• বুধবার, ২১ ফেব্রুয়ারী ২০২৪, ০৭:৪৪ অপরাহ্ন

চুল পড়া কমাতে হলে

আল ইসলাম কায়েদ
আপডেটঃ : সোমবার, ৪ ডিসেম্বর, ২০১৭

চুলের ৯৭ শতাংশ প্রোটিন। যথেষ্ট পরিমাণে প্রোটিন গ্রহণ না করলে স্বাভাবিকভাবেই চুল প্রতিদিন পড়ে। সেই সঙ্গে নতুন চুল গজানোর প্রক্রিয়া ব্যাহত হয় এবং চুল রুক্ষ, নিষ্প্রাণ এবং দুর্বল হয়ে পড়ে।

এ সমস্যা থেকে পরিত্রাণের জন্য নিজের খাদ্য তালিকায় যোগ করুন উচ্চমাত্রার প্রোটিনযুক্ত খাবার যেমন, মাছ, ডিম, মুরগি, ডাল জাতীয় শস্য এবং লো ফ্যাট দুগ্ধজাত খাবার। আরও কিছু পুষ্টি উপাদান চুল পড়া কমাতে এবং নতুন চুল গজাতে সাহায্য করে।

আয়রন : এটি কোষে অক্সিজেন সংবহন করে চুলের ফলিকলস পর্যন্ত নিয়ে যায়। অতিরিক্ত আয়রন চুল পড়ার অন্যতম কারণ। পর্যাপ্ত আয়রন পেতে পারেন প্রাণিজ উৎস থেকে। যেমন মুরগি, মাছ, ডিম, গরুর মাংস, গাঢ় সবুজ শাক, অ্যাপ্রিকট, ডাল ইত্যাদি।

ভিটামিন এ : ভিটামিন এ মাথার ত্বকে তেল উৎপাদন করে এবং তা ধরে রাখতে সাহায্য করে। এ-এর অভাবে খুশকি এবং মাথার ত্বকে চুলকানি হয়। মিষ্টি আলু, গাজর, টমেটো, আম, পেঁপে, মিষ্টি কুমড়া, সবুজ শাকসবজি ভিটামিন এ এর উৎস।

ভিটামিন বি : ভিটামিন বি অপুষ্ট চুলের ফলিকলসে পুষ্টি জোগায়। শস্য, ডাল, দুধ এবং দুগ্ধজাত খাদ্য, আলু, বাদাম, সবুজ শাকসবজি এবং মটরশুঁটি ভিটামিন বি-এর অন্যতম উৎস।

ক্যালসিয়াম : ক্যালসিয়াম চুলের বৃদ্ধির জন্য জরুরি খনিজ উপাদান। লো ফ্যাট দুগ্ধজাত খাবার ক্যালসিয়ামের ভালো উৎস। এগুলো উচ্চমাত্রার আমিষেরও উৎস।

জিংক : জিংক এমন একটি খনিজ উপাদান যার অভাব চুল পড়ার অন্যতম কারণ, এমনকি চোখের পাতা পড়ারও। শুষ্ক, রুক্ষ মাথার ত্বকের কারণও এটি। ওয়েস্টার জিংকের অন্যতম উৎস। এছাড়া শস্য, মুরগি, বাদাম, গরুর মাংস, ডাল, মিষ্টি কুমড়ার বীজ এবং ডিমেও জিংক রয়েছে।

মাথার চুল কেন পড়ে

চুলে ৯৭ ভাগ প্রোটিন ও ৩ ভাগ পানি । চুলের যেটুকু আমরা দেখি সেটি মৃত কোষ। কারণ এতে অনুভূতিশীল কোনো কোষ নেই। কোনো কারণে চুলের কিউটিকল নষ্ট হয়ে গিয়ে চুলের কটেক্সের আঁশগুলো খুলে গেলে চুলের আগা ফেটে যায়। এতে চুল শুষ্ক ও ভঙ্গুর হয়ে ওঠে। মূলত সে কারণেই চুল পড়তে থাকে। একজন মানুষের মাথায় গড়ে লাখ থেকে দেড় লাখ চুল থাকে এবং প্রতিটি চুল গড়ে ২ থেকে ৬ বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকে।

