বিদেশে অর্থ পাচার ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন মামলার তদন্ত দ্রুত শেষ করার নির্দেশ দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। পাশাপাশি রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে সংশ্লিষ্ট সবাইকে বলা হয়েছে। সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের সমন্বয় বৈঠকে এসব নির্দেশ দেওয়া হয়।

ওই বৈঠকে কাস্টমস এক্সাইজ ও ভ্যাট আপিলাত ট্রাইব্যুনালের মামলা নিষ্পত্তির হার বাড়ানোর ধারা অব্যাহত রাখারও তাগিদ দেওয়া হয়। এ ছাড়া জাতীয় সঞ্চয়পত্র স্কিমের সংশোধিত নীতিমালা এবং ডাকঘর সঞ্চয় ব্যাংকের আইনের চূড়ান্ত খসড়া অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে পাওয়া গেছে এসব তথ্য।

বৈঠকে উপস্থিত এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, করোনার মধ্যে রাজস্ব আহরণ ভালো হয়েছে। মনে করা হয়েছিল কাঙ্ক্ষিত হারে রাজস্ব আদায় হবে না। কিন্তু অর্থবছরের জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত রাজস্ব আদায় হার ঊর্ধ্বমুখী ছিল।

ফলে রাজস্ব আদায়ের ঊর্ধ্বগতির হার ধরে রাখার জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সব সদস্য, কমিশনার, কর কমিশনার ও মহাপরিচালককে (গবেষণা ও পরিসংখ্যান) নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের সিনিয়র সচিব আবু হেনা মো. রহমাতুল মুনিমের সভাপতিত্বে ওই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

সেখানে তুলে ধরা হয় মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন সংক্রান্ত মামলাগুলোর সর্বশেষ অবস্থা। শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর এ পর্যন্ত ৯০টি মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন সংক্রান্ত মামলা দায়ের করেছে। এর মধ্যে তদন্ত চলমান আছে ৫৭টি। ৫টি মামলার চার্জশিট আদালতে দাখিল করা হয়েছে। আরও ৫টি মামলার চার্জশিট দাখিলের কার্যক্রম চলছে।

বৈঠকে আরও বলা হয়, অর্থ পাচার সংক্রান্ত ১টি মামলা যৌথভাবে তদন্ত করছে সিআইডি, কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতর। এ ছাড়া আরও একটির তদন্ত কার্যক্রম চালাচ্ছে যৌথভাবে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), সিআইডি, কাস্টমস গোয়েন্দা ও অধিদপ্তর। পাশাপাশি ২১টি মামলা তদন্তাধীন রয়েছে সিআইডি ও দুদুকের হাতে।

সূত্র জানায়, এরইমধ্যে মানি লন্ডারিং অনুসন্ধান শেষে একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে তিনটি পৃথক মামলা করার অনুমতি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কাছে চাওয়া হয়েছে। এ ছাড়া বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগের ১৭টি ঘটনা মাঠ পর্যায়ে অনুসন্ধান চলছে। নতুন করে আরও তিনটি পাচারের অভিযোগ অনুসন্ধানের জন্য পাঠানো হয়েছে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের কাছে।

বৈঠকে এসব তথ্য তুলে ধরার পর আলোচনায় আসে তদন্ত কার্যক্রম নিয়ে। সেখানে বলা হয়, এসব মামলা তদন্তের জন্য সংশ্লিষ্ট তদন্ত কর্মকর্তাকে আরও অভিজ্ঞ হতে হবে। ফলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের অধীন মানি লন্ডারিং তদন্ত কার্যক্রম আরও শক্তিশালী করতে বাংলাদেশ ব্যাংক, দুদক ও আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিটির সঙ্গে একটি যৌথ ওয়ার্কশপ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

