রাবেয়া খাতুনের মরদেহ শ্রদ্ধা জানানো হচ্ছে। ছবি : সংগৃহীত

সর্বস্তরের শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে বনানী কবরস্থানে বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক রাবেয়া খাতুনের দাফন সম্পন্ন হয়েছে।

এর আগে বিকেল ৩টায় চ্যানেল আই কার্যালয়ে রাবেয়া খাতুনের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজা শুরুর আগে রাবেয়া খাতুনের বড় জামাতা টেলিভিশন উপস্থাপক, প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান এবং চ্যানেল আই ও ইমপ্রেস গ্রুপের পরিচালক মুকিত মজুমদার বাবু তার শাশুড়ির জন্য সবার কাছে দোয়া চান। জানাজায় উপস্থিত রাবেয়া খাতুনের জন্য সকলের কাছে দোয়া চেয়েছেন চ্যানেল আইয়ের পরিচালক ও বার্তা প্রধান শাইখ সিরাজ।

সকাল ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে রাবেয়া খাতুনের মরদেহ রাখা হয় সর্ব সাধারণের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য। শ্রদ্ধা জানাতে আসেন বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, শিল্প সাহিত্য ও সংস্কৃতি অঙ্গনের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বরা। এদিন শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য তার মরদেহ নজরুল মঞ্চের বেদিতে রাখা হয়। সেখানে শ্রদ্ধা জানাতে আসেন তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, বাংলা একাডেমির সভাপতি শামসুজ্জামান খান, মহাপরিচালক হাবিবুল্লাহ সিরাজী, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব নাসির উদ্দিন ইউসুফ প্রমুখ।

স্বাধীনতা পুরস্কার, একুশে পদক ও বাংলা একাডেমি পুরস্কারসহ অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননায় ভূষিত রাবেয়া খাতুন ৩ জানুয়ারি বাধ্যর্কজনিত কারণে মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮৫ বছর।

উপন্যাস, ছোটগল্প, ভ্রমণকাহিনী, কিশোর উপন্যাস, স্মৃতিকথাসহ চলচ্চিত্র ও নাট্য জগতেও বিচরণ ছিল রাবেয়া খাতুনের লেখনি। তার মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস ‘মেঘের পরে মেঘ’ জনপ্রিয় একটি চলচ্চিত্র। ‘মধুমতি’ এবং ‘কখনো মেঘ কখনো বৃষ্টি’ও প্রশংসিত হয়েছে সব মহলে। রাবেয়া খাতুনের স্বামী প্রয়াত এটিএম ফজলুল হক ছিলেন দেশের চলচ্চিত্র বিষয়ক প্রথম পত্রিকা সিনেমার সম্পাদক ও বাংলাদেশের প্রথম শিশুতোষ চলচ্চিত্র ‘প্রেসিডেন্ট’ এর পরিচালক। ১৯৫২ সালের ২৩ জুলাই এটিএম ফজলুল হকের সাথে পারিবারিকভাবে রাবেয়া খাতুনের বিয়ে হয়।

রাবেয়া খাতুনের বড় ছেলে ফরিদুর রেজা সাগর বিশিষ্ট শিশুসাহিত্যিক ও টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব এবং ইমপ্রেস টেলিফিল্ম লিমিটেড ও চ্যানেল আই-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক। ছোট ছেলে ফরহাদুর রেজা প্রবাল একসময়ের টেলিভিশনের জনপ্রিয় উপস্থাপক ও স্থপতি এবং বর্তমানে অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী। বড় মেয়ে কেকা ফেরদৌসী বিশিষ্ট রন্ধনবিদ। বড় জামাতা মুকিত মজুমদার বাবু টেলিভিশন উপস্থাপক, প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান এবং চ্যানেল আই ও ইমপ্রেস গ্রুপের পরিচালক। ছোট জামাতা জহির উদ্দিন মাহমুদ মামুন বিশিষ্ট শিল্পপতি, চ্যানেল আই ও ইমপ্রেস গ্রুপের পরিচালক। বড় পুত্রবধূ কনা রেজা বিশিষ্ট নারী উদ্যোক্তা ও পানসুপারির সত্ত্বাধিকারী। ছোট মেয়ে ফারহানা কাকলী সুগৃহিনী।

কথাসাহিত্যিক হিসেবে সমধিক পরিচিত হলেও রাবেয়া খাতুন এক সময় শিক্ষকতা করেছেন। সাংবাদিকতার সঙ্গে দীর্ঘদিন যুক্ত ছিলেন। ইত্তেফাক, সিনেমা পত্রিকা ছাড়াও তার নিজস্ব সম্পাদনায় পঞ্চাশ দশকে বের হতো ‘অঙ্গনা’নামের একটি মহিলা মাসিক পত্রিকা। তার প্রকাশিত পুস্তকের সংখ্যা একশোর বেশি।

সাহিত্যচর্চার জন্য পুরস্কার হিসেবে পেয়েছেন স্বাধীনতা পুরস্কার (২০১৭), একুশে পদক (১৯৯৩), বাংলা একাডেমি পুরস্কার (১৯৭৩), নাসিরুদ্দিন স্বর্ণ পদক (১৯৯৫), হুমায়ূন স্মৃতি পুরস্কার (১৯৮৯), কমর মুশতারী সাহিত্য পুরস্কার (১৯৯৪), বাংলাদেশ লেখিকা সংঘ পুরস্কার (১৯৯৪), শের-ই-বাংলা স্বর্ণ পদক (১৯৯৬), ঝষিজ সাহিত্য পদক (১৯৯৮), লায়লা সামাদ পুরস্কার (১৯৯৯) ও অনন্যা সাহিত্য পুরস্কার (১৯৯৯)। ছোট গল্পের জন্য পেয়েছেন নাট্যসভা পুরস্কার (১৯৯৮)। সায়েন্স ফিকশন ও কিশোর উপন্যাসের জন্য পুরস্কৃত হয়েছেন শাপলা দোয়েল পুরস্কার (১৯৯৬), অতীশ দীপঙ্কর পুরস্কার (১৯৯৮), ইউরো শিশু সাহিত্য পুরস্কার (২০০৩)। ছোটগল্প ও উপন্যাসের চলচ্চিত্রায়ণ হয়েছে প্রেসিডেন্ট (১৯৬৬), কখনো মেঘ কখনো বৃষ্টি (২০০৩), মেঘের পরে মেঘ (২০০৪), ধ্রুবতারা, মধুমতি (২০১০) ইত্যাদি।

টিভি নাটকের জন্য পেয়েছেন টেনাশিনাস পুরস্কার (১৯৯৭), বাচসাস (বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতি) পুরস্কার, বাংলাদেশ কালচারাল রিপোর্টার্স এসোসিয়েশন মিলেনিয়াম অ্যাওয়ার্ড (২০০০), টেলিভিশন রিপোর্টার্স অ্যাওয়ার্ডসহ (২০০০) তিনি অনেক পুরস্কার ও সম্মাননা অর্জন করেছেন।