মোঃ নাদিম হোসেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জ :

বর্তমান সময়ে নিরাপদ আম উৎপাদনের প্রতিযোগিতা চলছে দেশব্যাপী। নিরাপদ আম উৎপাদন ছাড়াও আমের বাহ্যিক সৌন্দর্য বাড়ানো, কৃষকদের কীটনাশক প্রয়োগ বাবদ খরচ কমানো ও বিদেশে রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদনের লক্ষ্যে আমের রাজধানীখ্যাত জেলা চাঁপাইনবাবগঞ্জে প্রতিবছর বাড়ছে ফ্রুট ব্যাগিংয়ের ব্যবহার। শতভাগ নিরাপদ আম উৎপাদনের উপায় হওয়ায় জনপ্রিয় হয়ে উঠছে ফ্রুট ব্যাগিং। জেলায় এবছর প্রায় ৮ কোটি আমে ফ্রুট ব্যাগিং করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে কৃষি বিভাগ। তবে আমচাষীদের বাড়তি চাহিদাকে পুঁজি করে বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি ও নিম্নমানের ফ্রুট ব্যাগ সরবরাহ করার অভিযোগ কৃষকদের। গতবছরের ন্যায় এই মৌসুমেও মানসম্মত ব্যাগ না পাওয়ায় চাহিদা মতো আমে ব্যাগিং করতে পারেননি চাঁপাইনবাবগঞ্জের কৃষকরা।
জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে দুর্যোগ, ফরমালিনের অভিযোগে বিপুল পরিমাণ আম নষ্ট এবং নিরাপদ আম উৎপাদন নিশ্চিত না হওয়ায় বিদেশে আম রফতানি বন্ধ রয়েছে। সেই সাথে প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাস সংক্রমণের পরিস্থিতি মিলিয়ে চিন্তা নিয়ে আম উৎপাদন, পরিচর্যা ও বাজারজাত করতে হচ্ছে জেলার আমচাষীদের। বাম্পার ফলনেও আশাবাদী হতে পারেন না কৃষকরা। তবে গত কয়েক বছরে ফ্রুট ব্যাগিং পদ্ধতি ব্যবহার করে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টায় রয়েছেন তারা।
পোকা-মাকড় দমনে কীটনাশকের মাধ্যমে পরিচর্যার বিকল্প হিসেবে দেশের বাজারে এ পদ্ধতির আম চাহিদা থাকায় বিক্রি বাড়ে। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে জনপ্রিয় এ পদ্ধতির প্রধান উপকরণ ফ্রুট ব্যাগ সংকট দেখা দিয়েছে। ব্যাগের সিংগভাগই চীন থেকে আমদানি হওয়ায় মূলত এ বছর ব্যাগের সংকট দেখা দেয়। এতে করে অনেক আম চাষি নিরাপদ আম উৎপাদনে ব্যর্থ হয়েছেন। আবার এ সুযোগে অনেকে ব্যাগের দাম বাড়িয়ে কৃষকদের সমস্যায় ফেলেছেন।
চলতি বছর চাঁপাইনবাবগঞ্জে প্রতি পিস ফ্রুট ব্যাগ বিক্রি হচ্ছে ৩ টাকা ৫০ পয়সা থেকে ৭ টাকা পর্যন্ত। অভিযোগ উঠেছে, আমচাষীদের চাহিদাকে পুঁজি করে নিম্নমানের ফ্রুট ব্যাগ বাজারজাত করে সাধারণ কৃষকদের ঠকাচ্ছে মধ্যস্বত্বভোগীরা। তাই কৃষকদের দাবি, ফ্রুট ব্যাগ ও তার কাঁচামালকে প্রকৃত কৃষিজাত পন্য হিসেবে ঘোষণা করে অধিক হারে বাজার মনিটরিং করার। এতে একদিকে যেমন নিরাপদ আম উৎপাদন নিশ্চিত সম্ভব হবে, তেমনি অন্যদিকে লাভবান হবে আমচাষী, ব্যবসায়ী ও রফতানিকারকরা।

গত মঙ্গলবার গোমস্তাপুর উপজেলার চৌডালার একটি আমাবাগানে দেখা যায়, ১৫-১৬ জনের একটি দল ব্যস্ত সময় পার করছে আমে ফ্রুট ব্যাগিং করতে। বাগান মালিক আব্দুল কাদের জানান, গত ১০ বিঘার একটি বাগান নিয়েছি। ফজলি, আশ্বিনা, ল্যাংড়া, খিরসাপাত জাতের আম রয়েছে। এসব আমে গত ৩ দিন থেকে ফ্রুট ব্যাগিং করছি। এতে আমে কোন দাগ থাকে না, বিষ দিতে হয় না, আমের কালারও খুব ভালো আসে।
প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাস সংক্রমণের কারনে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ। তাই স্থানীয় এক দশম শ্রেণী পড়ূয়া শিক্ষার্থী সাকিব আলী ফ্রুট ব্যাগিং করার কাজ করছে। সাকিব জানায়, বড় মই ও গাছের ডালে উঠে সবগুলো আমে ব্যাগ পরিয়ে দিচ্ছি। এতে সামান্য কিছু আম ঝরে পড়লেও এটি অত্যান্ত লাভজনক, তাই অনেক বাগান মালিক করে থাকে। এই কাজ বাবদ প্রতিদিন ১৫০ টাকা মজুরি পায় সাকিব।