সূত্র আরও জানায়, এনবিআরের তথ্যমতে, গত জুলাই-নভেম্বর-এই পাঁচ মাসে রাজস্ব আহরণের প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৩৯ শতাংশ। এই সময় মোট রাজস্ব আদায় হয়েছে ৮৭ হাজার ৯২ কোটি টাকা। গত অর্থবছরের একই সময়ে রাজস্ব আদায় হয় ৮৪ হাজার ৪০৪ কোটি টাকা। তবে রাজস্ব আহরণে প্রবৃদ্ধি হলেও এটি চলতি অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কম।

এই সময়ে আমদানি ও রপ্তানি পর্যায়ে রাজস্ব আহরণ হয়েছে ২৭ হাজার ৭১৩ কোটি টাকা। এ খাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৬ দশমিক ২৪ শতাংশ। স্থানীয় পর্যায়ে মূসক খাতে আদায় হয়েছে ৩৩ হাজার ৪৪৫ কোটি টাকা, প্রবৃদ্ধি হয়েছে দশমিক ০৩ শতাংশ। এ ছাড়া আয়কর ও ভ্রমণ করখাতে রাজস্ব আহরণ হয়েছে ২৫ হাজার ৯৩৩ কোটি টাকা।

এ খাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪ দশমিক ২২ শতাংশ। বৈঠকে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা সামনে নিয়ে সবাইকে কাজ করতে বলা হয়।

এ ছাড়া বৈঠকে কাস্টমস এক্সাইজ ও ভ্যাট আপিলাত ট্রাইব্যুনালে দায়েরকৃত মামলার অনিষ্পত্তিকৃত তালিকা জরুরি ভিত্তিতে অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের কাছে পাঠাতে বলা হয়।

সেখানে অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের সিনিয়র সচিব আবু হেনা মো. রহমাতুল মুনিম অধিক সংখ্যক মামলা অনিষ্পত্তি থাকার কারণ জানতে চান কাস্টমস এক্সাইজ ও ভ্যাট আপিলাত ট্রাইব্যুনালের প্রেসিডেন্টের কাছে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে প্রেসিডেন্ট বলেন, ১৯৯৬ সালে ট্রাইব্যুনাল সৃষ্টির পর থেকে মামলা অনিষ্পত্তি রয়েছে। এ পর্যন্ত সব মামলার তালিকা করা হয়েছে। পুরোনো মামলাগুলো বিচারের জন্য বিভিন্ন বেঞ্চে দেওয়া হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত ডিসেম্বর মাসের প্রথমে অনিষ্পত্তি মামলার সংখ্যা পাওয়া গেছে ৭ হাজার ৫২টি। ওই মাসে নতুন মামলা দায়ের করা হয়েছে ৮৬টি। একই মাসে নিষ্পত্তি হয়েছে ১৪২টি মামলা। মাস শেষে অনিষ্পত্তি মামলার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭ হাজার ১১টি।

পাশাপাশি ট্যাক্সেস আপিলাত ট্রাইব্যুনালে ডিসেম্বরে শুরুতে অনিষ্পত্তির মামলা ছিল ১৫৬৯টি। ওই মাসে নতুন মামলা হয়েছে ৭১১টি এবং নিষ্পত্তি হয়েছে ৬১৩টি। মাস শেষে অনিষ্পত্তি মামলার সংখ্যা দাঁড়ায় ১৬৬৭টি।

বৈঠকে এসব মামলা আরও দ্রুত নিষ্পত্তির বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। এটি বাস্তবায়নের নির্দেশ দেওয়া হয় কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট আপিলাত ট্রাইব্যুনালের প্রেসিডেন্টকে।

জানা গেছে, জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের সব নীতিমালা ডিজিটাল পদ্ধতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সংশোধনের মাধ্যমে যুগোপযোগী করতে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। ওই কমিটি ইতোমধ্যে সাতটি বৈঠক করেছে। ওই সভায় বিষয়টি আরও একটি বৈঠকের মাধ্যমে চূড়ান্ত করে অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগে পাঠানোর জন্য নির্দেশ দেওয়া হয় সরকারের গঠিত কমিটিকে।