বংশগত ও হরমোনজনিত কারণ ছাড়া মাথার চুল পড়লে মনে করবেন আপনার যে কোনো একটি অসুখের লক্ষণ হিসেবে চুল পড়ছে।

চুল পড়ার চক্র

একটা চুল গড়ে ২ থেকে ৬ বছর পর্যন্ত বাঁচে, এবং যখন এ চুলটি মরে যায় তখন সেই জায়গায় আবার নতুন চুল গজায় নির্দিষ্ট চক্রের মাধ্যমে। এ চক্রকে আবার তিনটি পর্যায়ে ভাগ করা হয়। ১. অ্যানাজেন, ২. ক্যাটাজেন ও ৩. টেলোজেন।

চুল বৃদ্ধির মূল কাজটি হয় অ্যানাজেন পর্যায়ে থেকে যা সাধারণত ২ থেকে ৬ বছর পর্যন্ত হতে থাকে। চুলের বৃদ্ধি ১.২৫ সেন্টিমিটার প্রতি মাসে অথবা ১৫ সেন্টিমিটার পর্যন্ত এক বছরে বাড়ে; কিন্তু বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে চুলের এ বৃদ্ধির হার কমতে থাকবে। প্রতিটি চুল টেলোজেন পর্যায়ের পর পড়ে যায়।

আমাদের মাথার শতকরা প্রায় ৮৫ ভাগ চুল অ্যানাজেন পর্যায়ে থাকে। প্রায় ১০ থেকে ১৫% চুল টেলোজেন পর্যায়ে থাকে (ক্যাটাজন খুবই স্বল্পকালীন সাধারণত ২ সপ্তাহ) এবং এরপরই শুরু হয় টেলাজেন প্রক্রিয়া যা ২ থেকে ৪ মাস পর্যন্ত হয়। টেলোজেন পর্যায়ের পর একটি চুলের গোড়ায় নতুন চুলের আবির্ভাব ঘটে এবং পুরনো চুলটি পড়ে যায়। এভাবে নতুন চুলটি অ্যানাজেন পর্যায়ে জন্ম নিয়ে জীবন চক্র শুরু করে।

যদি সে সময় যে কোনো কারণে টেলোজেন পর্যায় দীর্ঘতর হয় তা হলে চুল বেশি পড়বে। এ ছাড়া চুলের ফলিকল শুকিয়ে গেলে নতুন চুল নাও গজাতে পারে তখনই মাথায় টাকের সৃষ্টি হয়। তখন চুল পড়ার জন্য চুলের গোড়ার বা ফলিকলে একটি এনজাইম তৈরি হয়, যার নাম ফাইভ আলফা রিডাকটেজ। এ এনজাইম রক্তে অতিবাহিত হরমোন টেস্টস্টেরনকে ডাই হাইড্রোটেস্টস্টেরনে পরিণত করে। যার আরেক নাম ডিএইচটি (উঐঞ)।

ডিএইচটি চুলের গোড়ায় আক্রমণ চালায় এবং চুল দুর্বল করে ঝরে পড়তে সাহায্য করে। পুরুষদের চুল সাধারণত সামনের দিকে পড়ে এবং টাকে পরিণত হয়। মহিলাদের পুরো মাথার চুলই এককভাবে পড়ে এবং পাতলা হয়ে যায়। মহিলাদের শরীরে অ্যারোমাটেজ নামে এক ধরনের এনজাইম তৈরি হয় যা ডিএইচটিকে ইস্ট্রোজেনে পরিণত করে।

হরমোনজনিত সমস্যার কারণে

হরমোনের কম-বেশি হওয়ার কারণে চুল উঠে যেতে পারে। যেমন থাইরয়েড হরমোনের মাত্রা কম বা বেশি হলে, গর্ভবতী অবস্থায় এবং বাচ্চার জন্মের পর হরমোনাল ভারসাম্য পরিবর্তিত হয় বলে তখন চুল বেশি পড়ে মহিলাদের। হরমোনের এ পরিবর্তন আবার আগের অবস্থায় ফিরে গেলে পুনরায় চুল গজায়। তবে তা আগের অবস্থায় যেতে এক বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।

