[প্রতিকী ছবি]

গাড়ির মালিকদের ওপর প্রতি বছরই বাড়ছে করের ভার। গাড়ি কেনার সময় বিপুল পরিমান আমদানিশুল্কসহ অন্যান্য করাদি পরিশোধ করার পর প্রতিবছর এভাবে কর বৃদ্ধি পেতে পেতে তা এখন অসহনীয় পর্যায়ে দাঁড়িয়েছে। করোনার এই সময়ে মানুষের আয় কমে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরো জটিল হয়েছে।

তথ্য অনুযায়ী, কেবল গত এক দশকে গাড়ির মালিকদের ওপর আয়কর বেড়েছে সর্বনিম্ন ৮ গুণ থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ২৫ গুণ পর্যন্ত। এর সঙ্গে রয়েছে বিআরটিএর নিবন্ধন ফি, সার্ভিস চার্জ, ট্যাক্স টোকেন নবায়ন ফি, ফিটনেস সনদ নবায়ন ফি। এর বাইরে আবার রিকন্ডিশন্ড গাড়ি কেনার ক্ষেত্রে বাড়তি ট্রান্সফার ফি নেওয়া হচ্ছে, যা নিয়মবহির্ভূত বলে মনে করা হচ্ছে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্যে দেখা গেছে, ২০০৯-১০ অর্থবছরে ১ হাজার ৫০০ সিসি (সিলিন্ডার ক্যাপাসিটি) পর্যন্ত একটি মোটর কারের আয়কর ছিলো ৩ হাজার টাকা। চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৫ হাজার টাকায়। অর্থাত্ এক দশকে এ ধরণের গাড়ির মালিকের ব্যয় বেড়েছে আট গুণেরও বেশি। আর গত এক বছরের ব্যবধানে এ ধরণের গাড়ির মালিকের খরচ বেড়েছে ৬৭ শতাংশ। অন্যদিকে ২০১০ সালে ২৮০০ সিসি বা এর উপরে একটি গাড়ির আয়কর ছিলো ৮ হাজার টাকা। আর চলতি অর্থবছর এ ধরণের সর্বোচ্চ সিসির (৩৫০০ সিসির ওপরে) গাড়ির মালিকের আয়কর বেড়ে দাঁড়িয়েছে দুই লাখ টাকা। এ ধরণের একটি গাড়ির জন্য মালিকের আয়কর বাবদ ব্যয় বেড়েছে ২৫ গুণ! গত বছর এ ধরণের একটি গাড়ির আয়কর ছিলো সোয়া এক লাখ টাকা। এবার তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে দুই লাখ টাকায়। এভাবে অন্যান্য গাড়ির আয়করও সিসি ভেদে প্রায় একই হারে বেড়েছে। বছর বছর এভাবে গাড়ির আয়কর বাড়ায় বিপাকে গাড়ির মালিকরা।

গাড়ির মালিকদের সঙ্গে আলাপকালে জানা যায়, গণপরিবহনের সঙ্কট ও বিশৃঙ্খলা এবং নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে অধিকাংশ মানুষ ব্যক্তিগত গাড়ি কেনায় আগ্রহী হয়েছে। অতীতে গাড়ির যে করহার ছিলো তা বিবেচনায় নিয়ে তারা গাড়ি কিনেছেন। কিন্তু বছর বছর বাছবিচারহীনভাবে কর বাড়তে থাকায় গাড়ি রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। আবার এতদিনেও রাজধানীসহ দেশের গণপরিবহন ব্যবস্থা উন্নত দেশ নয়ই, এমনকি পাশ্ববর্তী দেশগুলোর মানেও আসতে পারেনি। একদিকে ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার করা কঠিন হয়ে পড়ছে, অন্যদিকে শৃঙ্খলায় নেই গণপরিবহন ব্যবস্থা। ফলে উভয় সঙ্কটে পড়েছেন তারা। এ ধরণের পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে ব্যক্তিগত গাড়ির ওপর আয়করের বিষয়টি চিন্তা করা উচিত বলে মনে করেন তারা।

কেবল আয়কর নয়, একজন গাড়ির মালিককে বছর বছর বিআরটিএর সার্ভিস চার্জও দিতে হয়। সর্বশেষ গত বাজেটে এ ধরনের সার্ভিস চার্জের সম্পূরক শুল্ক বেড়েছে ৫০ শতাংশ। এছাড়া গাড়ি কেনার ক্ষেত্রেও এককালীন বিপুল পরিমাণ শুল্ককর তো রয়েছেই। বর্তমানে সর্বোচ্চ সিসির একটি গাড়ির শুল্ককর ৮০০ শতাংশের ওপরে।