আমচাষী ও চাঁপাই ম্যাংগো’র ব্যবস্থাপক শহিদুল হক হায়দারী জানান, গতবছরের মতো এবছরও আমচাষীদের চাহিদাকে পুঁজি করে একশ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে দাম বাড়িয়েছে। জেলার বেশিরভাগ আমচাষী অশিক্ষিত বা স্বল্প শিক্ষিত হওয়ায় তারা মানসম্মত ফ্রুট ব্যাগ চেনেন না। সেই সুযোগে মানহীন, অকার্যকর ফ্রুট ব্যাগ বাজারজাত করে এসব অসাধু ব্যবসায়ী। তিনি আরো বলেন, শিবগঞ্জ উপজেলায় গতবছর ফ্রুট ব্যাগ ব্যবহার করা হয়েছে এমন অনেক আমে এর কোন প্রভাব পড়েনি। অর্থাৎ মানসম্মত না হওয়ায় ব্যাগিং করা ও না করা আমের মধ্যে তেমন পার্থক্য দেখা যায়নি। বাজার মনিটরিং বাড়ানোর উপর গুরুত্ব দেন তিনি।
শিবগঞ্জ ম্যাংগো প্রডিউসার কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিডেটের সাধারণ সম্পাদক ও আম রফতানিকারক ইসমাঈল খান শামিম জানান, ফ্রুট ব্যাগিং পদ্ধতিতে উৎপাদিত আম বিদেশে রপ্তানিযোগ্য ও শতভাগ নিরাপদ। কিন্তু বাজারে থাকা মানহীন ব্যাগের কারনে তা সম্ভব হয় না। ফ্রুট ব্যাগিং পদ্ধতি চালুর পর আমের ওজন ১০০ গ্রাম হলেই আমে ব্যাগ পরানো হয়। এতে করে কৃষক অন্তত ১০ বার কীটনাশক প্রয়োগের হাত থেকে রক্ষা পায়। এছাড়াও ব্যাগিং করা আম আকর্ষণীয়, দাগহীন ও পুরোপুরি কীটনাশকমুক্ত হয়।  তাই আমচাষী, ব্যবসায়ী, রফতানিকারক ও ভোক্তার স্বার্থে ফ্রুট ব্যাগিং-কে কৃষি পণ্য ঘোষণা করার দাবি জানান তিনি।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ আঞ্চলিক উদ্যানতত্ব আম গবেষণা কেন্দ্রের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা আবু সালেহ মোহাম্মদ ইউসুফ আলী জানান, আমের ওজন ৬০-১০০ গ্রাম হলে ফ্রুট ব্যাগ করার উপযুক্ত সময়। এতে ব্যাগিং করা আমটি অধিক পরিমানে হলুদ রং ধারণ করে। তবে আম ফ্রেস রাখতে চাইলে ৫০ গ্রাম ওজনের সময় ফ্রুট ব্যাগিং করতে হবে। কৃষক ভাইয়েরা সাধারণ রোগবালাই-ছত্রাক দমন করতে ১২-১৫ কীটনাশক-ছত্রাকনাশক ব্যবহার করে। কিন্তু ফ্রুট ব্যাগিং করার ফলে আর কোন কীটনাশক-ছত্রাকনাশক ব্যবহার করতে হবে না এবং খরচও অনেক কমে যাবে। এমনকি আমগুলো পাকার পরে পেড়ে কোনো ক্ষতিকর রাসায়নিক ছাড়াই সংরক্ষণ করা যাবে ৯ থেকে ১৪ দিন পর্যন্ত।
এই বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা আরো জানান, আম পরিপক্ক হওয়ার আগে-পরে প্রচুর পরিমানে বৃষ্টি হয়। এতে আমের গায়ে ছত্রাক দেখা দেয়। ফ্রুট ব্যাগিং করলে তা হওয়ার কোন সুযোগ নেই। বিশেষ ধরনের কাগজের এই ব্যাগে দুটি আস্তরণ রয়েছে। বাইরের আস্তরণটি বাদামী রঙের, আর ভেতরেরটি কালো রঙের।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রশিক্ষণ কর্মকর্তা ড. বিমল কুমার প্রামানিক  বলেন, গতবছর জেলায় সাড়ে ৭ কোটি আমে ফ্রুট ব্যাগিং করা হয়। এবছর তা বেড়ে পৌণে ৮ কোটি থেকে ৮ কোটি আমে ফ্রুট ব্যাগিংয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে কৃষি বিভাগ। ফ্রুট ব্যাগিংয়ের ফলে আমের বাহ্যিক রং খুব আকর্ষনীয় হয়। এতে ক্রেতারা আকৃষ্ট হয়। এছাড়াও শতভাগ নিরাপদ আম উৎপাদন নিশ্চিত হয়।
উল্লেখ্য, চাঁপাইনবাবগঞ্জের পাঁচ উপজেলায় এবছর প্রায় ৩৪ হাজার হেক্টরের অধিক জমিতে আমবাগান রয়েছে। এসব আম বাগানে প্রায় ২৭ লক্ষ গাছ থেকে আড়াই লক্ষ মেট্রিক টন আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে কৃষি বিভাগ।