বিএনপির ভাইস-চেয়ারম্যান মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ ও শওকত মাহমুদ। ছবি: সংগৃহীত

দলের দুই ভাইস-চেয়ারম্যান মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ ও শওকত মাহমুদকে বিএনপির কারণ দর্শানোর নোটিস বা শোকজ করার ঘটনায় নানামুখী জল্পনা-কল্পনা চলছে খোদ দলটির নেতা-কর্মীদের মধ্যে। এই জল্পনা-কল্পনা বিএনপির পরিধি ছাড়িয়ে দলটির নেতৃত্বাধীন ২০ দল ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শরিক দলগুলোর নেতা-কর্মীদের মাঝেও বিস্তৃত হয়ে পড়েছে। এই দুই নেতার বিরুদ্ধে দলীয় শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ডের অভিযোগ এনে সোমবার এই শোকজ করা হলেও এনিয়ে কয়েক ধরনের কথা শোনা যাচ্ছে।

শোকজের নেপথ্য কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে বিএনপির কেউ কেউ বলছেন, সাংগঠনিক বিষয়ে দলীয় শৃঙ্খলা না মানার কারণে হাফিজ উদ্দিন ও শওকত মাহমুদকে শোকজ করা হয়েছে। বিস্তারিত জানতে চাইলে তারা জানান, বিভিন্ন সময়ে দলের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে দায়িত্ব দেওয়া হলেও সেটা পালনে অপারগতা প্রকাশ করেন হাফিজ উদ্দিন। বিশেষ করে, জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের মনিটরিংয়ের দায়িত্ব দেওয়া হলেও তিনি তা করতে সরাসরি অস্বীকৃতি জানান।

এছাড়া সমপ্রতি একাধিকবার প্রকাশ্যে দলের হাইকমান্ডের বিরুদ্ধে সমালোচনামূলক বক্তব্য দিয়েছেন তিনি। একারণে তাকে শোকজ করা হয়েছে। আর বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের একাংশের সাবেক সভাপতি ও জাতীয় প্রেস ক্লাবের প্রাক্তন সভাপতি শওকত মাহমুদকে শোকজ করা হয়েছে কুমিল্লায় নিজ এলাকায় দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে কাজ করায়।

তবে শোকজের কারণ সম্পর্কে বিএনপির দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে ভিন্ন তথ্য। সূত্রমতে, হেফাজতে ইসলামে মহাসচিব আল্লামা নূর হোসাইন কাসেমীর নামাজে জানাজার পরপরই সোমবার রাজধানীর গুলিস্তান ও পল্টন এলাকায় সরকারের পদত্যাগ দাবিতে পেশাজীবী পরিষদের ব্যানারে হঠাত্ বিক্ষোভ ও অবস্থানের কারণেই এই শোকজ। হঠাত্ এই বিক্ষোভ ও অবস্থানের বিষয়ে আগে থেকে কিছুই জানতো না বিএনপির হাইকমান্ড। এই বিক্ষোভের বিষয়ে নানা মাধ্যমে খোঁজ নিয়ে নেপথ্যের কিছু তথ্য জেনে হাইকমান্ড ক্ষুব্ধ হন।

এই তথ্যের সত্যতা মেলে শোকজ নোটিশে স্বাক্ষর করা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর বক্তব্যেও। রিজভী গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, দলের নাম ব্যবহার করে নেতা-কর্মীদের বিভ্রান্ত করে সংগঠনের শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে কেন তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে না- সে বিষয়ে শওকত মাহমুদকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে এবং হাফিজ উদ্দিন আহমেদকে পাঁচ দিনের মধ্যে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে লিখিত জবাব জমা দেওয়ার জন্য বলা হয়েছে।

২০ দল শরিক জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের মহাসচিব ও হেফাজতে ইসলামের মহাসচিব নূর হোসাইন কাসেমীর জানাজা হয় সোমবার জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররম এলাকায়। জানাজায় লক্ষাধিক লোক অংশ নেন। জানাজার পর দুপুরে রাজধানীর গুলিস্তান ও পল্টন এলাকায় হঠাত্ করে পেশাজীবী পরিষদের ব্যানারে বিএনপির কয়েক হাজার নেতা-কর্মী-সমর্থক অবস্থান নেন। নেতা-কর্মীদের সঙ্গে নিয়ে সেখানে উপস্থিত হন শওকত মাহমুদ, সাদেক খান ও কল্যাণ পার্টির সভাপতি সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম। পরে লাঠিচার্জ ও টিয়ারগ্যাস ছুঁড়ে নেতাকর্মীদের ছত্রভঙ্গ করে দেয় পুলিশ। গুলিস্তানের জিরো পয়েন্ট এলাকায়ও রাস্তা অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন অবস্থান নেওয়া নেতাকর্মীরা।

