ছবি: সংগৃহীত

করোনার প্রথম ধাক্কা কাটতে না কাটতেই দ্বিতীয় ঢেউয়ে টালমাটাল ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চল। এর মধ্যেই যুক্তরাজ্যে নতুন ধরনের করোনা শনাক্তের খবরে উদ্বেগ আরো বেড়েছে।

ইতিমধ্যে ইউরোপের অনেক দেশ লকডাউনে চলে গেছে। বাংলাদেশের রপ্তানির প্রায় ৬০ শতাংশই যায় ইউরোপের এসব দেশে। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডার মতো বড় বাজারেও প্রায় একই দশা। এই অবস্থায় রপ্তানি আদেশ কমতে শুরু করেছে ফের।

রপ্তানির প্রায় ৮৪ শতাংশই আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। এর মধ্যে নতুন করে দুশ্চিন্তা বাড়িয়েছে আন্তর্জাতিক বাজারে পোশাকের কাঁচামাল তুলার দরবৃদ্ধি।

সার্বিক পরিস্থিতিতে তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন আগামী জানুয়ারি থেকে নতুন করে চার মাসের জন্য শ্রমিকদের মজুরির জন্য দুই শতাংশ সুদে সরকারের প্রণোদনা সহায়তা চেয়েছে।

গত বুধবার বিজিএমইএ অর্থসচিবের কাছে চিঠি পাঠিয়ে ১ বছরের মোরাটরিয়াম (ঋণের কিস্তি যে সময় পর্যন্ত পরিশোধ করতে হয় না) এবং পরিশোধের জন্য পাঁচ বছর সময় চেয়েছে। এর আগে গত এপ্রিল থেকে শ্রমিকদের বেতন পরিশোধে সরকার ৫ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা সহায়তা দিয়েছিল। পরবর্তীতে তা বেড়ে ১০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।

বাংলাদেশ থেকে পোশাক পণ্য ক্রয় করে নেদারল্যান্ডসের লিজার্ড স্পোর্টস নামে একটি প্রতিষ্ঠান। নেদারল্যান্ডসের বাইরে ইউরোপের অন্যান্য দেশেও এই ব্র্যান্ডের দোকান রয়েছে। দেশটিতে এখন লকডাউনের কারণে এই প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম বন্ধ। লিজার্ড স্পোর্টসের প্রধান বাংলাদেশি নাগরিক জসিম উদ্দিন লিটন স্বপরিবারে চলে এসেছেন দেশে। ইত্তেফাককে তিনি বলেন, ‘সেখানে এখন দোকান খোলা যাচ্ছে না। ব্যবসা প্রায় বন্ধ। একমাস পর যাব।’

এ খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, অতীতে বছরের এই সময়ে প্রচুর রপ্তানি আদেশের কারণে কারখানাগুলোর সক্ষমতার পুরো ব্যবহার হয়ে ওভারটাইমেও কাজ করতে হতো। অথচ এবার ৬৫ থেকে ৭০ শতাংশ সক্ষমতা ব্যবহার হচ্ছে। অন্যদিকে যে ক্রয়াদেশ আসছে, তার দরও ক্রেতারা গড়ে ৫ শতাংশ কমিয়ে দিচ্ছেন।

নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা গার্মেন্টসে ফ্রান্সভিত্তিক একটি ক্রেতা প্রতিষ্ঠান রপ্তানি আদেশ দেওয়ার আলোচনা করলেও শেষ সময়ে এসে তা ‘আপাতত স্থগিত’ করেছে। প্রতিষ্ঠানটির মালিক ফজলে শামীম এহসান ইত্তেফাককে বলেন, তার কারখানায় অতীতে এই সময়ে পুরো সক্ষমতায় কাজ হলেও এখন ৭০ শতাংশ ব্যবহার হচ্ছে।

অন্যদিকে তুলার দরবৃদ্ধিও নতুন করে উদ্বেগ বাড়িয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, আমি এই সময়ে যে পণ্য তৈরি করছি, এটি আগের কাঁচামালের দরের ওপর ভিত্তি করে। অথচ কাঁচামালের দাম এখন ব্যাপক বেড়ে গেছে।

এমবি নিট ফ্যাশন্সের মালিক ও পোশাক শিল্প মালিকদের অপর সংগঠন বিকেএমইএর সিনিয়র সহসভাপতি মোহাম্মদ হাতেম ইত্তেফাককে বলেন, তার কারখানায় এখন ইউরোপের দেশগুলোর নতুন ক্রয়াদেশ বন্ধ। কেবল সুইডেনের কিছু অর্ডার রয়েছে। আগামী ফেব্রুয়ারির কাজ এই সময়ে প্রক্রিয়াধীন থাকার কথা, কিন্তু নেই।

করোনার দ্বিতীয় ঢেউসহ সার্বিক পরিস্থিতির কারণে রপ্তানি কমে গিয়ে তা দেশের অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা।

পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর ইত্তেফাককে বলেন, আমরা ধারণা করেছিলাম পুনরুদ্ধার পর্ব আগামী মার্চ থেকে শুরু হবে। কিন্তু দ্বিতীয় ঢেউয়ের কারণে তা পিছিয়ে আগামী জুলাই পার হয়ে ২০২১ এর শেষ নাগাদ চলে যেতে পারে। অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আদায়ও কম। সার্বিকভাবে চ্যালেঞ্জ থেকে উত্তরণটা পিছিয়ে গেল। কিন্তু আমাদের প্রতিযোগীদের মধ্যে চীন ও ভিয়েতনামের পুনরুদ্ধার পরিস্থিতি ভালো। এ পরিস্থিতিতে প্রধান রপ্তানি খাত পোশাক শিল্প মালিকদের প্রণোদনা চাওয়াকে তিনি নেতিবাচকভাবে দেখছেন না।

তবে পুরো মজুরির অর্থ না দিয়ে আংশিক দেওয়া যেতে পারে উল্লেখ করে তিনি বলেন, যেহেতু তাদের কাজ আছে, পুরো টাকা দেওয়ার কোনো মানে হয় না। এছাড়া ঋণ পরিশোধে দুই বছরের বদলে মেয়াদ বাড়িয়ে দেওয়া যায়, এতে কারো বিশেষ কোনো ক্ষতি হবে না। রপ্তানিকারকরাও ‘ব্রিদিং স্পেস’ (কিছুটা দম ফেলার সুযোগ) পাবেন।

করোনার প্রথম ধাক্কায় মার্চ থেকে রপ্তানি ব্যাপকভাবে কমলেও জুলাই থেকে পরিস্থিতির উন্নতি হতে শুরু করেছিল। সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই ধারা অব্যাহত থাকার পর অক্টোবর থেকে ফের কমতে শুরু করে তৈরি পোশাক রপ্তানি।

বিজিএমইএর হিসাব অনুযায়ী, চলতি ডিসেম্বরের প্রথম ২০ দিনে এ খাতের রপ্তানি কমে গেছে সোয়া পাঁচ শতাংশ। গত বছরের এই সময়ে ১৭৬ কোটি ১৫ লাখ মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ পোশাক পণ্য রপ্তানি হলেও এবার তা কমে দাঁড়িয়েছে ১৭৩ কোটিতে। পরবর্তী দুই তিন মাসে রপ্তানি কেমন হবে, তা আন্দাজ করা যায় কাঁচামাল প্রাপ্যতার ঘোষণার ওপর যা ইউটিলিটি ডিক্লারেশন বা ইউডি নামে পরিচিত। পোশাকশিল্প মালিকদের দুটি সংগঠনের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, অতীতের একই সময়ের চেয়ে এবার ইউডি নেওয়ার পরিমাণ কম। তবে এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।

যেসব রপ্তানিকারক অপেক্ষাকৃত উচ্চমূল্যের পোশাক রপ্তানি করেন, এই সময়ে তাদের পরিস্থিতি অন্যদের তুলনায় বেশি খারাপ। এই ধরনের পোশাক রপ্তানির অন্যতম প্রতিষ্ঠান ভিয়েলাটেক্স। প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান ডেভিড হাসনাত ইত্তেফাককে বলেন, অতীতে এই সময়ে পুরো সক্ষমতার বাইরে ওভারটাইম মিলিয়ে ১২০ শতাংশ কাজ করা হতো। অথচ এখন তার কারখানায় ৬৫ থেকে ৭০ শতাংশ কাজ হচ্ছে। রাল্ফ লরেন, হুগো বস, অলিম্ফ, এস অলিভারের মতো ক্রেতার উচ্চমূল্যের ক্রেতাদের ক্রয়াদেশ এখন কমে গেছে। মূলত করোনায় ফ্যাশন পণ্যের বিক্রি কমায় এর ধাক্কা পড়েছে তাদের কারখানার ওপর।

এদিকে রপ্তানি আদেশ নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকায় কাঁচামালের সংস্থান নিয়েও তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। বিজিএমইএর সাবেক সহসভাপতি এ বি এম সামছুদ্দিন ইত্তেফাককে বলেন, সাধারণত ডিসেম্বরের শুরুতে ক্রেতারা রপ্তানি আদেশ দিয়ে থাকেন। এরপর কাঁচামাল সংগ্রহ করতে হয়, যার বেশির ভাগ আসে চীন থেকে। ক্রেতারা জানুয়ারিতে অর্ডার দিলে ঐ সময়ে তা সংগ্রহ করা দুরূহ হবে, কেননা এসব কাঁচামাল শিপমেন্ট করতে চীনের নববর্ষ পার হয়ে যাবে। এরপর কাঁচামাল এলে কারখানাগুলো তিন মাস বন্ধ থাকবে। ফলে বাড়বে জটিলতা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কেবল পোশাক পণ্য নয়, অন্যান্য রপ্তানি পণ্যের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি প্রায় কাছাকাছি। অবশ্য খাদ্যপণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে চিত্র কিছুটা ভিন্ন। ইউরোপ, আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়ায় খাদ্য ও পানীয়সহ হিমায়িত পণ্য রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান প্রাণ আরএফএলের রপ্তানি অপেক্ষাকৃত ভালো বলে জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির বিপণন পরিচালক কামরুজ্জামান কামাল। ইত্তেফাককে তিনি বলেন, তাদের রপ্তানি অপেক্ষাকৃত ভালো।