কিছু ওষুধের কারণে

কোনো কোনো ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় চুল পড়তে পারে, যেমন- জন্মনিয়ন্ত্রণের বড়ি হঠাৎ করে সেবন ছেড়ে দেয়া, প্রেসারের ওষুধ, রক্ত তরলীকরণের ওষুধ, হরমোন, মানসিক অসুস্থতার ওষুধ ইত্যাদি।

টিনিয়া ক্যাপাইটিস : এটি এক ধরনের ফাঙ্গাল ইনফেকশন, যা স্কাল বা মাথার খুলিতে হয়ে থাকে। এ ফাঙ্গাল ইনফেকশনের জন্য ওই অংশের চুল পড়ে যায়। ইনফেকশন ভালো হয়ে গেলে চুল আবার গজায়।

হেয়ার প্রোডাক্টের জন্য : খুব বেশি পরিমাণ কালারিং এজেন্ট, ব্লিচিংসামগ্রী, চুল সোজা করা বা ক্রমাগত রিবন্ডিং করানো ও ঘন ঘন চুল পার্ম করার সামগ্রী ব্যবহার করলে চুল পড়ার হার বেড়ে যায়। বিশেষ করে প্রোডাক্টগুলো যদি উন্নতমানের না হয় সে ক্ষেত্রে চুল বেশি করে পড়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রেই আবার চুল ওঠে; কিন্তু অনেক সময় হেয়ার ফলিকলের স্থায়ী ক্ষতি হয়ে গেলে চুল আবার নাও গজাতে পারে।

অপারেশনের পর : শরীরে বড় কোনো সার্জারি বা অপারেশনের পর অনেক ক্ষেত্রেই চুল পড়ে যায়। এটি ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, অপারেশনের কারণে শারীরিক পরিবর্তন অথবা মানসিক উদ্বেগের জন্য হতে পারে। সুস্থ হওয়ার পর চার থেকে আট সপ্তাহের মধ্যে চুল আগের অবস্থায় ফিরে যায়।

অসুখের কারণে চুল পড়া : কিছু অসুখে, যেমন অ্যানিমিয়া, টাইফয়েড, জণ্ডিস, ম্যালেরিয়া, ডায়াবেটিস, ভিন্ন ধরনের চর্ম রোগ, বা মাথার খুসকি ইত্যাদিতে চুল পড়ে যেতে পারে। অনেক সময় অসুখ ভালো হওয়ার পরও চুল আর আগের অবস্থায় ফিরে যায় না।

খাদ্যাভ্যাস : শারীরিক নিউট্রিশনাল স্ট্যাটাসের ওপর চুলের স্বাস্থ্য নির্ভর করে। দৈনিক খাদ্য তালিকায় প্রোটিন, কার্বহাইড্রেট, ফ্যাট, মিনারেলস ও ভিটামিন পরিমিত পরিমাণে না থাকলে চুল পড়ে যায়। এছাড়া দীর্ঘদিন শরীরে কোনো একটি উপাদানের অভাবে চুল পড়তে পারে। যা সচরাচর অল্প বয়স্ক তরুণ-তরুণীদের বেলায় বর্তমানে বেশি পরিলক্ষিত হচ্ছে।

কেমোথেরাপির কারণে যখন চুল পড়ে : এর কারণ কেমোথেরাপিউটিক ড্রাগসগুলো বর্ধনশীল কোষের ওপর কাজ করে। কেমোথেরাপির প্রথম ডোজ দেয়ার দুই-তিন সপ্তাহ পর চুল পড়া শুরু হয় এবং কেমোর সর্বশেষ ডোজের তিন-চার মাস পর পুনরায় চুল গজানো শুরু হয়। তবে ক্যান্সার চিকিৎসায় রেডিওথেরাপি দেয়ার পর চুল পড়লে তা আর গজায় না।

