• মঙ্গলবার, ১৮ জুন ২০২৪, ১২:২০ অপরাহ্ন

‘কোথাও কেউ নেই’ নাটকটি এখন প্রচার হলে আগের জনপ্রিয়তা পেতো না

আপডেটঃ : রবিবার, ১৪ জানুয়ারী, ২০১৮

মাসউদুল হক। বাংলাদেশ টেলিভিশনের মহাব্যবস্থাপক। বছরজুড়ে অগণিত স্যাটেলাইট চ্যানেলের ভিড়ে বিটিভির একাধিক অনুষ্ঠান নিয়েও দর্শক কৌতুহল আজো সবচেয়ে বেশি। কারণ শহুরে দর্শকদের পাশাপাশি কোনো কোনো প্রান্তিক জনগোষ্ঠির এখনো একমাত্র বিনোদন বিটিভি। জনপ্রিয়তার দৌড়ে কোথায় আছে? কিংবা আজকের স্যাটেলাইট, ইউটিউব, ফেসবুকসহ বিনোদনের নানা অনুসঙ্গে বিটিভির আগামী উদ্যোগ কী? বিটিভির ৫৩ বছরপূর্তি অনুষ্ঠানে কথা বললেন বিনোদন প্রতিদিনের সাথে। সাক্ষাত্কার নিয়েছেন তারিফ সৈয়দ।
বিটিভির প্রতি দর্শকদের আগ্রহের জায়গাটা কোন অবস্থানে এখন বলে মনে করেন আপনি?
দেখুন, এই ‘জনপ্রিয়তা’ শব্দটি নিয়েই আমার আপত্তি রয়েছে।  বিটিভিকে অন্য স্যাটেলাইট চ্যানেলের সাথে তুলনা করলে হবে না। আমরা প্রত্যেকে এই ভুলটিই করি। অন্য চ্যানেলকে সবসময় বাণিজ্যিক দিক বিবেচনা করেই টিকে থাকতে হয়। আমরা কখনো এটাও বলতে পারি না যে, নূন্যতম সামাজিক দায়িত্ব পালন করছি। কারণ আমাদের সামাজিক দায়িত্ব পালন করাটাই  মূল লক্ষ্য। বাকিটা পরের বিষয়। আমরা দর্শকদের রুচিকে অনুসরণ করি না। দর্শকদের কোন রুচিতে আনা প্রয়োজন সে অনুযায়ী অনুষ্ঠান নির্মাণ করি।
তবে কি স্যাটেলাইট চ্যানেলগুলো বাণিজ্যের বাইরে কোনো সোশ্যাল কমিটমেন্ট রাখে না?
দেখুন, বিষয়টি আমি আরো সহজ করে বলি, একটি স্যাটেলাইট চ্যানেলকে কখনো চাকমা, মারমা বা প্রান্তিক জনগোষ্ঠিকে নিয়ে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে অনুষ্ঠান প্রচার করতে হয় না। তাদের সেই অনুষ্ঠানের স্পন্সর না হলে তারা সেটা মানসম্পন্ন হলেও অনএয়ার করে না। আমাদের সব শ্রেণির দর্শকদের কথা মাথায় রাখতে হয়। মাদকের ক্ষতিকর দিক নিয়ে বিশেষ নাটিকা প্রচার করতে হয়, পরিবেশ বাঁচাতে গাছ লাগানো কর্মসূচি, শিশুকে সঠিক সময়ে টিকা দেওয়ার যে নোটিশ সেই দায়িত্বও কিন্তু আমাদেরই পালন করতে হয়। এখানে কিন্তু আমরা দায়বদ্ধ। স্যাটেলাইট চ্যানেল এসব সামাজিক প্রচারণার চেয়েও চড়া মূল্যের বিজ্ঞাপনকে প্রাধান্য দেয়। আমরা আলোচনার সময় বিটিভি আর স্যাটেলাইট চ্যানেলকে গুলিয়ে ফেলি। দুটোকে একইভাবে আলোচনায় রাখি। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের রাষ্ট্রীয় চ্যানেলের তুলনায় আনতে বিটিভিকে আপনার শীর্ষ পর্যায়ে রাখতে হবে। কারণ আমরা সেই কৌতুহলটা তৈরি করতে পেরেছি।
