নারী মঞ্চের আলোর স্ফুলিঙ্গ ছড়িয়েছে দিক-দিগন্তে। দীপ্যমান আলোয় দৃশ্যমান হয়েছে আমাদের সমাজের প্রতিটি কোণ। আলোকিত হয়েছে আমাদের সমাজ ব্যবস্থা। প্রোজ্জ্বল হয়েছে নারীর কর্মের পরিধি। সর্বাধিক চ্যালেঞ্জিং পেশা আইনঙ্গনে নারীর পদচারণায় মুখরিত বিচারঙ্গন। তবে অভিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাতে ধাপে ধাপে কষ্টের করুণ কাহিনী অনেক ক্ষেত্রে অদৃশ্যমান আর চাপাই থাকে। এরপরেও আমাদের বিচারঙ্গনের ১৭ বিজ্ঞ বিচারকগণের মধ্যে শত ৩০ জন বিচারকগণ বিচারকার্য পরিচালনা করছেন। এমনভাবে অভিব্যক্তি প্রকাশ করছিলেন ১৩ বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশনের সুপারিশ প্রাপ্ত সহাকরী জজ আয়েশা সিদ্দিকা

সত্যিকার্থে আমাদের সমাজব্যবস্থায় একজন নারীকে আসলে পদে পদে হোঁচট খেয়ে অগ্নি পরীক্ষার মাধ্যমেই সামনে এগুতো হয়। আর সেটা যদি হয় আইনপেশা কিংবা বিচারকার্যের মতো চ্যালেঞ্জিং পেশা সেটা নিঃসন্দেহেই কঠিন ব্যাপার।

সমাজের আনাচে কানাচে আজও অনেকের বদ্ধমূল ধারণা মেয়েরা কেন আইনঙ্গনে? এমন ধারণা যে ইনাদিংকালের তা কিন্তু নয়। যদিও আইনঙ্গনে নারীরা থাকতে পারবেন না এমন কোনো আইনগত বিধান নেই। তাই এমন ধারণার মূলে কুঠারাঘাতে করে ইংল্যান্ডের আইন বিশেষজ্ঞরা ১৯২৩ সালে এপ্রিল মাসের দুই তারিখে The Legal practioners (women) Act, 1923, ১৯২৩ নামে একটি আইন প্রনয়ন করেন। এই আইনের এর প্রথম প্যারায় বলা হয়েছে, An Act for the removal of doubts regarding the rights of woman to be enrolled and practice as a legal practioners’ এবং আমাদের The Bangladesh legal practioners and Bar council order, 1972 এর অনুচ্ছেদ ২৮ এ বলা হয়েছে- No woman shall be disqualified for admission to be an advocate for reason of her Sex’

সুতরাং আইনটির প্রারম্ভিক আলোচনায় প্রতীয়মান হয়েছে কতটা বাধা বিপত্তি আর অজ্ঞতা থাকলে এমন বিষয়গুলো ফুটে উঠতে পারে। তবে মেয়েরা আইনজীবী হতে কোন সমস্যা আছে সেই ধারণা অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত এই পেশায় আসতে একজন মেয়েকে অনেক ঘাম ঝরাতে হয়-বলছিলেন ঢাকা জজ কোর্টের আইনজীবী তৌফিকা ইয়াসমিন সোহেলী।

‘দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় নানা ঘাত প্রতিঘাত সহ্য করে হলেও আজ আমাদের নারী সমাজ সম্মুখ সারিতে রয়েছেন। এই সমাজে পুরুষের ক্ষেত্রে যেমন দৃষ্টিভঙ্গি থাকে আমাদের ক্ষেত্রে ঠিক সেই রকম হয় না। অনেক মেয়েই সৌভাগ্যবশত পরিবারকে পাশে পেলেও অনেকেই আবার একলা পথে সংগ্রাম করে সামনে এগোতে হয়। বিশেষত, আমরা যারা আইনঙ্গনে আছি তাদের অবস্থা খুবই বেদনাদায়ক। অবশ্য প্রাথমিক অবস্থায় খুবই কষ্টকর হলেও কিছুটা সময় পরে পেছনে ফিরে দেখতে হয় না। এই পেশায় প্রতিষ্ঠিত যে সকল বিজ্ঞ আইনজীবী রয়েছেন ওনাদের উদার দৃষ্টিভঙ্গি এবং সার্বিক সহযোগিতায় আমাদের পথচলা আর বেগবান হবে বলে আমরা মনে করি।’ কথা গুলো বলছিলেন, শিক্ষানবিশ আইনজীবী মরিয়ম আক্তার ও রেশমা খাতুন।

আইনঙ্গনে নারীদের পদচারণার বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদের সাবেক ডিন প্রফেসর ড. রেবা মণ্ডল বলেন, ‘ নারী মানুষ আর পুরুষ এই নিয়ে মনুষ্য জাত। আজ পর্যন্ত কোনো গবেষণা প্রতিষ্ঠান বা কোনো বিজ্ঞানী বলেনি যে নারীর মেধা জন্মগতভাবে পুরুষের চেয়ে কম। বাংলাদেশ, ভারত, শ্রীংলকা, আমেরিকাসহ সব উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশে নারীরা অত্যন্ত মেধা, দক্ষতা ও যোগ্যতার পরিচয় দিচ্ছেন। পারিপার্শ্বিক বিষয়ে নারীরা এগিয়ে এসেছে পুরুষের মতো সমান তালে। ক্লারা জেসকিন, ইন্দিরা গান্ধী, শ্রীমাভো বন্দর নায়েক, দেশরত্ন শেখ হাসিনা, শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি আমাদের নারীদের অনুপ্রেরণার জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত। আইনঙ্গনেও রয়েছে নারীদের ভূমিকা। দেশের প্রথম স্পিকার ড. শিরিন শারমিন চৌধুরী, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আইনজীবী সাহারা খাতুন, বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত আইনজীবী তাহমিনা ওয়াটসনসহ অসংখ্য নারী বিচারপতি ও নারী শিক্ষকবৃন্দ দেশের উন্নয়নে অবদান রেখে চলেছেন। নারী-পুরুষ ভেদাভেদ ভুলে মানব জাতি আরও সমৃদ্ধ ও উন্নত সভ্যতা গড়ে তুলতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করতে হবে।’