প্রশান্ত কুমার হালদার (পিকে) [ফাইল ছবি]

 বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বে থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ ও পাচারে জড়িত ছিলো প্রশান্ত কুমার হালদার (পিকে) ও তার সহযোগীরা। তারা কিভাবে বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট করেছেন সে সংক্রান্ত বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) ও দুদকের নথি এবার উঠছে হাইকোর্টে। ইতিমধ্যে বিএফআইইউ তাদের নথি অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ে দাখিল করেছেন। দুদকও নথি দাখিলের প্রস্তুতি নিয়েছে।

গত সপ্তাহে অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ে দাখিল করা বিএফআইইউর নথিতে পিকে হালদার ও তার ৮৩ সহযোগী এবং ৪৩ টি নাম সর্বস্ব প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ দিয়ে একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ ও পাচারের বিস্তারিত তথ্যও উঠে এসেছে। এসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব ইতিমধ্যে ফ্রিজ অবস্থায় রয়েছে।

বিএফআইইউ তার গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলেছে, ২০১৫ সালে ন্যাচার এন্টারপ্রাইজ লি., বিআর ইন্টারন্যাশনাল লি., নিউ টেক এন্টারপ্রাইজ লি. ও হাল ইন্টারন্যাশনাল লি. নামের প্রতিষ্ঠানসমূহ কর্তৃক আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল লিজিং এন্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লি. অধিগ্রহণের পরবর্তী ৩/৪ বছরে দুর্নীতি, জালিয়াতি ও নানাবিধ অনিয়মের মাধ্যমে নামসর্বস্ব ও কাগুজে প্রতিষ্ঠানের ঋণের নামে লেয়ারিংয়ের মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও ক্যাপিটাল মার্কেটে ২ হাজার ৪৬৭ কোটি টাকা সরিয়ে নিয়ে আত্মসাৎ করা হয়। যা আর্থিক প্রতিষ্ঠানটি কর্তৃক বিতরণকৃত মোট ঋণের ৩ হাজার ৬৩৪ কোটি টাকার। অর্থাৎ ৬৭ দশমিক ৯১ ভাগ। এ বিষয়ে গোয়েন্দা প্রতিবেদনে ৪৩টি ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠানের নামে প্রদানকৃত ঋণের অর্থের গতিপথসহ প্রকৃত সুবিধাভোগীদের বিষয়ে উল্লেখ রয়েছে।

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, সার্বিক পর্যালোচনায় ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের পরিচালনা পর্ষদ, শীর্ষ ব্যবস্থাপনা, অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা বিভাগ, চিফ ফাইন্যান্সিয়াল অফিসার, ক্রেডিট ডিভিশনের কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় পিকে হালদার ও তার সহযোগীরা ৮৩ ব্যক্তির ঋণের আড়ালে নানাবিধ অনিয়ম, দুর্নীতি ও জালিয়াতির মাধ্যমে আর্থিক প্রতিষ্ঠানটির দুই তৃতীয়াংশের বেশি অর্থ আত্মসাৎ করেছেন।

এই দুর্নীতি ও জালিয়াতি মানি লন্ড্রারিং প্রতিরোধ আইনে সম্পৃক্ত অপরাধ। বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদার ও বিচারপতি মহি উদ্দিন শামীমের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চে আগামী ২০ জানুয়ারি এই গোয়েন্দা প্রতিবেদনের উপর শুনানি অনুষ্ঠিত হবে।

চারটি নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে পিকে হালদার ও তার সহযোগীদের আত্মসাৎ করা অর্থের পরিমাণ হাজার হাজার কোটি টাকা। এই চার প্রতিষ্ঠান হলো

ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেড, ফাস ফাইন্যান্স, পিপলস লিজিং ও রিলায়েন্স ফাইন্যান্স। নিজ আত্মীয়-স্বজন ও সহযোগীদের দ্বারা নাম সর্বস্ব প্রতিষ্ঠান তৈরি করে তিনি এই অর্থ আত্মসাৎ করে কানাডায় পালিয়ে যান। হাজার হাজার কোটি টাকা কানাডা, সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন দেশে পাচার করেন। এসব প্রতিষ্ঠানের অর্থ পাচার নিয়েও তদন্ত অব্যাহত রেখেছে দুদক ও বিএফআইইউ।

এদিকে পাচারের অর্থে কানাডায় বিলাসী জীবন যাপন করছেন। খুলেছেন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানও। বিদেশে অবস্থান করা পিকে হালদারকে দেশে ফেরাতে দুদকের পদক্ষেপ কি তা জানতে চায় দেশের উচ্চ আদালত। বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদারের নেতৃত্বাধীন ডিভিশন বেঞ্চের এমন আদেশের পর দুদকসহ সকল সরকারি সংস্থা পিকে হালদারকে দেশে ফেরাতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়। এরই মধ্যে দুদকের দুর্নীতির মামলায় তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ কেএম ইমরুল কায়েশ। ঐ পরোয়ানার অনুলিপি ও পিকে হালদারের অপরাধের যাবতীয় নথি দুদক থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। সেখান থেকে সেসব নথি পাঠানো হয় ফ্রান্সের লিয়নে ইন্টারপোলের সদর দপ্তরে। এরপরই পিকে হালদারের বিরুদ্ধে রেড নোটিশ জারি করে ইন্টারপোল। পাশাপাশি পিকে হালদারের অর্থ পাচারের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে ২৫ নাগরিকের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে হাইকোর্ট।

ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল একেএম আমিনউদ্দিন মানিক ইত্তেফাককে বলেন, বিএফআইইউর প্রতিবেদন পেয়েছি। এফিডেভিট আকারে তা হাইকোর্টে দাখিল করা হবে। তিনি বলেন, তথ্য উপাত্তে যাদের নাম এসেছে তার ভিত্তিতে হাইকোর্ট যে নির্দেশনা দেবে তাতে অর্থনৈতিক অপরাধ কমে আসবে বলে মনে করি।