এসময় তারা সরকারের পদত্যাগের দাবিতে বিভিন্ন স্লোগান দেন। জানা গেছে, পেশাজীবী পরিষদের এই বিক্ষোভ কর্মসূচিটি হওয়ার কথা ছিল জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে। কিন্তু হঠাত্ স্থান বদল করে সেটি করা হয় পল্টন-জিরো পয়েন্ট এলাকায়। এই কর্মসূচিতে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীরও উপস্থিত থাকার কথা ছিল। কর্মসূচিতে যোগ দিতে তিনি জাতীয় প্রেস ক্লাবেও গিয়েছিলেন। বিএনপির সূত্রমতে, হাফিজ উদ্দিন ওই বিক্ষোভ ও অবস্থান কর্মসূচিতে না গেলেও এসম্পর্কে তিনি জানতেন।

সরকারের পদত্যাগ দাবিতে হঠাত্ বিক্ষোভ সম্পর্কে আগে অবহিত না থাকার কারণেই যে দুই নেতাকে শোকজ করা হয়েছে- সেটির সত্যতা পাওয়া যায় ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর জবানিতেও। জাফরুল্লাহ চৌধুরী বুধবার ইত্তেফাকের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, ‘আমি মনে করি হাফিজ-শওকতরা খুব ভালো কাজ করেছেন। বিএনপির মূল নেতৃত্ব তো দীর্ঘদিন ধরে নিষ্ক্রিয়। একারণে দলের নেতাকর্মীরা হতাশ। এজন্য হাফিজ-শওকতদের উদ্যোগটিকে আমি স্বাগত জানাই। তবে দলের হাইকমান্ডকে আগে না জানিয়ে তারা ভুল করেছেন। তারা হয়তো মনে করেছেন- হাইকমান্ডকে জানালে না করতো। তারপরেও বলবো, হাইকমান্ডের উচিত ছিল তাদেরকে ডেকে নিয়ে জানতে চাওয়া। এভাবে পাবলিকটি তাদেরকে শোকজ করাটা বিএনপির ভুল সিদ্ধান্ত।’

উদ্যোগটি কি ছিল? প্রশ্ন করা হলে জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, ‘উদ্যোগ ছিল রাস্তায় নামার। আমাকে ওইদিনই শওকত ফোন করে বললো- আপনি কোথায় আছেন, আধাঘণ্টা পর একটু থাকতে পারবেন। আমাকে বলেছিল প্রোগ্রামটি হবে সেগুনবাগিচা এলাকায়। সেই অনুযায়ী আমি প্রেস ক্লাবে যাই, সেখানে প্রায় আধা ঘণ্টা অপেক্ষা করে চলে আসি।’

পেশাজীবী পরিষদের ব্যানারে হঠাত্ এই বিক্ষোভ ও অবস্থান কর্মসূচির আগের রাতে ঐক্যফ্রন্ট শরিক নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্নার রাজধানীর গুলশানের বাড়ি ঘেরাও করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। পরে অবশ্য পুলিশ সেখান থেকে চলে যায়। এবিষয়ে মান্না গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, পুলিশ এসেছিল, তবে আমার সঙ্গে তারা কোনো কথা বলেনি। তারা দারোয়ানকে জিজ্ঞেস করেছে- ভেতরে কে কে আছে; এই আর কী।

পল্টন-গুলিস্তান এলাকায় পেশাজীবী পরিষদের কর্মসূচির বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে মান্না বলেন, এবিষয়ে আমি কিছু জানি না, আমি সেখানে যাইওনি। বিএনপির দুই নেতাকে শোকজের বিষয়ে তার মন্তব্য, আমি বুঝতে পারছি না যে- যারা অবস্থান নেওয়ার চেষ্টা করেছিল তারা অন্যায়টা কি করেছে?

তবে শোকজের কারণ সম্পর্কে জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করেও হাফিজ উদ্দিন ও শওকত মাহমুদকে পাওয়া সম্ভব হয়নি। হাফিজ উদ্দিন আজ বৃহস্পতিবার সংবাদ সম্মেলনে এবিষয়ে বিস্তারিত বলতে পারেন বলে তার ঘনিষ্ঠ সূত্র জানিয়েছে।

জানা গেছে, ওই অবস্থান কর্মসূচিতে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে বিএনপি সমর্থনে মেয়র নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা ইঞ্জিনিয়ার ইশরাক হোসেনের কর্মী-সমর্থকরাও অংশ নেন। এদিকে ইশরাকের গোপীবাগের বাসায় গতকাল ভোরে হামলা চালায় দুর্বৃত্তরা। হামলাকারীরা ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে বাড়ির গ্লাস ভাঙচুর করে এবং বাড়ির সামনের পোস্টার-ফেস্টুন ছিঁড়ে ফেলে।

Share Button