আল ইসলাম কায়েদ:

তথ্য প্রযুক্তির এ যুগে ইন্টারনেট আমাদের জীবনের সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে পড়েছে। এর বদৌলতে আমরা পেয়েছি ফেসবুক, টুইটার, লিঙ্ক উইনসহ আরো কতো কি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। এ সমস্ত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর বদৌলতে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তের খবর জানা যায় দ্রুততম সময়ের মধ্যেই যে যখন যেখানেই অবস্থান করুক না কেন শহর বন্দর, খাল-বিল , নদী -নালা শুধু হাতে একটি স্মার্ট ফোন থাকলেই চলে । জানা যায় দেখা যায় এক প্রান্তের খবর আরেক প্রান্তে। ফেসবুক নিয়ে পারিবারিক বা সামাজিক দায়িত্ব একটি বড় দিক।

পারিবারিক পরিবেশ যত সুন্দর হবে সামাজিক দায়-দায়িত্ব বোধ সম্পন্ন মানুষ যত বেশী ভালো ভাবনা নিয়ে এগিয়ে যাবে। আর ফেসবুকের কল্যাণ ও ততোই বেশী সাধিত হবে। জ্ঞান বিকাশের পরিধি ও ততোই বাড়তে থাকবে এ সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে। এর মাধ্যমে সকলেই পরস্পরের কাছাকাছি চলে আসবে। চিন্তা- চেতনা, জানা- শোনা ও জ্ঞান- বিজ্ঞানের আদান প্রদান ঘটে এর মাধ্যমে। মনের ভাব প্রকাশ সহজে করা যায়। কাছের ও দুরের লোকজন আত্বীয়- স্বজন, বন্ধ-ু বান্ধব, পাড়া- প্রতিবেশী সকলেই সকলের খুব কাছাকাছি চলে আসে । সকল আনন্দ- উল্লাস, দুঃখ- বেদনা, অডিও- ভিডিও লাইভ সম্প্রচারের মাধ্যমে ফেসবুকে চলে। এ মাধ্যমে অনেকেই ফেসবুক তারকা ও বনে যান। এর মাধ্যমে তাৎক্ষনিক লাইক কমেন্টসের সুবিধা থাকায় যোগাযোগটা হয়ে গেছে অনেক সহজময়। অনেকে বিদেশে পাড়ি জমান চাকুরী- বাকুরী, আয়- রোজগার ব্যবসা- বাণিজ্যের জন্য। অনেক দিন যাবত সেখানে থাকার ফলে আত্বীয় স্বজন বন্ধু বান্ধব কাউকে না দেখার ফলে জীবন বিষন্ন হয়ে উঠে। তখন একটু সময় নিয়ে ফেসবুক লাইভ ভিডিত্তর মাধ্যমে নিজের আত্মীয় স্বজনকে দেখে মনকে শান্তনা দিতে পারে, মনকে ফ্রেশ করতে পারে। যেখানেই থাকুক না কেন অন্তত একটা সেলফি তুলে ফেসবুকে আপলোড করে দিলেই আত্বীয় স্বজনরা তার অবস্থান জানতে পারে। আর সঙ্গে সঙ্গে লাইক কমেন্টস দিয়ে জানান দিয়ে দেয় তুমি যেখানেই থাক না কেন আমরা আছি তোমার পাশে,তুমি ভালো থাকো ইত্যাদি ইত্যাদি…।

আমরা অনেকেই জানি এ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমটির ব্যাবহারকারী ২শ কোটির ও বেশী ছুঁয়েছে। অর্থাৎ বিশ্বের এক চুতর্থাংশ মানুষ ফেসবুক ব্যবহার করছে। ফেসবুকের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী তার ফেসবুক একাউন্টে এক পোষ্টের মাধ্যমে জানিয়েছেন ২০১২ সালের অক্টোবরে ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১০০ কোটি ছাড়িয়েছিল। এর পর পাঁচ বছর ব্যবহারকারীর সংখ্যা দি-গুন হলো। এত ব্যবহারকারী পেয়েও সন্তুষ্ট নয় মার্ক জাকারবার্গ। ইউ এস এ টুডেতে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন ২০০ কোটি ছাড়লেও আমরা এখনো সবাইকে সংযুক্ত করতে পারি নি। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো তার ইচ্ছা সবাইকে সংযুক্ত করা।