উপরে উল্লেখিত কারণে মাত্র পাঁচ ভাগ পুরুষের চুল পড়ে। বাকি চুল পড়ে অ্যানড্রোজেনিক অ্যালোপিসিয়ার কারণে (বংশগত বা হরমোনজনিত কারণে)।

মাথায় টাক পড়ার কারণ : যদিও খালি চোখেই কারণ শনাক্ত হয় তারপর ও আবার কিছু ক্ষেত্রে ল্যাব পরীক্ষা দরকার। যেমন ছত্রাকজনিত হলে মাইক্রোস্কোপি এবং কালচার, অ্যান্ড্রোজেনিক হলে হরমোন অ্যানালাইসিস, সিফিলিস হলে ভিডিআরএল এবং টিপিএইচএ পরীক্ষা, বিশেষ ক্ষেত্রে ত্বকের পাঞ্চ বায়োপসি এবং ডায়াবেটিস হলে রক্তের সুগার পরীক্ষা।

আধুনিক চিকিৎসা : অধিকাংশ ক্ষেত্রে চিকিৎসকরা অ্যান্ড্রোজেনিক টাকের জন্য চুল প্রতিস্থাপনই সবচেয়ে ভালো ব্যবস্থা বলে মনে করেন যা খুব ব্যয়বহুল পদ্ধতি, তবে কয়েক বছরের জন্য যদি মাথায় টাক না দেখতে চান তা হলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ অনুসারে বাজারে কিছু ওষুধ আছে যেমন- মিনোক্সিডিল : এটি বাজারে ১%, ২% ও ৫% মাত্রায় পাওয়া যায়। এটি চুলের ফলিকলের বৃদ্ধিকাল বাড়ায়। তবে এটি শুধু এখন সক্রিয় আছে এমন ফলিকলের ওপর কাজ করে। আর যতদিন এটি ব্যবহার করা হয়, ততদিনই শুধু সুফল পাওয়া যায়।

ফিনাস্টেরাইড : মুখের খাবার ওষুধ এটি। এটি টেস্টোস্টেরোনের কার্যকারিতাকে বাধাগ্রস্ত করে। ছোট থেকে মাঝারি আকারে পুরুষালি টাকের ক্ষেত্রে এটি ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে এটি দীর্ঘদিন ধরে প্রত্যেহ খেতে হয়। এটির মোট চিকিৎসা ব্যয় মিনোক্সিডিল চেয়ে বেশি পড়লেও এটি বেশ সহনীয়। সন্তান ধারণক্ষম মহিলাদের এটি ব্যবহার না করাই ভালো। এ ওষুধগুলো সাফল্য ও জনপ্রিয়তা ‘হেয়ার-ট্রান্স প্লানটেশন’ এর চাহিদা অনেক কমিয়ে দিয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞের পরামর্শক্রমে চিকিৎসা নিতে হবে। অন্যথায় মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে। পিআরপি ও মেসোথেরাপি চুল পড়ার সমস্যার সর্বাধুনিক সমাধান। যা বাংলাদেশেও হচ্ছে।

চুল পড়া নিয়ে কিছু ভুল তথ্য

প্রতিদিন শ্যাম্পু করলে চুল পড়ে যায়। আসলে শ্যাম্পু করলে মাথার চামড়া পরিষ্কার থাকে। তবে সব শ্যাম্পু প্রতিদিন ব্যবহার করা যায় না। প্রতিদিন ব্যবহারের কিছু শ্যাম্পু আছে, যা ব্যবহার করলে কখনোই চুল পড়ে না।

দিনে ১০০ বার চুল আঁচড়ালে চুলের স্বাস্থ্য ভালো থাকে বলে অনেকেই বলেন। চুল বেশি আঁচড়ালে টান লেগে বরং চুল পড়ার হার বেড়ে যায়। দিনে পাঁচ-ছয়বার আঁচড়ানোই যথেষ্ট।

লেখক : ত্বক ও যৌনব্যাধি বিশেষজ্ঞ, বিভাগীয় প্রধান, ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল

Share Button


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরির আরো নিউজ

You cannot copy content of this page

You cannot copy content of this page