[ফাইল ছবি]

মাদক মামলায় কারাগারে থাকা পল্লবীর বেনারসি কারিগর নির্দোষ মো. আরমানকে অবিলম্বে মুক্তির নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। একইসঙ্গে অপরাধী না হয়েও প্রকৃত আসামির পরিবর্তে কারাভোগের জন্য তাকে ২০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ প্রদান করতে বলা হয়েছে। রায় প্রাপ্তির এক মাসের মধ্যে পুলিশের আইজি ও ডিএমপি কমিশনারকে এই অর্থ আরমানকে দিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছে।

এ সংক্রান্ত রিটের রুল যথাযথ ঘোষণা করে এ রায় দেন বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি মহি উদ্দিন শামীমের হাইকোর্ট বেঞ্চ।

রায়ের পর্যবেক্ষণে হাইকোর্ট বলেছে, এটা কোন নিছক দুর্ঘটনা নয়। পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী পুলিশ এ ঘটনা ঘটিয়েছে। এই ব্যর্থতা সংশ্লিষ্ট গুটিকয়েক পুলিশ সদস্যের নয়, এটা পুলিশ প্রশাসনের সামগ্রিক ব্যর্থতা। গণমাধ্যমের রিপোর্ট ও মামলার নথি থেকে প্রতীয়মান হয় যে পল্লবী থানার দায়িত্বরত তৎকালীন পুলিশ সদস্যদের উপর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের যথাযথ নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণ ছিলো না। এ ধরনের ঘটনা ন্যক্কারজনক। সাংবিধানিক আদালত হিসাবে এতে হাইকোর্টের হস্তক্ষেপের সুযোগ রয়েছে।

রায়ে হাইকোর্ট বলেছে, সাংবাদিকরা হচ্ছে সমাজের দর্পণ। সাংবাদিকদের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের কারণেই এ ধরনের অনেক অন্যায় ঘটনা আমাদের নজরে আসে এবং তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া যায়। সাংবাদিকরা যদি তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে পালন করে তাহলে সমাজের দুর্নীতিবাজ ও অন্যায়কারীর বিরুদ্ধে সহজেই প্রতিরোধ করা সম্ভব।

রায়ে ঐ মাদক মামলায় দশ বছরের সাজাপ্রাপ্ত প্রকৃত আসামি মাদক ব্যবসায়ী শাহাবুদ্দিনের পরিবর্তে নিরপরাধ আরমানকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানোর ঘটনায় পল্লবী থানার তৎকালীন ওসি দাদন ফকিরসহ চার পুলিশ কর্মকর্তাকে পুলিশ লাইন্সে সংযুক্তির নির্দেশ দিয়ে তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বলা হয়েছে। এছাড়া এ ঘটনার আদ্যোপান্ত তদন্ত করে ১১ এপ্রিলের মধ্যে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করতে পিবিআইয়ের ডিআইজি বনজ কুমার মজুমদারকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তদন্তের সময়ে আরমানের পরিবারের সদস্য ও অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যদের জবানবন্দি গ্রহণ করতে বলা হয়েছে।

আদালত বলেছে, এ ঘটনায় পুলিশের তদন্ত কমিটি আরমানকে নিরপরাধ ঘোষণা করেছে। দায়িত্বে অবহেলার জন্য দুজন পুলিশ সদস্যকে পদাবনতি দেয়। যাদের পদাবনতি দেওয়া হয় তারা ক্ষুদ্র অফিসার। এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়াই যথেষ্ট নয়। এর পেছনে আর কারা জড়িত সেটা বের করতে পিবিআইকে নির্দেশ দেওয়া হলো।

গত বছরের ১৮ এপ্রিল একটি জাতীয় দৈনিকে ‘কারাগারে আরেক জাহালম’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। ঐ প্রতিবেদনে বলা হয়, অপরাধী না হয়েও পাটকল শ্রমিক জাহালমকে জালিয়াতির ৩৩ মামলার আসামি হয়ে ৩ বছর কারাভোগ করতে হয়েছিল। হাইকোর্টের হস্তক্ষেপে তিনি কারামুক্ত হন।

চাঞ্চল্যকর এ ঘটনার রেশ না কাটতেই আরেক জাহালমকাণ্ড বেরিয়ে এসেছে অনুসন্ধানে। জানা গেছে, পল্লবীর বেনারসি কারিগর মো. আরমান নির্দোষ হয়েও ১০ বছরের সাজাপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে গত ৩ বছর ধরে কারাভোগ করছেন। রাজধানীর পল্লবী থানার একটি মাদক মামলায় ১০ বছরের সাজাপ্রাপ্ত আসামি মাদক কারবারি শাহাবুদ্দিন বিহারি এ মামলার প্রকৃত আসামি। কিন্তু তার পরিবর্তে সাজাভোগ করছেন আরমান। শুধু পিতার নামের মিল থাকায় পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে শাহাবুদ্দিন নামে আদালতে সোপর্দ করেছে বলে জোর অভিযোগ করেছে তার পরিবার। অন্যদিকে প্রকৃত আসামি শাহাবুদ্দিন কারাগারের বাইরে দিব্যি মাদক কারবার চালিয়ে যাচ্ছেন। এই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে হাইকোর্টে রিট করেন

‘ল এন্ড লাইফ ফাউন্ডেশন’ এর পক্ষে ব্যারিস্টার হুমায়ন কবির পল্লব। ঐ বছরের ২৩ এপ্রিল রিটের শুনানি নিয়ে হাইকোর্ট রুল জারি করে। রুলে আরমানকে কেন মুক্তি এবং পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হবে না তা জানতে চাওয়া হয়। ঐ রুলের চূড়ান্ত শুনানি নিয়ে হাইকোর্ট আরমানকে মুক্তি ও ২০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণের নির্দেশ দেয়। এছাড়া ওসি দাদন ফকির ছাড়াও ডিবির এসআই মো. নজরুল ইসলাম, সিরাজুল ইসলাম ও মো. রাসেলের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়। এছাড়া তাদেরকে কম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব প্রদান করতে পুলিশের আইজিকে বলেছে হাইকোর্ট।

আদালতে রিটের পক্ষে শুনানি ব্যারিস্টার হুমায়ন কবির পল্লব ও রাষ্ট্রপক্ষে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল নওরোজ মো. রাসেল চৌধুরী।