পরিচালনা পর্ষদ সদস্যদের সরাসরি সম্পৃক্ততায় পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেসে জালিয়াতি হয়েছে। অধিকাংশ ঋণেই প্রতিষ্ঠানটির পরিচালকরা বিভিন্নভাবে জড়িত। এক্ষেত্রে নিজের অথবা তাদের প্রতিষ্ঠানের নামে, ব্যাংক গ্যারান্টি এবং স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নামে এ ঋণ নেওয়া হয়েছে।

 আর সর্বশেষ হিসাবে ঋণের নামে এক হাজার ৮৩৮ (প্রায় দুই হাজার) কোটি টাকা আ ত্মসাৎ করা হয়েছে। বর্তমানে এর প্রায় পুরোটাই কুঋণ। আদালতের নির্দেশে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে নিয়োগ দেওয়া নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান-একনাবিন চার্টার্ড অ্যাকাউট্যান্টের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য।

ওই প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বেশকিছু প্রভাবশালীর নাম উঠে এসেছে। একই ব্যক্তি বারবার ঋণের নামে টাকা আ ত্মসাৎ করেছেন। ইতোমধ্যে পুরো প্রতিবেদন আদালতে জমা দেওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির ২৮০ জন ঋণখেলাপিকে তলব করেছেন উচ্চ আদালত। আজ যাচ্ছে ১৪৩ জন। ২৫ ফেব্র“য়ারি ১৩৭ জন যাওয়ার কথা রয়েছে।

একনাবিনের প্রতিবেদন অনুসারে প্রতিষ্ঠানটির মোট ঋণের স্থিতি দাঁড়ায় এক হাজার ৮৩৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে মেয়াদি আমানত ৯৯১ কোটি ৩৯ লাখ টাকা, লিজ অর্থায়ন ১০৮ কোটি চার লাখ, আবাসন ঋণ ৩৩ কোটি, বিভিন্ন জায়গায় বিনিয়োগ ২৬ কোটি এবং অন্যান্য সম্পদ ৬৭৭ কোটি টাকা।

আর সব মিলিয়ে প্রতিষ্ঠানটির প্রভিশন ঘাটতি ৪১৬ কোটি টাকা। এসব অনিয়মের সঙ্গে পরিচালক বিশ্বজিৎ কুমার রায়, উজ্জ্বল কুমার নন্দী, আরেফিন শামসুল আলামিন, ক্যাপ্টেন (অব.) এম মোয়াজ্জেম হোসেন, মতিউর রহমান, কবির উদ্দিন মিয়া ও সিরাজুল ইসলাম মোল্লার বেশি সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। শুধু তাই নয়, পরিচালকরা বোর্ড মিটিংয়ের সম্মানি হিসাবে প্রায় ৪০ লাখ টাকা নিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

উল্লেখ্য, দেশের আর্থিক খাতে বহুল সমালোচিত পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেসের বর্তমান পরিচালকদের যোগসাজশে প্রতিষ্ঠানটির উল্লিখিত অনিয়মের সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর এস কে সুর চৌধুরী, বর্তমান নির্বাহী পরিচালক শাহ আলমের জড়িত থাকার প্রাথমিক প্রমাণ মিলেছে। ইতোমধ্যে সুর চৌধুরী ও শাহ আলমের ব্যাংক হিসাব তলব করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড।

এ ছাড়া রিলায়েন্স ফাইন্যান্সের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) প্রশান্ত কুমার হালদার, কোম্পানির চেয়ারম্যান উজ্জ্বল কুমার নন্দী, সাবেক এমডি ড. ইউসুফ খান, বর্তমান এমডি সামি হুদা, শেখর কুমার হালদার, সুকুমার মৃধা, অমিতাভ অধিকারী ও কাজী আহমেদ জামালের জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে।

এরা সবাই বাংলাদেশ ব্যাংকের মহাব্যবস্থাপক শাহ আলমের ছত্রছায়ায় অবৈধ ও দুর্নীতির মূল কাজগুলো করেন। একই ব্যক্তিরা ইন্টারন্যাশনাল লিজিং, ফাস ফাইন্যান্স, বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানিসহ অনেক কোম্পানির পরিচালক হিসাবে বহাল আছেন, যা আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইনের পরিপন্থি বলে মন্তব্য করেন সংশ্লিষ্টরা।

একনাবিনের প্রতিবেদন অনুসারে পরিচালকদের সুপারিশে যেসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দেওয়া হয়েছে সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো : এসএ এন্টারপ্রাইজ, বিশ্বজিৎ কুমার রায়, আরেফিন শামসুল আলামিন, মতিউর রহমান, ইন্দ্রজিৎ কুমার রায়, শিল্পী রানী রায়, গুলজার হোসেন রাজ, আরএমএস ফুড প্রোডাক্ট, জেনিথ হোল্ডিংস লিমিটেড. জেইফার হোল্ডিংস লিমিটেড, রনবীর কুমার রায়, সাগর ট্রেডিং, শপার ওয়ার্ল্ড লিমিটেড, ম্যাগলিফিসিও ইটালিনো, ইউরো ট্রেডিং, সিমফোনি ট্রেডিং, মতিউর রহমান, ফুয়াদ স্পিনিং এবং এসএ স্পিনিং উল্লেখযোগ্য।