কিন্তু এই বোকাবাক্স বা টিভি স্টেশনকে নিয়ে সাধারণ দর্শকরা অতি সমালোচনায় মুখর হওয়ার কারণটা কোথায়? তারা তো দুটো সময়কে তুলনা করেও আলোচনা করে বলে যে, আগের কোথাও কেউ নেই, বহুব্রীহি, হীরামনের মতো মোহমুগ্ধ কাজ আর এখন হয় না—
এখানে আমার খুবই আপত্তি আছে। আমি হলফ করে বলতে পারি, আজকের যুগে ‘কোথাও কেউ নেই’ নাটকটি প্রচার হলেও আগের জনপ্রিয়তা পেতো না। তাকে বাজারের সস্তা, স্থুল পপুলারিটির সাথে ফাইট করতে হতো। তাই আমি আবারো বলছি ‘জনপ্রিয়’ হতেই হবে সেই পণ করে কিন্তু আমরা কাজ করি না। কারণ জনপ্রিয় বিষয়টি কিন্তু উত্কর্ষের সংজ্ঞায় খুবই বিতর্কিত শব্দ।
কারিগরী দিক দিয়ে উন্নত হলেও স্যাটেলাইট চ্যানেলের সাথে বিটিভির নতুন পদক্ষেপগুলো কেমন?
বিটিভি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান। এখানে হুট করে যে কাউকে বাদ দেওয়া যায় না। এখানকার দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদেরও একটা ধারাবাহিকতার ভেতর দিয়ে চলতে হয়। অথচ স্যাটেলাইট চ্যানেলে কোনো অনুষ্ঠান প্রযোজক তার অনুষ্ঠানের কয়েক পর্ব টিআরপিতে না নিয়ে আসতে পারলে তাকে সরিয়ে দিতে পারেন কর্তৃপক্ষ বা বিকল্প কিছু ভাবতে পারেন।
আপনারা কি সেই পরিবর্তনটা আনতে পারেন না। বেশকিছু পরিবর্তন তো লক্ষ্য করছি এখন। নতুন কী পদক্ষেপ নিচ্ছেন?
আমরা এখন চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের ভিত্তিতে বিভিন্ন নতুন ভাবনার অনুষ্ঠান নির্মাণ করছি। এখন অনেকেই বলেন যে, বিটিভি বদলে গেছে। এটাই কিন্তু আধুনিকায়নের অন্যতম উদাহরণ। এছাড়া সবচেয়ে বড় কাজটি হচ্ছে, আমরা বিটিভির সমৃদ্ধ আর্কাইভকে ডিজিটালি সংরক্ষণের কাজ করছি। বিটিভি অফিসিয়ালি ইউটিউবেও অনুষ্ঠান সংরক্ষণ করছে। যা দীর্ঘদিন ধরে বিচ্ছিন্নভাবে অনিয়ন্ত্রিত ছিল।
সম্প্রতি বাংলাদেশ টেলিভিশন ৫৩ বছরপূর্তি উত্সব করলো। মহাব্যবস্থাপক হিসেবে অর্জন-ব্যর্থতার খতিয়ানে কি কিছু বলবেন—
আঙ্গিকগতভাবে অনেক ধরনেরই পরিবর্তন আনা হয়েছে। স্টুডিও সেটে নতুনত্ব আনা হচ্ছে, লাইট বা দৃশ্য ধারণের ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আনছি বিভিন্ন অনুষ্ঠানের উপস্থাপনার বিষয়ে। কারণ এখনকার তরুণ বা নতুন প্রজন্ম কি জানতে চায়, কি জানানো উচিত সেদিকে নজর দিচ্ছি।
নতুন প্রজন্মের বিটিভি কেমন হওয়া উচিত বা কতটাই বা আপনার স্বপ্নের পথ ধরে হাঁটছে এই প্রতিষ্ঠান?
