ছবি: সংগৃহীত

অর্থনৈতিক স্থবিরতার বছরেও উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ প্রস্তাব এসেছে দেশের অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে। বিদায়ী বছরের জানুয়ারি-ডিসেম্বর পর্যন্ত ৪০৮ কোটি ডলার বা ৩৪ হাজার ৬৮০ কোটি টাকা সমপরিমাণ (১ ডলার সমান ৮৫ টাকা হিসাবে) বিনিয়োগ প্রস্তাব জমা হয়েছে দেশের অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে।

গেল ২০২০ সালের পুরোটা জুড়েই করোনার আঘাত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে বাধাগ্রস্ত করেছে। সারা বিশ্বে বছরের শুরুতে লকডাউন এবং স্থবিরতা শুরু হলেও বাংলাদেশে মূলত মার্চ মাস থেকে বিরূপ প্রভাব শুরু হয়। দীর্ঘ মেয়াদে ছুটি এবং লকডাউনের প্রভাবে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে নেমে আসে স্থবিরতা। নতুন বিনিয়োগে স্থবিরতা ছিল বছর জুড়েই। এর পরেও আশার আলো জুগিয়েছে বিনিয়োগ প্রস্তাবগুলো।

বেজা সূত্রে জানা যায়, গত বছর মার্চ থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত করোনাকালে অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগ প্রস্তাব জমা হয়েছে প্রায় ৩১৫ কোটি মার্কিন ডলার সমপরিমাণ (২৬ হাজার ৭৫৭ কোটি টাকা)। যার মধ্যে বিদেশি বিনিয়োগের প্রস্তাব প্রায় ৫৪ কোটি ৫২ লাখ ডলার (৪ হাজার ৬৩৪ কোটি টাকা) এবং স্থানীয় বিনিয়োগ প্রস্তাবের পরিমাণ ২৬৭ কোটি ৫০ লাখ ডলার (২২ হাজার ৭৩৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা)।

করোনাকালীন বিনিয়োগ পরিস্থিতি নিয়ে বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যান পবন চৌধুরী বলেন, করোনাকালে বিনিয়োগ আগ্রহ প্রমাণ করে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অঞ্চলসমূহ বিনিয়োগের সর্বশ্রেষ্ঠ স্থান। বর্তমান সরকারের স্থায়িত্ব ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কারণে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্পনগর দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিনিয়োগের আদর্শ স্থান হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। তিনি উল্লেখ করেন, বঙ্গবন্ধু শিল্পনগর হবে আগামী বাংলাদেশের বিনিয়োগ ও বাণিজ্যের রাজধানী।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) গভর্নিং বোর্ড ইতিমধ্যে ৯৭টি অর্থনৈতিক অঞ্চলের স্থান নির্ধারণ ও জমির পরিমাণ অনুমোদন করেছে। এর মধ্যে সরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চল ৬৮টি এবং বেসরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চল ২৯টি। এসব অর্থনৈতিক অঞ্চলের মধ্যে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের অর্থনৈতিক অঞ্চল রয়েছে দুটি, জিটুজি অর্থনৈতিক অঞ্চল চারটি এবং ট্যুরিজম পার্ক রয়েছে তিনটি।

ইতিমধ্যে পাঁচটি অর্থনৈতিক অঞ্চল, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্পনগর, মহেশখালী, শ্রীহট্ট, জামালপুর অর্থনৈতিক অঞ্চল ও সাবরাং ট্যুরিজম পার্কে ১৭২টি বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে ৭ হাজার ৩১৫ একর জমি ইজারা প্রদানে নির্বাচন করা হয়েছে। এগুলোতে প্রস্তাবিত বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ২ হাজার ৩৯৭ কোটি মার্কিন ডলার বা (২ লাখ ৩ হাজার ৭৪৫ কোটি টাকা)। এছাড়া প্রায় ৩১০ কোটি ডলার (২৬ হাজার ৩৫০ কোটি টাকা) বিনিয়োগ হয়েছে বেসরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চলসমূহে। এর ফলে সর্বমোট বিনিয়োগের প্রস্তাবের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৭০৭ কোটি মার্কিন ডলার (২ লাখ ৩০ হাজার ৯৫ কোটি টাকা)। প্রস্তাবিত বিনিয়োগ বাস্তবায়নের মাধ্যমে প্রায় ১০ লাখ কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

বেজায় উল্লেখ্যযোগ্য বিদেশি বিনিয়োগ প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে—যুক্তরাজ্যের বার্জার পেইন্টস, চায়নার জিয়াংসু ইয়াবাং ডাইস্টফ কোং লিমিটেড, জিহং মেডিকেল প্রডাক্টস (বিডি) কোং, লিমিটেড, সিসিইসিসি বাংলাদেশ লিমিটেড, অস্ট্রেলিয়ার এইচএ টেক লিমিটেড, ভারতের রামকি এনভিরো সার্ভিস প্রাইভেট লিমিটেড, জার্মানির সঙ্গে জয়েন্ট ভেঞ্চারে ভারতের ফর্টিস গ্রুপ, নেদারল্যান্ডসের লিজার্ড স্পোর্টস এবং সিংগাপুরের ইন্টার-এশিয়া গ্রুপ প্রাইভেট লিমিটেড।

দেশীয় প্রস্তাবিত বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো মেট্রো স্পিনিং লিমিটেড, ম্যাকসনস স্পিনিং আই টেক্সটাইলস, সামুদা ফুড প্রডাক্টস লিমিটেড, উত্তরা মোটরস লিমিটেড, বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজিএমইএ), সায়মান বিচ রিসোর্ট লিমিটেড, মাফ জুস লিমিটেড, বাংলাদেশ গার্মেন্টস এক্সেসরিজ অ্যান্ড প্যাকেজিং ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজিএপিএমইএ), এন. মোহাম্মদ প্লাস্টিক ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, ইফাদ অটোস লিমিটেড, রানার মোটরস লিমিটেড, সাইফ পাওয়ারটেক, ডেল্টা ফার্মা লিমিটেড, এশিয়া কমপোজিট মিলস লিমিটেড উল্লেখযোগ্য।

বেজার বিনিয়োগ প্রস্তাবগুলো পর্যালোচনা করে দেখা যায়, গত বছর বিনিয়োগ প্রস্তাব সবচেয়ে বেশি এসেছে খাদ্য ও কৃষি খাতে ২৩ দশমিক ৪২ শতাংশ। উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ প্রস্তাবের মধ্যে এর পরেই বিদ্যুত্ ও গ্যাস খাতে ২০ দশমিক ৫৬ শতাংশ, ইস্পাত খাতে ১৮ দশমিক ০৪ শতাংশ, গার্মেন্টস ও টেক্সটাইল খাতে ১৬ দশমিক ৮৯ শতাংশ, কেমিক্যাল খাতে ১৩ দশমিক ৭১ শতাংশ।

উল্লেখ্য, বেজার আওতায় ওয়ান স্টপ সার্ভিস সেন্টারে অনলাইনে প্রদত্ত সেবার পরিমাণ বুধবার থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৮টিতে। এর আগে গত ২২ নভেম্বর ওয়ান স্টপ সার্ভিস সেন্টারে ১১টি সেবা অনলাইনে যুক্ত করা হয়। বেজার সূত্রে জানা যায়, ২০২১-এর জানুয়ারির মধ্যে আরো ছয়টি সেবা অনলাইনে যুক্ত হওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। এর ফলে জানুয়ারি মাসের শেষে অনলাইনের মাধ্যমে ওএসএসের সেবার সংখ্যা হবে ৫৪টি।

Share Button