প্রতিবেদনে তিন শতাধিক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে ঋণখেলাপি হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তাদের ঋণের অধিকাংশই কুঋণ। এসব খেলাপির মধ্যে রয়েছে-ডিজিটন অডিট লিমিটেড, স্মরণিকা গার্মেন্টস লিমিটেড, স্মরণিকা ফ্যাশন ওয়্যার, এলআর ইন্টারন্যাশনাল, নুরুল আমিন খান, হাবিব উদ্দিন, সিয়াম ডিজাইন এমব্রয়ডারি, খোন্দকার আব্দুল মুবিন, মেসার্স মিলন এন্টারপ্রাইজ, শহিদুল ইসলাম, সাইফুদ্দিন মাহমুদ, সিরাজুল ইসলাম, এলএন রিসার্স অ্যানলাইসিস, মেসার্স মার্লিন বিজনেস ইন্টারন্যাশনাল, মুফিদ ইসলাম, এম সিরাজুল ইসলাম, মেসার্স গিফট প্যালেস, শাহ আলম, মেসার্স এম্প্রয়ার ফুড, কিউসি হোল্ডিংস, ক্রিয়েটিভ ইন্টারফেস, মশিউর রহমান রনি, কেএম খায়রুল বাশার, ঢাকা ডাইং অ্যান্ড ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি বিশ্বজিৎ কুমার রায়, দিলারা আফরোজা, আব্দুস সালাম দেওয়ান, জয়সুন ফার্মা, শেখ নুরুল ইসলাম, শোভা ইন্টারন্যাশনাল, ফোনিক্স হ্যাচারি লিমিটেড, মাহবুব মুসা, ওফাজ উদ্দিন স্পিনিং মিল, ডিচি নিটিং, ফারজানা মজুমদার, তানিয়া বেগম, বিল্ড ট্রেড ফয়েলস লিমিটেড, হাজী মোহাম্মদ গোলাম মোস্তফা, মেসার্স জিএম সিফুড প্রসেস, মেসার্স সিমকন ইন্টারন্যাশনাল, মো. শফিকুল ইসলাম ভুঁইয়া, শিরিন আক্তার, মেসার্স এক্সিলেন্ট বিল্ডার্স লিমিটেড, বিক্রমপুর কার ডেকোরেশন, টিপু সুলতান, নাহার ইন্টারন্যাশনাল ট্রেডিং, মেসার্স হিল ফার্মা, জিফার হোল্ডিং, জেনিথ হোল্ডিং, মেসার্স জেডি এন্টারপ্রাইজ, স্পিন অ্যান্ড ওয়েব, মেসার্স এম আর ডাইং অ্যান্ড ফিনিশিং, মো. সাঈদ হোসাইন, এম কাইয়ূম, স্টার নিটওয়্যার প্রা. লিমিটেড, গোল্ডেন বাংলা ইন্ডাস্ট্রি পার্ক লিমিটেড, সাবিহা মতিন, নাসির উদ্দিন, সাইদুর রহমান, কায়জার খান, তোফাজ্জল হোসেন, মেসার্স নাহার ইন্টারন্যাশনাল ট্রেডিং, ক্যাপ্টেন রেজাউর রহমান, মিসেস নাফিসা আলী, মেসার্স অহনা জুয়েলার্স, শাসমুল হক, মিসেস আফরোজা হক, ইনট্রাকো সিএনজি, দিদারুল গনি, সামিউল হক, শ্রীদম দাস, মেজবাহ উদ্দিন মাহমুদ, জামিল উদ্দিন ভূঁইয়া, গ্রেট ওয়ালস ল্যান্ড প্রপার্টি, কর্নপুর অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রি, মাজহারুল হক, দাহি উল হক, আব্দুল বাসেত, মাসুদুল আলম, বাঁধন ফুড ইন্ডাস্ট্রি, শাহরিয়ার হাসান উল ইসলাম, আফরোজা ইসলাম, ন্যাশনাল হ্যাচারি, গুলজার হোসেন রাজ, গাজীপুর এন্টারপ্রাইজ, শাইলা নুরুল্লাহ, সোহাইল হাসান নুরুল্লাহ, পারটেক্স জুট মিলস, ইনস্টিটিউট অব টুরিজম, এলাইড সোলার এনার্জি, মেসার্স ফিদা এন্টারপ্রাইজ, আরএমএস ফুড প্রডাক্টস, ইনস্টিটিউট অব টুরিজম হোটেল, শরিফ আশরাফুল মতিন, সিনার্জিক বাংলাদেশ, মতিউর রহমান, ড. মো. রুহুল আমিন, মুক্তাগাছা অয়েল মিল, পিংকি চলচ্চিত্র, ক্যাপ. ওয়ার্ল্ড বিডি, দ্য প্যাট্রিয়ট, স্টিচেস ফ্যাশন হাউজ ও সচেতন হ্যান্ডিক্রাফট।