দেখুন, হুট করে বদলাতে চাই না। সেটা আমার, আমাদের কাম্যও নয়। আর শুধু আমার একার স্বপ্নের পথ ধরে কিন্তু বিটিভি হাঁটে না। আমি প্রথমে যে প্রসঙ্গে বললাম। বিটিভি কখনো জনপ্রিয়তার রেসে হাঁটে না, বরং নতুন কিছু উপস্থাপনের দিকনির্দেশনা দেয়। বিটিভি বাংলা ভাষাভাষীর প্রথম কোনো টিভি স্টেশন। তাই হুট করে একটা ঐতিহ্যকে সরিয়ে ফেলে নতুন রঙচঙা পোশাক পরিয়ে দিলে তা আরো হাস্যকর হবে। যেমন কিছুদিন আগে আমাদের বর্ষপূর্তি অনুষ্ঠানে ফেরদৌস ওয়াহিদ যখন মঞ্চে গাইলেন তার বিখ্যাত গান ‘মামুনিয়া’ তখন আমি লক্ষ্য করলাম পুরো অনুষ্ঠানের সবারই শরীরে একটা ছন্দ দোলা দিয়ে গেল। সেটা কয়েক জেনারেশনের গান। বিটিভি তেমনই একটি ঐতিহ্য বাঙালির কাছে। আর এটাকে নিয়ে বাংলাদেশের মানুষরা কথা বলবেই। কারণ বিটিভির মালিক বাংলাদেশের সকল দর্শক। বাংলাদেশের জনগণের ট্যাক্সের টাকাতেই বিটিভি পরিচালিত হয়। তাই এটা ১৬ কোটি মানুষের চ্যানেল। তারা তো বলার অধিকার রাখেন শতভাগ।
আপনার ক্যারিয়ারের দীর্ঘ পথচলায় অনেক ধরনের দায়িত্ব পালন করেছেন। সৃজনের পথে এই দুই যুগেরও বেশি সময়ের ক্যারিয়ারে নিজের কোন পরিচয়ে আপনি বারবার ফিরতে চান?
পুরোটাই তো আমি। ২০১৩ সালে কালি ও কলম-এ যখন তরুণ লেখক পুরস্কার পাই তখন লেখালেখির প্রতি একটা আলাদা দায়িত্বের জায়গা তৈরি হয়। এরপর অনেকগুলো সংস্থাতেই কাজ করেছি। সেখানেও নিজের দায়িত্ব ঠিকভাবে পালনের চেষ্টা করেছি। আমি মনে করি প্রত্যেকের নিজের কাজটি ঠিকমতো পালন করাই দেশপ্রেম। আমাকে অনেকেই বলেন বিটিভির চেহারা বদলে দিয়েছি। কিন্তু আমি বলবো, তেমন কিছু কিন্তু করিনি আমি, আমি শুধু পুরোনো কিছু ভুল সিদ্ধান্ত বন্ধ করেছি। এর ক্ষতিকারক বিষয়গুলোকে আমি দমন করার চেষ্টা করেছি। তরুণ সৃজনশীলদের একাট্টা করার চেষ্টা করেছি রামপুরা ভবনে। এটা এক দু-দিনের কাজ নয়। এর ধারাবাহিকতা রক্ষা করাটাও অনেক বড় বিষয়। তবে কথাসাহিত্যের প্রতি বরাবরের দুর্বলতা আমার রয়েছে।
এত বড় দায়িত্ব সামলে সেই সৃজনের কথা বাঁধতে পারেন?
অবশ্যই, কারণ মনের খোরাকের একটা বিষয় রয়েছে। আমি যখন পণ করেছি যে করেই হোক বিটিভিকে বদলাবোই। কিছুটা হলেও কিন্তু পেরেছি। সেই দৃঢ় প্রতিজ্ঞা আমার লেখালেখিতেও। যেমন কোনো অবসর বা ছুটির দিনে আমি সবকিছু থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে লিখতে বসি। এর কোনো ব্যত্যয় ঘটে না।
আপনাকে ধন্যবাদ
ধন্যবাদ আপনাকে ও ইত্তেফাক পরিবারকে। এদেশের ঐতিহ্যের শব্দস্মারক এই পত্রিকাটি। মূল্যবোধের জায়গায় যে পত্রিকা একচুল সরেনি। তার অগণিত পাঠকের প্রতিও আমার কৃতজ্ঞতা।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরির আরো নিউজ