অবশ্য বিদ্যমান আয়কর অধ্যাদেশ অনুযায়ী, গাড়ির আয়কর পরিশোধ করা হলেও পরবর্তীতে ব্যক্তির আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার সময় আগে প্রদেয় কর সমন্বয় করার সুযোগ রয়েছে। অর্থাত্ এই পরিমাণ টাকা বাদ দিয়ে অবশিষ্ট আয়কর জমা দেবেন করদাতা। তবে অগ্রিম প্রদত্ত করের চেয়ে যদি প্রদেয় করের পরিমাণ কম হয়, সেক্ষেত্রে ঐ টাকা তিনি ফেরত পাবেন না। ধরা যাক, কেউ সর্বোচ্চ সিসির গাড়ির জন্য দুই লাখ টাকা কর দিলেন। কিন্তু তার যদি বছর শেষে মোট প্রদেয় কর ৫০ হাজার টাকা হয়, কেবল ঐ পরিমাণ টাকাই সমন্বয় করা যাবে। বাকী দেড় লাখ টাকা তিনি ফেরত পাবেন না।

গাড়ির ওপর এত বেশি হারে কর নেওয়া যৌক্তিক নয় বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরাও। পলিসি রিসার্স ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহি পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, প্রথম দিকে ঠিকই ছিলো। কিন্তু বাড়াতে বাড়াতে এখন অতিরিক্ত হয়ে গেছে। একটি গাড়ির জন্য হঠাত্ করে একসাথে দেড় দুই লাখ টাকা কর দেওয়া তো সহজ ব্যাপার নয়। এতে তারল্যের সমস্যা হয়। এটি ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকার মধ্যে থাকলে তা সহনীয় ছিলো। তিনি বলেন, যদিও এই টাকা পরবর্তীতে সমন্বয় করার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু কারো কর কম আসলে তার তো ফেরত পাওয়ার সুযোগ নেই।

গত বাজেটে যেসব গাড়ির ইঞ্জিন ক্যাপাসিটি ১ হাজার ৫শ সিসির মধ্যে, এমন গাড়ির আয়কর ১৫ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ২৫ হাজার টাকা করা হয়েছে। এছাড়া ১ হাজার ৫শ থেকে ২ হাজার সিসি পর্যন্ত গাড়ির আয়কর ৩০ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ৫০ হাজার টাকা, দুই হাজার থেকে দুই হাজার পাঁচশ সিসির ক্ষেত্রে ৫০ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ৭৫ হাজার, দুই হাজার পাঁচশ থেকে তিন হাজার সিসি ৭৫ হাজার টাকার স্থলে ১ লাখ ২৫ হাজার, তিন হাজার থেকে তিন হাজার পাঁচশ সিসি এক লাখ টাকার স্থলে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং তিন হাজার পাঁচশ সিসির উপরে গাড়ির ক্ষেত্রে ১ লাখ ২৫ হাজার টাকার স্থলে দুই লাখ টাকা করা হয়েছে। মাইক্রোবাসের ক্ষেত্রে এই কর ২০ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ৩০ হাজার টাকা হয়েছে।

বিআরটিএ থেকে পাওয়া ২০১৮ সালের মার্চের তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত প্রাইভেট কার নিবন্ধন নিয়েছে ৩ লাখ ৩৫ হাজার ৬৬০টি। জিপ নিবন্ধন নিয়েছে ৫৪ হাজার ৪৪৭টি, আর ট্যাক্সিক্যাপ ৪৫ হাজার ২৩১টি। এছাড়া অ্যাম্বুলেন্স, অটো রিকসা, অটো টেম্পো, বাস, কার্গো ভ্যান, কাভার্ড ভ্যান, ডেলিভারি ভ্যান, হিউম্যান হলার, মাইক্রোবাস, মিনিবাস, মোটর বাইক, পিকআপ, ট্যাঙ্কার, ট্রাক ও অন্যান্য পরিবহন মিলিয়ে আলোচ্য সময় পর্যন্ত মোট নিবন্ধন নিয়েছে ৩৪ লাখ ১৯ হাজার ৮৮৪টি। কিছু ব্যতিক্রম বাদে সব ধরণের গাড়ির ওপরই ট্যাক্সসহ বিআরটিএর বিভিন্ন ফি ও চার্জ প্রযোজ্য।