হ্যাঁ এ বিশ্বে সবাই ফেসবুকে সংযুক্ত হবে। এতে সব সফলতা যেমন আছে তার আবার কু-ফলতা ও আছে। ফেসবুকে বিষন্নতা বাড়ে, বাড়ে পারিবারিক দ্বন্দ- কলহ। কোমলমতি ছেলে মেয়েদের জীবন বিপন্ন হয়ে যাওয়া এগুলোও বেড়ে গেছে সমাজে। যারা দীর্ঘক্ষণ ফেসবুকে অপরের পোষ্ট করা ছবি ও কমেন্টস দেখে সময় কাটান তাদের ব্যক্তি জীবনে বিষন্নতা ও বৃদ্ধি পায়। নানা রকম বিতর্ক, খুনসুঁটি, রসালো মন্তব্য; ফটো মন্তব্য, ফটো ব্যানার কতই না কিছু হচ্ছে ফেসবুকে। এতে আবার ঈর্ষা, হিংসা, বিদ্বেষও কিন্ত কম ছড়াচ্ছে না ফেসবুকের মাধ্যমে। পেশা জীবনের অনিশ্চয়তা, বিচ্ছেদ ইত্যাদি নানা কারণে দেশ ছেড়ে বিদেশ পাড়ি জমাচ্ছে। এ সময়ের মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা অনেকেই বলছেন, অতিরিক্ত ফেসবুক আসক্তি এখন মনোরোগে রূপ নিতে চলেছে। এমন অনেকের মুখোমুখি হচ্ছে। এখন মধ্যরাত, শেষ রাত অবধি অনেকে মেতে রয়েছেন ফেসবুক নিয়ে। ফেসবুক মানুষের অতি প্রিয়ঘুম টাকেও কেড়ে নিয়েছে। এ ফেসবুকের কারনে মানুষ এখন ঘুমানোর সময়ে ফেসবুক চালায় আর কাজের সময় ঘুমায়। এর অতিরিক্তি ব্যবহারে জীবনে নেমে আসে বিষন্নতা আবার ছেলে মেয়েদের লালন পালনের ক্ষেত্রে বাবা মায়ের চিন্তার ঝুলিতে যুক্ত হয়েছে নতুন বিষয় ইন্টারনেট- ফেসবুক। মা বাবার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এখন ছেলে মেয়েরাও সময়- অসময়ে পড়াশোনার বদলে ব্যবহার করছে ইন্টারনেট- ফেসবুক। এর ব্যবহারে মা- বাবার চেয়ে ছেলে মেয়েরা পারদর্শী কম নয়। বড়দের চেয়ে এগিয়ে আছে ছেলে মেয়েরা ও আর এগুলো ব্যবহার করে বিভিন্ন খারাপও ভুল তথ্যের মধ্যমে প্রভাবিত হয়ে অনেক শিশু কিশোর তরুন তরুনীদের ঠেলে দিচ্ছে নানান অন্যায় অপকর্মের দিকে। যার ফলে ধীরে ধীরে দুরে সরে যা”্ছে নৈতিকতা ও মূল্যবোধ।
এ সমাজে পূর্বে ছিল সামাজিক ও পারিবারিক পরিমন্ডলে আসা- যাওয়া, দেখা- শোনা, খাওয়া- দাওয়ার সাথে খোঁজ খবর নেওয়ার রেওয়াজ পূর্বে ছিল। কিন্ত এখন সেগুলো শুধুই স্মৃতি। এমন কি ধর্মীয় উৎসব, পার্বণে পর্যন্ত কেউ এখন আর আত্মীয় স্বজনের বাড়িতে আগের মতো যায় না। মুঠো ফোনে এস এম এস পাঠিয়ে কিংবা ফোনালাপে শুভেচ্ছা জ্ঞাপনের মাধ্যমে সামাজিক দায় বদ্ধতার কাজটুকু সেরে নেয়। এখন অবস্থাটা এমন দাঁড়িয়েছে যে, নিকট আত্মীয় স্বজনের সান্নিধ্য নৈকট্যে¡র তাগিধ কেউ এখন আর অনুভব করছে না। যতটুকু রয়েছে তা দায় মেটানোর সীমাবদ্ধতায়, অনাবিল আন্তরিকতা, ভালোবাসা, সৌহার্দ্য সম্পৃক্তির অস্তিত্ব এখন আর খুজে পাওয়া যায় না।

পরিশেষে এতটুকুই বলা যায়- আত্নার বন্ধন না যায় খন্ডন। ফেসবুক , টুইটার যাহা ই বলিনা কেন সরাসরি দেখা-শাক্ষাৎ , খানা-পিনা ইত্যাদি না হলে বিভিন্ন আচার – অনুষ্ঠানে আত্নীয়-স্বজনকে কাছে না পেলে আত্নার সম্পর্ক ঠিক থাকে না ।