর্ষদ পরিচালকদের মেয়াদ তিন বছর হবে। টানা দুই মেয়াদের বেশি কোনো পরিচালক তার পদে থাকতে পারবেন না। আর কোনো ঋণখেলাপি বা খেলাপি প্রতিষ্ঠানের গ্রাহক অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানির পরিচালক হতে পারবেন না। পাশাপাশি আর্থিক খাতের কোনো সংস্থার আইন অমান্যের দায়ে দণ্ডিত, লাইসেন্স বা নিবন্ধন বাতিল হওয়া প্রতিষ্ঠানের অবসায়িত ব্যক্তি, আদালতের মাধ্যমে সাজাপ্রাপ্ত, অপ্রাপ্তবয়স্ক, আদালত কর্তৃক দেউলিয়া বা অপ্রকৃতিস্থ ঘোষিত কোনো প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি পরিচালক হওয়ার অযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হবেন। আর পরপর তিনটি পর্ষদ সভায় অনুপস্থিত থাকা, যে কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পরিচালক, ব্যাংকিং পেশায় ২৫ বছরের নিচে অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তিরা এখানে পরিচালক হওয়ার যোগ্য হবেন না।

খসড়া আইনে বলা হয়, এ কোম্পানি ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ও নন-পারফর্মিং জামানতী ঋণ, অগ্রিম ঋণ ও ব্যাংকের বিনিয়োগকৃত অর্থ কিনতে ও বেচতে পারবে। পাশাপাশি খেলাপি ঋণ কেনার পর তা সংরক্ষণ, ঋণ আদায়, গ্রহীতাকে পরামর্শ দেয়া ও ব্যবসা পরিচালনায় ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব নিতে পারবে। এছাড়া খেলাপি ও নন-পারফর্মিং ঋণ ক্রয়-বিক্রয়ের লক্ষ্যে ট্রেডিং প্লাটফর্ম গঠন, একটি ঋণ ক্রয়-বিক্রয়ের প্রতিযোগিতামূলক বাজার সৃষ্টি, প্রসার ও উন্নয়ন করার উদ্যোগ নেবে এ কোম্পানি। এছাড়া ঋণখেলাপির সম্পত্তির নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনা করতে পারবে।

খসড়াতে উল্লেখ করা হয়, এ আইনে বাংলাদেশ অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি কোনো ঋণখেলাপির প্রতিষ্ঠান রুগ্ন হলে তা আধুনিকায়ন, বিস্তার ও প্রতিস্থাপনের (বিএমআরই) বিষয়ে পরামর্শ ও ব্যবস্থাপনা গ্রহণ এবং ‘সরকারি রিসিভার’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করার ক্ষমতা রাখবে। আর কোনো ঋণখেলাপির প্রতিষ্ঠান দেউলিয়া হলে তা শনাক্ত ও সমস্যা সমাধানের ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

খসড়াতে আরও উল্লেখ করা হয়, যে কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থার কাছ থেকে এ কোম্পানি সরকারের অনুমোদনক্রমে পুঁজি বা অনুদান সংগ্রহ করতে পারবে। পাশাপাশি দেশের শেয়ারবাজারে বন্ড বা ডিবেঞ্চার ইস্যুর মাধ্যমে তহবিল সংগ্রহ করার বিধান থাকছে। তবে বিদেশি বিনিয়োগকারী বা ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানির ফান্ড সংগ্রহ করলে এ আইনের অধীনে জেনারেল পার্টনার হিসেবে বিবেচিত হবে।

Share Button