করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের কারণে ফের কাঁচামাল সংকটের মুখে পড়ছে শিল্প খাত। পণ্য সরবরাহকারী অনেক দেশে প্রাণঘাতী এ ভাইরাস মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। ফলে ওইসব দেশ থেকে কাঁচামাল আসতে বিলম্ব হচ্ছে।

এর সঙ্গে যোগ হয়েছে বিশ্ববাজারে শিল্পের কাঁচামালের মূল্য বৃদ্ধি। পাশাপাশি দেশে কোয়ারেন্টিনের কারণে বিদেশি জাহাজ থেকে নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ হচ্ছে না।

এসবের বিরূপ প্রভাব পড়েছে স্থানীয় শিল্পের ওপর। এতে উৎপাদনের গতি ব্যাহত হচ্ছে। করোনার প্রথম সংক্রমণের সময় একদফা এই সংকট দেখা দিয়েছিল। সংশ্লিষ্ট সূত্রে পাওয়া গেছে এ চিত্র।

উৎপাদনমুখী শিল্পের কোন ধরনের কাঁচামালের আমদানি কমেছে, এটি চিহ্নিত ও কারণ খুঁজে বের করতে বাংলাদেশ ব্যাংককে পরামর্শ দিয়েছেন বিআইডিএসের সাবেক মহাপরিচালক এম কে মুজেরি। তিনি বলেন, কারণ জানা গেলে সব ধরনের প্রস্তুতি নিতে পারবে সরকার।

এম কে মুজেরির মতে, এই সময়ে কাঁচামাল আমদানি হ্রাসের পেছনে ক্রেতার ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়াও একটি কারণ হতে পারে। মার্চ থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত করোনা চলছে। অনেকের ক্রয়ক্ষমতা কমছে। ফলে পণ্যের চাহিদা তেমন না থাকায় শিল্পের উৎপাদন কমতে পারে।

আর উৎপাদন হ্রাসের ফলে কাঁচামালের আমদানিও কমতে পারে বলে মনে করছেন এই অর্থনীতিবিদ।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যমতে, জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত উৎপাদনমুখী শিল্পের অনুকূলে কাঁচামাল আমদানির জন্য ঋণপত্র (এলসি) নিষ্পত্তি কম হয়েছে। এ সময়ে এলসি নিষ্পত্তি কমেছে ১৯৫ কোটি মার্কিন ডলার, যা দেশীয় মুদ্রায় ১৬ হাজার ৫৭৫ কোটি টাকা।

একই সময়ে ঋণপত্র খোলার পরিমাণ কমেছে ১২৪ কোটি মার্কিন ডলার বা ১০ হাজার ৫৬৬ কোটি টাকা। স্থানীয় শিল্পের পণ্য উৎপাদনে কাঁচামাল সংকটের বিষয়টি ঋণপত্র খোলা ও নিষ্পত্তির নিম্নমুখী প্রবণতাই ফুটিয়ে তুলেছে।

সূত্রমতে, গত জুলাই-সেপ্টেম্বরে দেশের স্থানীয় শিল্পে কাঁচামাল আমদানি হ্রাসসহ সার্বিক পরিস্থিতি তুলে ধরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক অর্থ মন্ত্রণালয়ে একটি প্রতিবেদন দিয়েছে। এতে দেখা গেছে, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর-এই তিন মাসে বিদেশ থেকে শিল্পের কাঁচামাল আমদানির জন্য ঋণপত্র খোলা হয়েছে ১৯ হাজার ১০০ কোটি মার্কিন ডলারের।

গত অর্থবছরে একই সময়ে এ খাতে ঋণপত্র খোলা হয়েছিল ২০ হাজার ৩৪৩ কোটি মার্কিন ডলারের। পাশাপাশি চলতি অর্থবছরে শিল্পের কাঁচামাল আমদানির ঋণপত্র নিষ্পত্তি হয়েছে ১৭ হাজার ৬৫৯ কোটি মার্কিন ডলারের, যা গত বছরের একই সময়ে হয়েছিল ১৯ হাজার ৬০৫ কোটি ডলার।

প্রতিবেদনে আরও দেখা গেছে, কাঁচামাল আমদানির কারণে এই সময়ে অনেক শিল্পে উৎপাদনও কমেছে।

জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর ওয়্যারিং অ্যাপারেলস (পোশাক) শিল্পের উৎপাদন কমেছে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৪ দশমিক ৫৫ শতাংশ, কেমিক্যাল ও কেমিক্যালজাত পণ্যের উৎপাদন কমেছে ৭ দশমিক ৩৩ শতাংশ, বেসিক মেটেরিয়ালসে কমেছে ৭ দশমিক ২২ শতাংশ এবং অন্যান্য পণ্যের উৎপাদন কমেছে ১ দশমিক ১৬ শতাংশ।

সংশ্লিষ্ট শিল্প উদ্যোক্তাদের মতে, করোনার দ্বিতীয় ঢেউ শিল্পের কাঁচামাল আমদানির ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে। রফতানিকারক অনেক দেশের পণ্য সরবরাহে গতি কমেছে। আবার নিয়ম অনুযায়ী করোনাভাইরাসমুক্ত করতে অনেক আমদানি জাহাজ ১৫ দিন কোয়ারেন্টিনে থাকায় পণ্য সরবরাহে বিলম্ব ও ক্ষতিপূরণ বেড়ে যাচ্ছে।

পাশাপাশি নানা কারণে বিশ্ববাজারে এর দামও বেড়েছে। এসব পরিস্থিতিতে নতুন করে কাঁচামাল নিয়ে উদ্যোক্তাদের মধ্যে এক ধরনের শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আন্তর্জাতিক বাজারে রডের কাঁচামালে টনপ্রতি বেড়েছে ১১ হাজার ৯০০ টাকা (১৪০ ডলার মার্কিন ডলার)। অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধির কারণে আমদানি কাটছাঁট করছে উৎপাদনমুখী শিল্প। এতে স্থানীয় বাজারে ফিনিশড রডের মূল্য টনপ্রতি ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা বেড়েছে। অন্যান্য শিল্পের কাঁচামালের একই অবস্থা বিরাজ করছে।

জানতে চাইলে স্টিল মিল মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের ফাউন্ডার চেয়ারম্যান মাসাদুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, কোভিড-১৯-এর দ্বিতীয় ঢেউয়ের কারণে বিশ্ববাজারে রড উৎপাদন উপকরণের মূল্য বেড়েছে। আমদানি পণ্যের সরবরাহে শ্লথগতি দেখা দিয়েছে।

এছাড়া করোনার কারণে ১৫ দিন শিপমেন্ট বিলম্ব হচ্ছে। এতে প্রতি কনটেইনারে ৩৫০ ডলার খরচ বেড়েছে। শিল্পের কাঁচামালের মূল্য বৃদ্ধির কারণে অনেকে আমদানি করছে না। যে কারণে রড উৎপাদন শিল্পে কাঁচামালের সংকট সৃষ্টি হয়েছে।

তিনি বলেন, বিশ্ববাজারে কাঁচামালের মূল্য বৃদ্ধির এ ধারা অব্যাহত থাকলে স্থানীয় শিল্পকে অস্বাভাবিক দামে কিনতে হবে। এতে অভ্যন্তরীণ বাজারে রডের মূল্য নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে।

বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের সিনিয়র সহসভাপতি মো. হাতেম যুগান্তরকে বলেন, করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের কারণে অর্ডার বাতিল হচ্ছে। যে কারণে এ শিল্পে কাঁচামাল আমদানিও কমেছে।

অনেক প্রতিষ্ঠান কাঁচামালের পুরনো মজুদ থেকে অর্ডার অনুযায়ী ফিনিশড পণ্য উৎপাদন করছে। এ বিষয়টি নিয়ে খুব শিগগিরই বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে একটি বৈঠক করা হবে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, আমদানি বাধাগ্রস্ত হলে রফতানিও বাধাগ্রস্ত হবে। কারণ বেশির ভাগ শিল্পের কাঁচামাল আমদানি করা হয়। সেগুলো দিয়ে পণ্য তৈরি করে রফতানি হয়।

এদিকে সরকারকে অবশ্য দৃষ্টি দিতে হবে। তবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, বিষয়টি বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে খোঁজখবর রাখা হচ্ছে। সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে অবহিত করা হয়েছে।

Share Button